কলকাতা লিগ ও আইএফএ শিল্ড জেতা হয়ে গিয়েছে তাঁর দলের। ডুরান্ড কাপেরও ফাইনালে উঠেছিল তারা। তবে হেরে গিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাক মরসুম প্রস্তুতিতে তাঁর দলের এই ফল খারাপ নয়। তাও মন খুঁতখুঁত করছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কোচ প্যানায়োতিস দিমপেরিসের। তিনি দলের খেলায় আরো আগ্রাসন ও তীব্রতা চান।
শনিবার শুরু হয়ে গেল চলতি মরসুমের ইন্ডিয়ান সুপার লিগ। মোহনবাগান এসজি তাদের প্রথম ম্যাচে নামবে সোমবার, গুয়াহাটিতে, নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে। রবিবারই সেজন্য দল নিয়ে গুয়াহাটিতে উড়ে যাবেন গ্রিক কোচ। তার আগে সাংবাদিকদের নিজের এই ইচ্ছের কথাই শোনালেন।
এ দিন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে দল নিয়ে অনুশীলনে নামার আগে দিমপেরিস বলেন, ‘আইএসএলে আমাদের খেলায় আরও আগ্রাসন ও তীব্রতা প্রয়োজন। প্রাক মরসুমে আমরা তা করতে পারিনি ঠিকই। কারণ, তখন আমাদের প্রস্তুতি চলছিল। এ বার খেলার মাধ্যমে এই দুটো জিনিসের ওপর জোর দিতে হবে’।
এ বারেই কোচ হিসেবে দলের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর মনে হচ্ছে দলের মধ্যে আরো ভাল ফুটবল সংস্কৃতির প্রয়োজন, জেতার সংস্কৃতি প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এই দুটো ব্যাপার খুব দরকার। পেপ গুয়ার্দিওলা এলেও যাতে এই সংস্কৃতিটা পাল্টাতে না চান। এই সংস্কৃতিটা খুব দরকার’।
সোমবার গুয়াহাটিতে মোহনবাগান এসজি খেলবে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে, যাদের বিরুদ্ধে তারা মাসখানেক আগে ডুরান্ড কাপেও খেলেছিল। এই নর্থইস্টকেই ইস্টবেঙ্গল এফসি আইএফএ শিল্ডের সেমিফাইনালে ৭-২-এ হারিয়েছিল। সেই দলই এ বার আইএসএলের প্রথম ম্যাচে সবুজ-মেরুন বাহিনীর প্রতিপক্ষ।
এই প্রসঙ্গে দিমপেরিস বলেন, ‘আশা করি এটা সম্পূর্ণ অন্যরকমের একটা ম্যাচ হবে। প্রথম ম্যাচটা আমরা ডুরান্ড কাপে শিলং-এ খেলেছিলাম। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা শেষ পর্যন্ত পেনাল্টিতে জিতি। মনে রাখবেন, নর্থইস্ট কিন্তু সেবার অনেক নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের তখন খেলায়নি। ম্যাচের শেষ দিকে কয়েকজনকে নামিয়েছিল। আর আমরা তখন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ছাড়াই খেলেছিলাম। তাই এই ম্যাচটা সম্পূর্ণ আলাদা হবে। কিন্তু আমাদের জিততে হবে’।
প্রতিপক্ষকে যে আগে থেকে পরখ করে নেওয়ার সুবিধা তারা পাবে, তা যেমন স্বীকার করে নেন প্যানোস, তেমনই এও মনে করিয়ে দেন, তাদেরও প্রতিপক্ষ ভাল করে চেনে। বলেন, ‘আমরা প্রতিপক্ষকে কিছুটা হলেও জানতে পেরেছি। সম্ভবত প্রতিপক্ষও আমাদের সম্পর্কে অবগত। আমরা একটি শক্তিশালী দলের সাথে খেলছি যাদের কয়েকজন ভাল ভাল খেলোয়াড় আছে এবং আমার মতে, আমি যাদের বিরুদ্ধে খেলেছি তাদের মধ্যে সেরা কোচ ওদের দলে রয়েছে। সুতরাং, আমাদের আইএসএল শুরু হচ্ছে খুব কঠিন, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। যদি আমরা জিততে পারি, তা হলে শুরুটা দারুন হবে’।
গতবার আইএসএলের খেতাব খোয়াতে হয়েছিল কম গোল থাকায়। এ বার তাই প্রচুর গোল চান কি না, জানতে চাইলে দিমপেরিস বলেন, ‘সেরকম ব্যাপার নয়। আমরা সবার আগে যথাসম্ভব বেশি ম্যাচ জিততে চাই। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচে অনেক হিসেব বদলে যেতে পারে। তবে আমি চাই ছেলেরা প্রতিপক্ষের বক্সে বারবার বল নিয়ে ঢুকে পড়ুক। তার পর কত কী গোল হবে, সে তো পরে দেখা যাবে’।
দলের অস্ট্রেলিয়ান স্ট্রাইকার জেমি ম্যাকলারেন ও মিডফিল্ডার আপুইয়ার চোট নিয়ে চিন্তায় ছিলেন সমর্থকেরা। তবে তাঁদের নিয়ে ভালো খবরই দিয়েছেন কোচ। বলেন, সবাই ঠিক আছে। আমরা সবাই সুস্থ আছি এবং লড়াই করব। (আশিস) রাই ছাড়া বাকি সব খেলোয়াড় মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত। এ বার আমরা দেখব, কাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায়। এটা আজকের আর আগামীকাল সকালের অনুশীলনের উপর নির্ভর করবে। আমার মনে হয়, পেদ্রো বেনালি (নর্থ ইস্টের কোচ) মাঠে যেরকম নিয়মিত দল নামায়, সে রকমই নামাবে। আমিও একটা ভাল কম্বিনেশন খুঁজে পাব’।
প্রস্তুতি পর্বে মোহনবাগান এসজি তিনটি টুর্নামেন্ট খেলে এবং বেশ কয়েকটি কঠিন ম্যাচও খেলতে হয় তাদের। তাতে অবশ্য খুশিই প্যানোস। বলেন, ‘ভালই হয়েছে তিনটে টুর্নামেন্ট খেলে। কারণ, আমরা দুটি ফরমেশন নিয়ে কাজ করতে পেরেছি। এক, ৩-৪-৩ এবং দুই, ৪-২-৩-১। তাই আমাদের খেলোয়াড়রা এখন দুই ফরমেশনই মানিয়ে নিয়েছে। ফলে বিভিন্ন ম্যাচে বা ম্যাচের মাঝে আমরা এগুলো পরিবর্তন করে খেলতে পারি। অধিকাংশ খেলোয়াড় খেলার সুযোগ পেয়েছে এবং সেই সময়টা তারা কাজেও লাগাতে পেরেছে’।
তিনটি টুর্নামেন্ট খেলায় যেমন সুবিধা হয়েছে, তেমনই অসুবিধাও হয়েছে বলে জানান দিমপেরিস। তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাক মরসুম আট সপ্তাহের হয়। একেকটি পার্টে আমরা একেকরকম কাজ করি। কিন্তু তিনটে টুর্নামেন্ট থাকায় সেই কন্ডিশনিংটা ঠিকমতো হয়নি। তাছাড়া কয়েকজন খেলোয়াড়ের চোট ছিল বলে ওরাও ঠিকমতো করতেও পারেনি। সেজন্যই এখন কিছুটা বাড়তি চাপে আছি। তবে যে কারণেই চাপ থাক, সেই চাপ আমাদের সামলাতে হবে’।
তিন টুর্নামেন্টের ধকল তো ছিলই, তার ওপর দলের অনেকেই তিনটি কঠিন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে এসেছেন। তাই আইএসএলের শুরুতেই ক্লান্তি ভোগাবে না তো?- এই প্রশ্নের উত্তরে মোহনবাগান কোচ লুকোছাপা না করেই সাফ জবাব দেন, যা তথ্য পেয়েছি, তাতে অনেকেই অনেক চাপ নিয়েছে। সে জন্য খেলোয়াড়দের বিশ্রামও দরকার ঠিকই। কিন্তু খেলোয়াড়দের যদি মোটিভেশন থাকে, তাহলে ক্লান্তি থাকলেও তারা ভাল খেলে। যেমন সাহাল। ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও ও শিল্ড ফাইনালে ভাল খেলেছে। এটা খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করে। আশা করি, আমার দলের খেলোয়াড়দেরও সে রকম মানসিকতা রয়েছে’।
স্কটিশ ফরোয়ার্ড লি এরউইনও এ দিন কোচের সঙ্গে আসেন সাংবাদিক বৈঠকে। তিনি বলেন, ‘একানে খেলার চাপের থেকে আনন্দ বেশি। মোহনবাগানের মতো ঐতিহাসিক ক্লাবে খেলা বড় ব্যাপার। আমাদের বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এটাই আমাদের কাজ। এখানেও তা-ই করছি। প্রথম এগারোয় জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা সব ভাল ক্লাবেই থাকে। এটা নতুন নয়। সে জন্য পরিশ্রম করছি। দলের সেরা খেলোয়াড়দের মতোই ভাল খেলতে হবে, এটাই লক্ষ্য’।
দলের সাজঘরের পরিবেশ নিয়েও তিনি খুশি। বলেন, ‘দলের পরিবেশ খুব ভাল, একাধিক জাতীয় দলের খেলোয়াড় আছে, কলকাতা লিগে খেলা খেলোয়াড় আছে। সবাই মিলেমিশে থাকি আমরা। গত সপ্তাহে আমাদের একটা টিম ডিনার ছিল। সেখানে আরো মেলামেশা করার সুযোগ পেয়েছি। দ্রাজিচ মাথায় চোট নিয়েও যে ভাবে খেলল, এ তারই ফল। এ রকম একটা দলে খেলা খুবই সৌভাগ্যের’।