শনিবার ময়দানে ফাটাফাটি কলকাতা লিগ খেতাবের লড়াইয়ের টেনশনের মধ্যেও মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকদের মনে ছিল আরো এক উদ্বেগ, আনোয়ার আলির কী হবে? তাঁর খেলা কি এ বার বন্ধ হয়ে যাবে? শাস্তিস্বরূপ নির্বাসনে যেতে হবে আনোয়ারকে?
অন্যদিকে আতঙ্কে ভুগছেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারাও। একেই আসন্ন তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করা নিয়ে তাদের উদ্বেগের শেষ নেই। এর ওপর যদি আনোয়ার ইসুতে শাস্তির খাঁড়া নেমে আসে তাদের মাথার ওপর, দিতে হয় মোটা অঙ্কের জরিমানা, তা হলে ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হতে পারে। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা এমনই।
আনোয়ার আলি-কে নিয়ে মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল আইনি লড়াইয়ের অবসান সম্ভবত হয়ে যাবে আগামী ছ-সাত দিনের মধ্যেই। শুক্রবার রাতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত বা Court of Arbitration for Sport (CAS)-এ আনোয়ার আলি মামলার শেষ শুনানি হয়ে গেল। শুনানি চলে মাঝরাত পর্যন্ত। তার পরে জানানো হয়েছে ছ-সাত দিনের মধ্যে রায় দেওয়া হবে।
দীর্ঘ ১৮ মাসে ভারতে এই মামলার কোনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় CAS-এর দ্বারস্থ হয় মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের বিচারপ্রক্রিয়ায় একের পর এক শুনানি, মুলতবি এবং কমিটি পুনর্গঠনের পরেও সমাধান না মেলায় এই সিদ্ধান্ত নেয় মোহনবাগান।
কোথা থেকে শুরু এই মামলার?
এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ২০২৪-এর জুলাইয়ে। মোহনবাগানের সঙ্গে চুক্তি থাকা অবস্থায় আনোয়ার আলি সেই সম্পর্ক একতরফা ভাবে ছিন্ন করে ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেন। তার আগে দিল্লি এফসি-র সঙ্গে তাঁর চুক্তি এবং মোহনবাগানে লোনে খেলার বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছিল জটিলতা।
২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে ফেডারেশনের প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটি আনোয়ারের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে তাঁকে চার মাসের জন্য নির্বাসিত করেছিল। পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল এবং দিল্লি এফসি-র উপরও দু’টি ট্রান্সফার উইন্ডোতে নতুন ফুটবলার নথিভুক্ত করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং মোট ১২.৯ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরে দিল্লি হাই কোর্ট সেই ক্ষতিপূরণের নির্দেশ খারিজ করে অ্যাপিল কমিটিকে মামলাটি নতুন করে শুনতে বলে। তার পর থেকেই বার বার শুনানি পিছিয়েছে। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে অ্যাপিল কমিটি ফের মামলাটি প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটির কাছে পাঠায়। ২০২৬-এর ১২ জানুয়ারি নতুন করে শুনানি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তাও অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়। এর পরই CAS-এ আবেদন করে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট।
সময়সীমার শেষ দিনে আবেদন
CAS-এ যাওয়ার জন্য নির্ধারিত ২১ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে আবেদন করে মোহনবাগান। এর আগে ফিফার কাছেও বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছিল ক্লাব। ২০২৫-এর নভেম্বরে ফিফাকে চিঠি দিয়ে CAS-এ যাওয়ার উপায় নিয়ে স্পষ্টভাবে জানতে চাওয়া হয়েছিল। ফিফার জবাব পেয়ে তার পরই ভারতীয় ফুটবলের ঘরোয়া প্রশাসনিক কাঠামো পেরিয়ে আনোয়ার আলি মামলা পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে। মোহনবাগানের লক্ষ্য—আর দীর্ঘসূত্রতা নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি।
CAS-এ করা আবেদনে মোহনবাগানের মূল নিশানা ছিল ২০২৫-এর ২০ ডিসেম্বর ফেডারেশনের অ্যাপিল কমিটির সিদ্ধান্ত। ২৬ ডিসেম্বর ক্লাবকে সেই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। কিন্তু চূড়ান্ত রায় দেওয়ার বদলে বিষয়টি ফের প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটির কাছে নতুন করে শুনানির জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রায় দেড় বছর ধরে চলা বিতর্ক ফিরে যায় আগের জায়গাতেই।
কী অভিযোগ মোহনবাগানের?
মোহনবাগানের অভিযোগ ছিল, অ্যাপিল কমিটির ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াতেও একাধিক অনিয়ম ছিল। ক্লাবের দাবি, সিদ্ধান্তে একাধিক সদস্যের সম্মতির কথা বলা হলেও এক সদস্যের অনুমোদন আসে সিদ্ধান্তটি পক্ষগুলির কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার পরে। অন্য এক সদস্যের সম্মতির কোনও রেকর্ড সিদ্ধান্ত জারির সময় ছিল না বলেও দাবি করেছে মোহনবাগান।
শুধু তাই নয়, যে দিন অ্যাপিল কমিটি নতুন করে তৈরি হয়েছিল, সেই একই দিনে সিদ্ধান্তটি জারি করা হয়েছিল বলে প্রশ্ন তোলে ক্লাব। সিদ্ধান্তে সই করেছিলেন বিদায়ী চেয়ারম্যান, যাঁর মেয়াদও ২০ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় কোরাম আদৌ পূরণ হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে মোহনবাগান।
ক্লাবের আবেদনে বলা হয়েছিল, ‘পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছে, সিদ্ধান্তটি তাড়াহুড়ো করে নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে যে পরিস্থিতিতে কমিটি পুনর্গঠিত হয়েছিল, তা বিবেচনা করলে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়’। একই সঙ্গে দিল্লি এফসি-র পক্ষে পক্ষপাতের অভিযোগও তোলে মোহনবাগান।
CAS -এ শুনানিতে কী হল?
শুক্রবার প্রায় সারা দিন ধরে ও মাঝরাত পর্যন্ত এই অভিযোগগুলি এব তার পাল্টা অভিযোগ, ব্যাখ্যা ইত্যাদি শোনে CAS-এর বিচারকেরা। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, ফুটবল ফেডারেশন ও দিল্লি এফসি-র পক্ষের আইনজীবীরা ব্যাখ্যা ও পাল্টা ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন নিজেদের যুক্তি।
স্বাভাবিক ভাবেই মোহনবাগান অভিযোগ জানায় আনোয়ার আলি তাদেরই খেলোয়াড় ছিলেন, কিন্তু ইস্টবেঙ্গল তাঁকে জোর করে সই করিয়ে ইস্টবেঙ্গলের জার্সি পরিয়ে খেলাচ্ছে। ইস্টবেঙ্গল যথারীতি আত্মপক্ষ সমর্থন করে এবং বলে যা হয়েছে, আইন মেনেই হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, দুই পক্ষই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ফেডারেশনকে এর জন্য দায়ী করেছে। তাদের আইনজীবীরা জানান, ফেডারেশন অনুমতি দেওয়াতেই পুরো ঘটনাটি ঘটেছে। আনোয়ারের দলবদল আইনি হোক বা বেআইনি, তা হয়েছে ফেডারেশনের অনুমতি নিয়ে, তাদের নাকের ডগাতেই। এক্ষেত্রে ফেডারেশন কোনো দায় এড়াতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
কোন ক্লাবের যুক্তি আইনসম্মত ও কোন ক্লাবের অভিযোগ বেআইনি, সেই বিষয়ে তো রায় দেবেই আন্তর্জাতিক আদালত। কিন্তু যদি ইস্টবেঙ্গল দোষী সাব্যস্ত হয়, তা হলে শুধু তারা নয়, হয়তো শাস্তি পাবে ফেডারেশন ও আনোয়ারও। এদের সঙ্গে দিল্লি এফসি-র কর্নধার রঞ্জিত বাজাজকেও শাস্তির আওতায় আনা হতে পারে। কারণ, তাঁর পরামর্শেই আনোয়ার এই কাণ্ড করেছিলেন এবং তিনি সমানে বিষয়টিকে আইনসিদ্ধ বলে দাবি করে গিয়েছেন।
এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত যদি পুরো বিষয়টিকে আইনসিদ্ধ বলে রায় দেয়, তা হলে কোনো পক্ষই শাস্তি পাবে না। তবে যদি তা মনে না করে তারা, তা হলে মোহনবাগান ছাড়া বাকি সব পক্ষকেই কড়া শাস্তি পেতে হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা এই রায়ের বিরুদ্ধে আর বিশ্বের কোনো আদালতে আবেদনও করা যাবে না।
আনোয়ার আলি-রও ফুটবল জীবন বিপর্যস্ত হতে পারে এই রায়ে। তিনি এখন ফর্মের মধ্যগগণে রয়েছেন। ইস্টবেঙ্গল ও ভারতীয় দলের ডিফেন্সে অন্যতম প্রধান ভরসা তিনি। এই সময়ে তিনি যদি শাস্তির আওতায় চলে আসেন, তা হলে তাঁর কেরিয়ারেরও চরম ক্ষতি হতে পারে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতের বিচারকেরা এই মামলার রায় দেওয়ার সময় কি এসব কথা মাথায় রাখবেন? তাঁরা শুধুই দেখবেন আনোয়ারের দলবদল ফুটবলবিশ্বের আইন মেনে হয়েছে কি না। যদি তা হয়, তা হলে মোহনবাগানের এত মাসের চেষ্টা বিফলে যাবে।
কিন্তু যদি তা না হয়, তা হলে ইস্টবেঙ্গল, আনোয়ার, ফেডারেশন ও রঞ্জিত বাজাজকে তার চড়া খেসারত দিতে হবে নিশ্চয়ই। আগামী সাত দিনেই বোঝা যাবে ঠিক কী হতে চলেছে। অর্থাৎ, এই সাতটি দিন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে কাটাতে হবে আনোয়ারকে।