ম্যাচের পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে- ৭৬ রানে অল আউট হয়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তৃতীয় টি-২০ ম্যাচে হারের পর দলকে এমনই পরামর্শ দিলেন ভারতীয় দলের অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঠিক চার মাস পর ভারতীয় দল যে নতুন করে তৈরির (রিসেট) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মঙ্গলবার ট্রেন্ট ব্রিজে ভারত ইংল্যান্ডকে প্রথমে ব্যাট করতে পাঠালে তারা ভারতের সামনে ২০১ রানের পাহাড় তোলে। জেতার জন্য ২০২ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে ভারত ৭৬ রানেই অল আউট হয়ে যায়। অর্থাৎ, ১২৫ রানে হারে শ্রেয়স আইয়ারের দল। এই ফরম্যাটে এত রানে আগ কখনও হারেনি ভারত। দশ দিন আগে তারা যখন আয়ারল্যান্ডের মাটিতে পা রাখে, তখন তাদের ঝুলিতে টানা ১৬টি টি-২০ টুর্নামেন্ট বা সিরিজে অপরাজিত থাকার নজির ছিল।
আয়ারল্যান্ডে ০-২-এ সিরিজ হারের পর তাদের লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতে অন্তত সেই আফসোস দূর করা। কিন্তু মঙ্গলবারের হার নিশ্চিত করে ফেলল যে, এই সিরিজ আর জেতা হচ্ছে না তাদের।ম্যাচের পর সাংবাদিকদের গম্ভীর বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা ভালো খেলতে পারিনি। তবে চারটে ম্যাচ হারলেই একটা দল খারাপ হয়ে যায় না। কখনও কখনও প্রতিপক্ষ ভালো খেলে। আবার কখনও ম্যাচের পরিস্থিতি ঠিকভাবে পড়তে পারা যায় না। ম্যাচকে পড়তে পারা সমান গুরুত্বপূর্ণ। আয়ারল্যান্ড সিরিজের পর থেকে আমরা তা করতে পারিনি।’
ভারতের ব্যাটাররা ইংল্যান্ডের বোলারদের পেস ও অতিরিক্ত বাউন্সের বিরুদ্ধে কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করেন। শুধুমাত্র একটি ম্যাচে নয়। প্রায় সব ম্যাচেই এমন হয়েছে। তবে গম্ভীর মঙ্গলবারকে এক ব্যতিক্রমী দিন হিসেবেই দেখতে চান। তাঁর মতে, দল যে বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে ক্রিকেট খেলে, সেখানে এমন দিন আসতেই পারে।ভারতীয় কোচ বলেন, ‘ইংল্যান্ড কী পরিকল্পনা করবে, তা আমি জানি না। তবে আমাদের অবশ্যই আরও ভালোভাবে গতির বিরুদ্ধে ব্যাট করতে শিখতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমার মনে হয় স্রেফ আজকের দিনটাই হয়তো আমাদের খারাপ দিন ছিল। কারণ, যদি শেষ দু’টো টি-টোয়েন্টির দিকে তাকান, আমরা দু’বারই ১৯০ রান তুলেছিলাম। কখনও কখনও যখন কেউ বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে ক্রিকেট খেলে, তখন এ রকম ঘটনা ঘটতেই পারে।’
ভারতের অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার অবশ্য নেতৃত্বের শুরুতেই এমন ভরাডুবির পর কোনও রাখঢাক করেননি। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দলের পারফরম্যান্সের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা ভয়াবহ ছিল। সত্যি বলতে এর চেয়ে ভালো কোনও শব্দ আমার মাথায় আসছে না।’পাওয়ারপ্লের মধ্যেই একের পর এক উইকেট হারিয়ে (৫ ওভারে ৫ উইকেটে ৫২) দল যে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়, সেই বিষয়টিকেই দায়ী করেন ভারত অধিনায়ক।
আইয়ার বলেন, ‘এত বড় ব্যবধানে হার কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।প্রথমেই আমাদের এই হার মেনে নিতে হবে। তার পর আবার নতুন করে সবকিছু বিশ্লেষণ করতে হবে এবং দেখতে হবে কোথায় ভুল করেছি। উইকেট দেখে আমার মনে হয়নি এটা ২০০ রানের উইকেট ছিল। কিন্তু তা ছাড়া আমরা যেভাবে ব্যাট করেছি, পাওয়ারপ্লেতেই চার-পাঁচ উইকেট হারিয়েছি। আমার মনে হয়, সেখানেই ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল এবং আমরা সেখানেই হেরে গিয়েছি। তাই আবার নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।’
এদিকে গৌতম গম্ভীরের মতে, সাম্প্রতিক ব্যর্থতার আরেকটি বড় কারণ হল টি-টোয়েন্টি দলে ব্যাপক পরিবর্তন বা ‘রিসেট’। তিনি বলেন, ‘দেখুন, এই টি-টোয়েন্টি দলে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যখন আপনি একটি টি-টোয়েন্টি দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে যান, তখন অনেক সময় এ রকম পারফরম্যান্স দেখা যায়। বিশ্বকাপ ফাইনালের একাদশ আর আজকের একাদশ যদি দেখেন, অনেক ফারাক রয়েছে। অধিনায়ক থেকে শুরু করে ওপেনিং ব্যাটার—সব জায়গাতেই বদল হয়েছে। হার্দিক পান্ডিয়া নেই, যশপ্রীত বুমরাহ নেই। তাই যখন আপনি আবার নতুন করে দল গড়ে তোলেন, তখন একটু সময় তো লাগেই।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফলাফল যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা স্বীকার করেও বাস্তববাদী হওয়ার আহ্বান জানান ভারতীয় কোচ। বলেন, ‘বাস্তববাদী হওয়া জরুরি। অনেক সময় ক্রিকেটারদের বেড়ে ওঠার এবং নিজেদের তৈরি করার জন্য সময় দিতে হয়। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মতো ভাল দলের বিরুদ্ধে যখন তাদের এত কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলছেন, তখন তাদের একটু সময় দিন। ওরা ধীরে ধীরে নিজেদের গড়ে তুলবে। কারণ, একটা দলকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পর সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে।’
তবে একই সঙ্গে ব্যাটারদের ম্যাচের পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝে খেলার প্রয়োজনীয়তার কথাও ফের মনে করিয়ে দেন গম্ভীর। তাঁর মতে, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। বলেন, ‘হয়তো মিডল অর্ডারের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের, যারা অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সেই অনুযায়ী ব্যাট করা দরকার। বিশ্বকাপের সময়ও আমরা সেটাই করেছিলাম। আমাদের প্রথম তিন ব্যাটার আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলছিল এবং আমরা চেয়েছিলাম তারা বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে খেলুক। কিন্তু চার ও পাঁচ নম্বরে যারা ছিল, তারা ইনিংস গড়ে তুলতে এবং প্রয়োজনে ইনিংসকে ধরে রাখতেও সক্ষম ছিল। আজ আমরা সেটাই করতে পারিনি। মনে হয়, আজ সেই জায়গাতেই আমাদের ঘাটতি ছিল।’
সঞ্জু স্যামসনকে বাদ দিয়ে বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশীকে দলে নেওয়া হলেও কিশোর তারকা নিজের চিরপরিচিত ব্যাটিং পারফরম্যান্স দেখাতে পারছেন না। গত ম্যাচে দুটো ও মঙ্গলবার দুটো ছয় হাঁকিয়ে আউট হয়ে যান তিনি। তাই ফের সঞ্জুকে দলের আনার দাবি তুলেছেন নেটিজেনরা। শুধু এই সিরিজে নয়, চলতি মাসের শেষ দিকে জিম্বাবোয়ে সফরের দল থেকেও বাদ পড়েছেন সঞ্জু।
কিন্তু গম্ভীর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সঞ্জু স্যামসনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কোনও ধোঁয়াশা নেই। আসলে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এখনও সঞ্জু গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি স্পষ্ট করে দেন, চলতি ইংল্যান্ড সিরিজেই সঞ্জুর ফের একাদশে ফেরার দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। সিরিজে এখনও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ বাকি, যেখানে ভারতের সামনে সিরিজ হার এড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
গম্ভীর বলেন, ‘সঞ্জু ভারতের হয়ে যা করেছে, বিশেষ করে বিশ্বকাপের সময়, তা অসাধারণ। তবে অনেক সময় কোনও নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের বর্তমান ফর্মের দিকেও নজর দিতে হয়। আর এমন কোনও কঠোর বা স্থির নিয়ম নেই যে, সে এই সিরিজে ও আর ফিরতে পারবে না।” কোচের এই কথাতে স্পষ্ট যে, সঞ্জুকে পরের বৃহস্পতিবারের ম্যাচে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।
গম্ভীরের সাফ বক্তব্য, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শেষ পর্যন্ত ফলাফলই আসল। তাই আমাদের মনে হয় যে সঠিক কম্বিনেশনই সবচেয়ে ভালো ফল এনে দিতে পারে। আমরা সেই কম্বিনেশন এবং সেই প্লেয়িং ইলেভেনকেই মাঠে নামাই। আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি, প্রত্যেককেই নিজের জায়গাটা অর্জন করে নিতে হয়।’