প্রায় এক বছর পরে ইডেনে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচে বাংলা-মহারাষ্ট্র দ্বৈরথে দুই ব্রাত্য তারকার ‘যুদ্ধও’

Shami And Prithvi Photo-SNS

রবিবাসরীয় ইডেনের রোদ ঝলমলে সকালে ওই দুজনকে দেখে যে কোনো ক্রিকেটপ্রেমীরই চেনা চেনা লাগবে। একজন তো একসময় ভারতীয় দলের নিয়মিত পেসার মহম্মদ শামি। অন্যজন কে?

একটু ভালো করে দেখলে চেনা চেনা লাগবে। যাঁরা নিয়মিত ভারতীয় ক্রিকেট দেখেন ও খবরাখবর রাখেন, তাঁরা ভালো করে তাঁকে দেখার একটু পরেই মনে পড়বে তিনি কে। তিনি পৃথ্বী শ। আসলে বছর ছয়েক হয়ে গেল ভারতীয় ক্রিকেটের গ্রহে তাঁকে দেখা যায় না বলে তাঁকে মনে পড়তে একটু সময় লাগবে।

শামির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সে রকম নয়। তাঁর উপস্থিতি নিয়মিত, গত বছর মার্চেও তাঁকে ভারতের জার্সি গায়ে দেখা গিয়েছিল। তারপর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্রাত্য হয়ে গেলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে এবং সফল হতেও দেখা গিয়েছে প্রায়ই।


রবিবার সকালে ভারতীয় দলের এই দুই ব্রাত্য-কে মুখোমুখি আলোচনা করতে দেখা গেল ইডেনের মাঠে। তাদের আলোচনার বিষয় কী হতে পারে? অনেক কিছুই হতে পারে। তবে তার মধ্যে যে একটা বিষয় থাকবেই, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই—ভারতীয় বোর্ডের নির্বাচকদের অদ্ভূত কাণ্ডকারখানা।

ভারতীয় ক্রিকেটে যে কখন, কে গুরুত্বহীন হয়ে যাবে, কে যে কখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা কোনো ক্রিকেটীয় যুক্তি দিয়ে বোঝা কঠিন। যেমন শামি ভারতীয় দলে ডাক পান না, অথচ ভুবনেশ্বর কুমার পান। তেমনই পৃথ্বী শ শুধুমাত্র তাঁর ব্যাক্তিগত জীবনের বিতর্কের জন্য ভারতীয় ক্রিকেটের পরিকল্পনার পুরোপুরি বাইরে চলে যান, ক্রিকেটীয় কারণে নয়। এ দিন দুজনের আলোচনায় নিশ্চয়ই এই আলোচনাটা ছিল। এই বিষয়টাই পুরোটা জুড়ে থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

তবু শামি, পৃথ্বীদের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে যেতে হবে। অন্তত এটা প্রমাণ করার জন্য, তাঁরা এখনও ক্রিকেটে আছেন, মাঠের বাইরে চলে যাননি। সোমবার থেকে ইডেনে যে বাংলা বনাম মহারাষ্ট্র রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ হবে, তাতেও এই দুজনের এই লড়াই জারি থাকবে।

যতই এলিট ‘সি’ গ্রুপের এটি এক নম্বর বনাম দু’নম্বরের ম্যাচ হোক, যতই টানা তিন ম্যাচ জিতে আসা বাংলার এটি আধিপত্য বজায় রাখার লড়াই হোক, আগামী চার দিন নজর থাকবে এই দুই ব্রাত্য তারকার দিকে। শামি বনাম পৃথ্বী— দুই ব্রাত্যজনের অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়ার মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে ঐতিহাসিক ইডেন।

ইডেন অনেককে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে এনেছে। অনেক ক্রিকেটারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।কয়েকদিন আগে হরভজন সিং ও সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এক কথোপকথনে স্বীকার করতে শোনা গিয়েছিল, ২০০১-এ ইডেনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক টেস্ট জয় তাঁদের ক্রিকেট জীবনকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছিল।

সেই ম্যাচে হরভজনের হ্যাটট্রিক যেমন তাঁকে তারকা স্পিনার হয়ে ওঠার রাস্তা দেখিয়েছিল, তেমনই সৌরভও স্বীকার করে নেন, সেই ম্যাচে না জিততে পারলে হয়তো তাঁর অধিনায়কত্বই আর থাকত না। বছর খানেক পরে ইডেনে বসতে চলা রঞ্জি ট্রফির আসরে ভারতীয় দলের এই দুই ব্রাত্য তারকাকে তেমনই কোনো জাদুকাঠির ছোঁয়া দিতে পারবে কি না, সেটাই দেখার।

বাংলার কোচ লক্ষ্মী রতন শুক্লা শামিকে নিয়ে বললেন, ‘শামি এখনও যে পরিশ্রম করছে ও যে পারফরম্যান্স দিয়ে চলেছে, তা আমাদের দলের ছেলেদের অনেক অনুপ্রেরণা জোগায়। সামনে কী আছে, সে সবের পরোয়া না করেও ও কিন্তু ওর সেরাটা দিয়ে যাচ্ছে। এটাই বাকিদের লড়াইয়ের প্রেরণা জোগায়’।

অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের কোচ সামাদ ফালাও পৃথ্বীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বললেন, ‘ওর কাছ থেকে আমরা সেরাটা চাই। আশা করি, ইডেনের মতো অসাধারণ ক্রিকেটীয় পরিবেশে ও নিজের ছন্দ ফিরে পাবে। তা ছাড়া বাংলা এত ভাল দল যে, তাদের বিরুদ্ধে ভাল কিছু করতে গেলে নিজের সেরাটাই দিতে হবে। পৃথ্বীর ক্ষেত্রেও সেটাই প্রযোজ্য। আমাদের বিশ্বাস ও সেটা করেই দেখাবে এই ম্যাচে’।

তবে দুই ব্রাত্য তারকার লড়াইয়ে হারিয়ে যাচ্ছে না দুই দলের যুদ্ধ। গ্রুপের এক নম্বর বনাম দুই নম্বরের যুদ্ধ। বাংলা টানা তিন ম্যাচে জিতে ইডেনে নামছে। মহারাষ্ট্র একটি ম্যাচে জিতেছে এবং বাকি দুই ম্যাচ থেকে তিন পয়েন্ট করে নিয়ে এসেছে। কেউই দমবার পাত্র নয়। ঝাড়খণ্ডের বিরুদ্ধে ৫২৭ রানের ইনিংস গড়েছে তারা। সার্ভিসেসের বিরুদ্ধেও প্রায় সাড়ে তিনশোর ইনিংস গড়ে তারা। সেই ম্যাচে পৃথ্বী ৭০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন।

Shami-Kaif Photo-SNS

ফলে ইডেনের উইকেটে রান থাকলে সেই রান নিজেদের স্কোরবোর্ডে জড়ো করতে সমস্যা হবে না তাদের। বাংলার ব্যাটিংও কম যায় না। সুদীপ ঘরামি, অভিমন্যু ঈশ্বরণ, অভিষেক পোড়েল, শাহবাদ আহমেদ, সুমন্ত গুপ্ত, অঙ্কুর পালরা রান পেলেও ধারাবাহিকতা নেই তাদের ব্যাটে। কোনো ম্যাচে বড় রান পাচ্ছেন তো, কোনো ম্যাচে কম।

এই নিয়ে কোচ শুক্লা বলেন, ‘এটা ঠিকই যে একেকটা ম্যাচে একেকজন ভাল খেলছে। তবে ইডেনে যেহেতু ভাল উইকেট পাওয়া যাবে, তাই এই ম্যাচে আমাদের ব্যাটাররা আশা করি অনেকেই ভাল রান পাবে, আমরাও বড় রানের ইনিংস গড়তে পারব’।

উইকেট দেখে বাংলা শিবির ঠিক করেছেন তিন পেসার ও দুই স্পিনার নিয়ে খেলবে। শামি ও তাঁর ভাই মহম্মদ কাইফ এবং সুরজ সিন্ধু জয়সওয়ালের সঙ্গে দুই স্পিনার শাহবাজ ও প্রদীপ্ত প্রামানিক, যিনি গত ম্যাচেই দশ উইকেট পেয়েছেন। অর্থাৎ, আমির গনিকে বসতে হবে। এই একটিই বদল করে সম্ভবত সোমবার মাঠে নামবে বাংলা।

রবিবার সকালে উইকেটে ছিটেফোঁটা ঘাস দেখা গেল। সোমবার সকালে হয়তো সেটুকুও থাকবে না। বোর্ডের নিয়মে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচে স্পোর্টিং উইকেটে খেলতে হবে সব দলকে। কোনো দলকে হোম অ্যাডভান্টেজ দেওয়া হবে না। তাতে বাংলার এ পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয়নি। দিব্যি তিন ম্যাচ থেকেই ছপয়েন্ট করে পেয়েছে তারা। কল্যাণীতে প্রথম হোম ম্যাচেও তারা ছ’পয়েন্টই পেয়েছে। এ বার দ্বিতীয় হোম ম্যাচে, ইডেন থেকে তারা কত পয়েন্ট অর্জন করতে পারে, সেটাই দেখার।