ঘরের মাঠে নেই পরিকাঠামো, ভিনরাজ্যে জাত চেনাচ্ছেন তনবীররা

রিলায়েন্স ডেভলপমেন্ট লিগের জাতীয় পর্যায়ে বাংলার দুই ফুটবলার তনবীর দে এবং মোহিত মন্ডলের পারফরম্যান্স আজ ভারতীয় ফুটবল মহলে চর্চার বিষয়। লিগে তনবীরের ১৫টি গোল কেবল তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতা নয়, বরং বাংলার ফুটবল মানচিত্রের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তব। বাংলার এই দুই প্রতিভাকে নিজেদের মাটি ছেড়ে উত্তর-পূর্বের রাজ্যে গিয়ে প্রতিভা প্রমাণ করতে হচ্ছে। আর এই ঘটনাই বাংলার ফুটবল পরিকাঠামো, বিশেষ করে ‘আবাসিক ফুটবল অ্যাকাডেমি’র অভাবকে ফের কাঠগড়ায় দাঁড় করাল।

তনবীর ও মোহিত— দুজনই বেঙ্গল ফুটবল অ্যাকাডেমির প্রাক্তন ছাত্র। সামান্য পরিকাঠামো আর নূন্যতম প্রশিক্ষণ সম্বল করেই তাঁরা আজ ভিনরাজ্যের একাধিক ফুটবলারের চ্যালেঞ্জ টপকে বড় ক্লাবগুলোর প্রথম একাদশে জায়গা করে নিচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে, যে বাংলায় প্রতিভার এমন খনি, সেখানে কেন তাঁদের গড়ে তোলার মতো প্রতিষ্ঠান নেই? কেন বাংলার ফুটবলারদের কেরিয়ার গড়তে ভিনরাজ্যের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে?
সাইয়ের দীর্ঘদিনের কোচ এবং বেঙ্গল ফুটবল অ্যাকাডেমিতে তনবীরদের বেড়ে ওঠা প্রত্যক্ষ করা অনন্ত ঘোষ এই বিষয়ে স্পষ্টবক্তা। তাঁর মতে, বাংলার ক্লাবগুলোর ট্রফি জয়ের লক্ষ্য থাকাটা অন্যায়ের নয়, কিন্তু সেই সাফল্যের নেশায় যদি ভূমিপুত্রদের ব্রাত্য করে রাখা হয়, তবে আখেরে ক্ষতি বাংলার ফুটবলেরই। অনন্ত বলেন, “আমাদের ক্লাবগুলোর ট্রফি জয়ের মানসিকতা আছে, কিন্তু প্রতিভাবান বাঙালি ফুটবলার তুলে এনে তাঁদের উন্নতি ঘটানোর ইচ্ছেটা কোথায়? এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক আবাসিক অ্যাকাডেমি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রতিটি ধাপ মেনে খেলোয়াড়দের তৈরি করতে হবে। এতে ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন।”

আজকের ফুটবল কেবল মাঠের লড়াই নয়, এটি বিজ্ঞানের চর্চা। পাঞ্জাব এফসি, মিনার্ভা ফুটবল অ্যাকাডেমি বা এফসি মাদ্রাজ আজ যেভাবে আধুনিক পরিকাঠামো নিয়ে উঠে আসছে, সেই তুলনায় বাংলা অনেক পিছিয়ে। কলকাতায় বড় ক্লাব থাকলেও, তাদের নিজস্ব কোনো বিশ্বমানের আবাসিক অ্যাকাডেমি আজও গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিভা থাকলেও সঠিক মেন্টরশিপ এবং পরিবেশের অভাবে অনেক তনবীর অকালেই হারিয়ে যাচ্ছে।


বাংলার ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতি এখন কঠিন আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড়িয়ে। ভিনরাজ্যের ফুটবলার নিয়ে এসে ট্রফি জয় সম্ভব, কিন্তু বাংলার ফুটবলের উন্নতি অসম্ভব। আধুনিক ডায়েট, শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনযাপন এবং বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের জন্য আবাসিক অ্যাকাডেমিই একমাত্র পথ।

তনবীরদের ১৫টি গোল আজ বাংলার ফুটবল নিয়ামক সংস্থা এবং বড় ক্লাবগুলোর কর্মকর্তাদের কাছে এক নীরব প্রতিবাদ। যদি এখনই ধৈর্য এবং সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে আবাসিক অ্যাকাডেমি গড়ার কাজে হাত না দেওয়া হয়, তবে আগামীর ফুটবল ময়দানে বাঙালি ফুটবলারদের খুঁজে পেতে দূরবিন ব্যবহার করতে হবে। প্রতিভা আছে, এবার প্রয়োজন তাদের যোগ্য ‘কারখানা’য় গড়ে তোলা।