ন’বছর আগে ভারতে খেলে গিয়েছিলেন তাঁরা। ২০১৭-য় ভারতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপে স্পেনকে ফাইনালে তুলতেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। এ বার চলতি বিশ্বকাপেও স্পেনকে ফাইনালে তুলেছেন তাঁরা। যারা ন’বছর আগে ভারতের কোনো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে এরিক গার্সিয়া ও ফেরান তোরেসের খেলা দেখেছিলেন, তাঁদের রবিবার ফাইনাল দেখতে বসেও নিশ্চয়ই মনে পড়বে দুই তারকার কথা।
২০১৭-র অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপে স্পেন ফাইনালে উঠেও ইংল্যান্ডের কাছে ২-৫-এ হেরে যায়। গ্রুপ পর্বে তারা প্রথমে কোচিতে ব্রাজিলের কাছে ১-২-এ হেরে যায়। এর পর তারা কোচিতেই নাইজারকে চার গোলে, উত্তর কোরিয়াকে দু’গোলে হারিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় সেরা দল হিসেবে ১৬ দলের রাউন্ডে ওঠে এবং ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়। গুয়াহাটিতে ফ্রান্সকে ২-১-এ হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে তারা সেই কোচিতে ইরানের বিরুদ্ধে খেলে ও ৩-১-এ জয়ী হয়। নভি মুম্বইয়ে সেমিফাইনালে মালিকে ৩-১-এ হারিয়ে কলকাতার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয় স্পেন। কিন্তু ২-৫-এ হেরে যায়।
সে বার অ্যাটাকিং উইঙ্গার হিসেবে স্পেনের হয়ে খেলেছিলেন ফেরান তোরেস। নিজের গতি ও অসাধারণ কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বারবার গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। আবেল রুইজের মতো সতীর্থদের গোল করার সাফল্যের আড়ালে কিছুটা চাপা পড়লেও, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই তোরেস নিয়মিত বিপজ্জনক ক্রস তোলেন এবং স্পেনের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ গতি ও ধার এনে দেন। বিশেষ করে মালির বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে তাঁর ৭১ মিনিটে করা গোলটি স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। সেই ম্যাচের পারফরম্যান্সই তাঁকে স্পেনের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত করে।
সেই দলের রক্ষণভাগের প্রাণকেন্দ্রে ছিলেন এরিক গার্সিয়া। বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত মানসিকতা, অসাধারণ কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা এবং ঠান্ডা মাথার ফুটবল উপহার দিয়ে তিনি পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের ডিফেন্সকে দৃঢ়তা দিয়েছিলেন। ম্যাচ রিডিংয়ের অসাধারণ ক্ষমতা, সঠিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্যাকল করা এবং রক্ষণভাগ থেকে নিখুঁতভাবে আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা— সব মিলিয়ে স্পেনের ফাইনালে ওঠার পথে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগকে বারবার আটকে দিয়ে গার্সিয়া প্রমাণ করেছিলেন, কেন বয়সভিত্তিক ফুটবলে তিনি বহু দিন ধরেই স্পেনের অন্যতম সেরা প্রতিভা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছিলেন।
তখন থেকেই স্প্যানিশ ফুটবলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এই দুই তারকা পাকাপাকি জায়গা করে নেন এবং এ বারের বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠা স্প্যানিশ দলে তাদের জায়গা হওয়া, তারই প্রতিফলন। চলতি বিশ্বকাপে লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে পুরো টুর্নামেন্টে মূলত বদলি ফুটবলার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছেন ফেরান তোরেস। মাঠে নেমে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দৌড়ঝাঁপ স্পেনের খেলায় নতুন উদ্দীপনা এনে দিলেও, গোল করার ক্ষেত্রে তিনি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে তাঁর নামের পাশে একটি গোলও যোগ হয়নি। মোট সাতটি ম্যাচের মধ্যে একটিতে প্রথম এগারোয় ছিলেন তোরেস। বাকি ছ’টিতে তিনি পরিবর্ত হিসেবে নামেন। মোট ২৩০ মিনিট মাঠে ছিলেন। পর্তুগালের বিরুদ্ধে একটি গোলে অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে স্পেনের প্রথম ম্যাচে গোলশূন্য ড্র হয়। সেই ম্যাচে শুরুর একাদশে জায়গা পান তিনি। কিন্তু গোলের সামনে প্রয়োজনীয় ধার না দেখাতে পারায় পরবর্তী ম্যাচগুলিতে প্রথম একাদশ থেকে বাদ পড়েন। তবুও কোচের কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র হিসেবেই থেকে যান। পরে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নক-আউট পর্বের ম্যাচগুলিতে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে স্পেনের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তোরেস।
ফেরান তোরেস খেলার সুযোগ পেলেও তাঁর অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপ দলের সতীর্থ এরিক গার্সিয়া এ বার একটিও বিশ্বকাপ ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পাননি। ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে একাধিক পজিশনে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স দেখালেও স্পেনের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া ছিল এরিক গার্সিয়ার কাছে অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। তবে গোটা টুর্নামেন্টেই তাঁকে মূলত বেঞ্চে এবং সাইডলাইনে বসে সতীর্থদের উৎসাহ জোগাতেই দেখা গিয়েছে।