লর্ডসে যস্তিকা ভাটিয়ার ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি এক হার না-মানা কঠিন লড়াইয়ের গল্প, জয়ের মুখে হরমনপ্রীতরা

Photo: X

লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম উঠতেই যেন স্বীকৃতি পেয়ে গেল এক দীর্ঘ লড়াইয়ের। লড়াই ছাড়া যে জীবনে দাঁড়ানো যায় না, যস্তিকা ভাটিয়ার এই গল্প, তারই এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভারতের উইকেটকিপার-ব্যাটার যস্তিকা ভাটিয়ার ১১৩ রানের ইনিংস শুধু এক ঐতিহাসিক শতরান নয়, বরং গুরুতর চোট, ক্রিকেট জীবনে অনিশ্চয়তা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর এক কঠিন লড়াইয়ে জিতে ফেরার এক অনুপ্রেরণার গল্প।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্টে যস্তিকা ১৫৮ বলে ১১৩ রান করে লর্ডসে টেস্ট শতরান করা প্রথম মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৪টি বাউন্ডারি। ভারতকে ম্যাচে প্রায় জেতার জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এই ইনিংস তাঁর ব্যক্তিগত লড়াইয়েরও সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

এই সেঞ্চুরি নিয়ে যস্তিকা বলেন, “এ অবিশ্বাস্য অনুভূতি। লর্ডসে শতরান করা প্রথম মহিলা ক্রিকেটার হওয়া! কারণ ছয় মাস আগেও আমি জীবনের একেবারেই অন্য এক পরিস্থিতিতে ছিলাম। তখন যদি কেউ আমাকে বলত যে একদিন লর্ডসের অনার্স বোর্ডে আমার নাম উঠবে, আমি কোনওভাবেই তা বিশ্বাস করতাম না।”

মাত্র কয়েক মাস আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। বাঁ হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট (ACL)-এ গুরুতর চোট পেয়ে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল যস্তিকাকে। সেই চোটের জন্যই গত বছর ওয়ান ডে-র বিশ্বকাপও হাতছাড়া হয় তাঁর। অস্ত্রোপচার, দীর্ঘ রিহ্যাব এবং একের পর এক কঠিন দিন—সব মিলিয়ে তাঁর ক্রিকেট মাঠে ফেরা নিয়েই তৈরি হয়েছিল বড় প্রশ্নচিহ্ন।


কিন্তু সেই কঠিন সময়েও হাল ছাড়েননি বরোদার এই বাঁহাতি ব্যাটার। ধাপে ধাপে নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। চলতি ইংল্যান্ড সফরেই প্রথম সীমিত ওভারের সিরিজে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। আর লর্ডসে এসে সেই আত্মবিশ্বাসই সাহায্য করল স্বপ্ন পূরণে।

এই লড়াইয়ে যাঁরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ তাঁদের সবার কথাই মনে পড়ছে যস্তিকার। বলেন, “অনেক মানুষ পর্দার আড়ালে আমার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। আমার পরিবার, আমার বাবা, মা, আমার বোন—ওরাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং ভরসা। আমার কোচ, বাড়ির ট্রেনাররা, এখানকার সাপোর্ট স্টাফ এবং সতীর্থরাও সবসময় আমার পাশে থেকেছেন।”

তিনি ধন্যবাদ দিয়েছেন, তাঁদের, যাঁরা যস্তিকাকে রিহ্যাবে সাহায্য করেছিলেন। “এ ছাড়াও বিসিসিআইয়ের সেন্টার অফ এক্সেলেন্স-এ আমি পুনর্বাসনের (রিহ্যাব) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। ওখানকার প্রত্যেকেই আমার এই মাঠে ফিরে আসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের ছাড়া এটা কখনওই সম্ভব হতো না,” বলেন যস্তিকা ভাটিয়া।

সেই লড়াইয়ের দিনগুলির কথা মনে করে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের নয়া তারকা বলেন, “অস্ত্রোপচারের পর আমাকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। প্রথম দু’মাস পুরোপুরি বিশ্রামে ছিলাম। সেই সময়ে আমার বাঁ পায়ের প্রায় সমস্ত পেশিশক্তিই চলে গিয়েছিল। তাই এর পর আমাকে একেবারে শুরু থেকে সবকিছু গড়ে তুলতে হয়েছে।

তার পর পুনর্বাসনের (রিহ্যাব) প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকে। বড় বড় টুর্নামেন্ট মিস করা আর শুধু রিহ্যাব করাটা খুবই হতাশাজনক ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে নিজের উপর আমার বিশ্বাস ছিল যে, এই চোট কাটিয়ে আমি আবারও মাঠে ফিরে আসতে পারব,” বলেন ২৫ বছর বয়সি বাঁহাতি ব্যাটার।

“আমার চারপাশের মানুষজনও আমাকে ইতিবাচক মানসিকতা ধরে রাখতে ভীষণ সাহায্য করেছেন। জীবনে যত বাধা বা ধাক্কাই আসুক না কেন, খেলাটার প্রতি ভালোবাসা আর নিজের উপর অটুট আস্থা— দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর সেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এই দু’টোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,” যোগ করেন তিনি।

ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে এই ইনিংসের গুরুত্ব আরও বেশি। ক্রিকেটের ‘মক্কা’ লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম তোলা যে কোনও ক্রিকেটারের কাছেই বিশেষ সন্মানের। যস্তিকা সেই তালিকায় নিজের নাম তোলার পাশাপাশি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় রচনা করলেন।

যস্তিকার এই শতরান ভারতের জয়ের ভিত আরও মজবুত করে দিয়েছে। তাঁর দুর্দান্ত ইনিংসের সৌজন্যে ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে বড় ব্যবধান গড়ে ইংল্যান্ডকে কার্যত জয় থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেয়। প্রথম ইনিংস ভারতের ২৮৫-র জবাবে ইংল্যান্ড শেষ হয়ে যায় ১৭০-এ। দ্বিতীয় ইনিংসে যস্তিকার সেঞ্চুরি, স্মৃতি মান্ধানার ৭০ ও রিচা ঘোষের ৫০ রানের ইনিংসের ওপর ভর করে ভারত ৩৪১-৭ তুলে ডিক্লেয়ার করে দেয়। ৪৫৬ রানে পিছিয়ে থাকা ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসেও বিপর্যস্ত। তৃতীয় দিনের শেষে ছয় উইকেট হারিয় ১৩০ তুলেছে তারা। অর্থাৎ, পরকৃতি বাধ না সাধলে আজ চতুর্থ দিনেই ভারতের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

নিজের অসাধারণ ইনিংস নিয়ে যস্তিকা বলেন, “আমি সেঞ্চুরি বা ব্যক্তিগত কোনও মাইলফলকের কথা ভাবিনি। আমার লক্ষ্য ছিল ভালো রানরেটে বড় স্কোর করা, যাতে ইংল্যান্ডের দশ উইকেট তুলে নেওয়ার জন্য আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় থাকে। আমার মাথায় শুধু এই পরিকল্পনাই ছিল। আমি সব সময়ই দলের জন্য খেললে নিজের সেরাটা দিতে পারি। দেশের হয়ে খেলতে পারাটা আমার কাছে ভীষণ গর্বের বিষয়,”।

“ড্রেসিংরুম থেকে আমাকে খুব স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল—বল দেখে খেলো, কোনও তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। আমার উপর কোনও অতিরিক্ত চাপও তৈরি করা হয়নি। সবাই শুধু বলেছিল, ‘তোমার যেটা সবচেয়ে ভালো মনে হয়, সেভাবেই খেলো।’ বলও ব্যাটে খুব ভালোভাবে আসছিল, তাই আমি একটু বেশি শট খেলার চেষ্টা করছিলাম। আর হাতে উইকেটও ছিল, ফলে আমরা খুব ভালো অবস্থায় ছিলাম,” বলেন ক্রিকেটের নতুন নায়িকা যস্তিকা।

মাঠের স্কোরবোর্ডে এটি একটি সেঞ্চুরি। কিন্তু মাঠের বাইরে এ এক হার না মানা মানসিকতার জয়, যা ভবিষ্যতে বহু তরুণ-তরুণীর কাছে দৃষ্টান্ত এবং অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।