বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক উয়েফার, প্রবল বিক্ষোভের মুখে ফিফা, হঠাৎ কী হল? জেনে নিন

Photo: Representational Image

ফিফার সাম্প্রতিক পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে বিশ্বকাপ বয়কট-সহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করার জন্য উয়েফা চলতি সপ্তাহেই তাদের ৫৫টি সদস্য দেশের জরুরি বৈঠক ডাকছে।ফিফার বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংস্থার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (FFE) নামে সদ্য গঠিত একটি সংস্থার জন্য বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন তোলা হবে। এই নতুন সংস্থাই ভবিষ্যতে পুরুষ ও মহিলাদের বিশ্বকাপ-সহ ফিফার বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন টুর্নামেন্ট পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

২০ বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহের জন্য এই পরিকল্পনা ফিফার এবং এই নিয়েই প্রবল ক্ষুব্ধ ইউরোপের ফুটবলখেলিয়ে দেশগুলি। ফিফা এই প্রকল্পে বহুজাতিক আর্থিক পরিষেবা সংস্থা জে.পি. মরগ্যান-এর সঙ্গে কাজ করছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে থ্রাইভ ইটার্নাল, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জোশুয়া কুশনার। তাঁর ভাই জ্যারেড কুশনার আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই।

ফিফার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মঙ্গলবারই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় উয়েফা। ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার স্পষ্ট বক্তব্য, ‘ফুটবলের মালিক নয় ফিফা। তাই খেলাটাকে বিক্রি করার অধিকার ফিফার নেই’। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও প্রকাশ্যে এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেন। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সম্পত্তি নয় ফুটবল’।


 

প্রবল ক্ষোভ উয়েফার অন্দরমহলে

 

ইএসপিএন সূত্রের খবর, ফিফার এই প্রস্তাব নিয়ে উয়েফার অন্দরে প্রবল বিরোধিতা রয়েছে এবং সদস্য দেশগুলির বড় অংশই এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। উয়েফার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফিফা এমন এক সীমা অতিক্রম করেছে, যা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির কোনও দিনই অতিক্রম করা উচিত নয়। বিষয়টিকে উয়েফা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রতিটি জাতীয় ফুটবল সংস্থারও একইভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে লিগ, ক্লাব, ফুটবলার, সমর্থক, সরকার এবং যাঁরা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত— প্রত্যেকেরই এই বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন’।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘ফুটবলের শাসনব্যবস্থা কোনও বাণিজ্যিক সম্পদ নয়, যা কেনাবেচা করা যায়। বিশেষ করে, যখন এ থেকে কারা আর্থিকভাবে লাভবান হবে, তা নিয়ে কোনও স্বচ্ছতাই নেই’।

ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার উদ্দেশ্যে চলতি সপ্তাহেই উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৈঠক করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সূত্রের খবর, চলতি সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই উয়েফার সদস্য দেশগুলিকে নিয়ে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

২০২১-এ দু’বছর অন্তর ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিল ফিফা। কিন্তু সে বারও উয়েফা বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দেয়। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা। এবারও ফিফার নতুন আর্থিক পরিকল্পনা রুখতে একই কৌশল নেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

ফিফার ‘ফুটবল বিক্রির’ পরিকল্পনা

 

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ফিফা জানায়, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (FFE) -এর মাধ্যমে চলতি বছরের শেষের দিকে সর্বোচ্চ ৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তোলা হবে। সংস্থাটির প্রাথমিক ইকুইটি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে সংখ্যালঘু (মাইনরিটি) এবং নিয়ন্ত্রণহীন (নন-কন্ট্রোলিং) অংশীদারিত্ব বিক্রি করেই এই অর্থ সংগ্রহ করা হবে। সেই অর্থ ফুটবলের উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। ফিফার বিবৃতিতে সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, ‘এটি বিশ্বজুড়ে ফুটবলের গণতন্ত্রীকরণের উদ্যোগ’। সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আর সেই সম্পর্ক নিয়েই উয়েফার অন্দরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে জানা গিয়েছে।

 

এই প্রকল্পে বিশাল লাভ ভারতের

 

মঙ্গলবারের এই বিবৃতিতে ফিফা বিশেষভাবে তুলে ধরেছে ‘ফিফা ফাস্ট ফরোয়ার্ড’ প্রকল্পের আওতায় ২০৩৮ সাল পর্যন্ত তাদের ২১১টি সদস্য সংস্থা কত অর্থ পেতে পারে, তার খতিয়ান।

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭-৩০ বিশ্বকাপ বাণিজ্যিক চক্রে প্রতিটি সদস্য সংস্থাকে উন্নয়ন তহবিল হিসেবে ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়ার কথা ছিল। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে সেই অঙ্ক বেড়ে হবে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বর্তমান মূল্যে ১৯১ কোটি টাকারও বেশি)। পরবর্তী দুই চক্রে তা আরও বেড়ে যথাক্রমে ২২ মিলিয়ন এবং ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হবে। এই অর্থ ভারতের মতো পিছিয়ে পড়া সদস্য দেশেরও পাওয়ার কথা।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকা) আয় করেছে ফিফা, যা এক নজির। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে টিকিট ও আতিথেয়তা পরিষেবার দাম ছিল আকাশছোঁয়া। তবে ২০৩০-এ স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয় যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপ থেকে এত আয় হবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।

ফিফা জানিয়েছে, নতুন আর্থিক সুযোগ-সুবিধায় অংশ নেবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যেক সদস্য ফুটবল সংস্থা নিজেরাই নিতে পারবে।

 

আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতেই

 

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার দাবি, ‘FFE-এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতেই থাকবে। ফুটবলের শাসনব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক ম্যাচ ক্যালেন্ডার এবং সমস্ত নিয়ন্ত্রক ও ফুটবল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচেটিয়া অধিকারও ফিফা-রই থাকবে’।

তবে এই প্রস্তাব নিয়ে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন ফিফার কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে কবে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। আগামী ২৩ নভেম্বর অনলাইনে ফিফার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ২০৩১ এবং ২০৩৫ সালের মহিলা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ চূড়ান্ত করা হবে। সেই সন্মেলনে এই নিয়ে আলোচনা হওয়ার একটা সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে।