ফুটবলের সেরা আসর বসেছে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, সারা দুনিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের ভীড় সেখানে। সেই ভীড়ে বাঙালি থাকবে না, তাই কখনও হয়? প্রবাসী বাঙালিরা তো রয়েছেনই, তেমনই খুঁজলে কলকাতা থেকে ট্রাম্পের দেশে পাড়ি জমানো বাঙালিও পাওয়া যাবে। শুধুমাত্র ফুটবলের নেশায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচের সাক্ষী থাকা এমনই এক বিশুদ্ধ বাঙালি ফুটবলপ্রেমী হলেন স্মরজিৎ ব্যানার্জি।
কলকাতায় নিয়মিত ডার্বি ম্যাচে গ্যালারিতে হাজির থাকেন স্মরজিৎ। আদ্যান্ত মোহনবাগান সমর্থক তিনি। সারা বছর টিভিতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফুটবলও দেখেন। এ বার নিজের চোখে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে একাই পাড়ি জমিয়েছেন সূদুর আমেরিকায়। শনিবার (ভারতীয় সময়ে রবিবার ভোরে) ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ দেখতে হাজির ছিলেন নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
ব্রাজিলের সমর্থক স্মরজিৎ সবাইকে নিজের দেশের উপস্থিতি জানান দিতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে সে দিন ৮২ হাজার দর্শকের সঙ্গে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেন। চেটেপুটে উপভোগ করেন বিশ্বকাপ ফুটবলের ভরপুর আনন্দ ও রোমাঞ্চ। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? সোমবার নিউ জার্সি থেকে লস অ্যাঞ্জেলিসে পৌঁছনোর পর সেখান থেকে ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’-কে তিনি জানান, ‘অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমি ছোট থেকেই ব্রাজিলের সমর্থক। সেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ-ম্যাচ চাক্ষুষ দেখার স্বপ্ন দেখেছি বরাবরই। তাই এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। রোমাঞ্চকর পরিবেশ বললেও কম বলা হবে। এই পরিবেশের কথা মনে করলেই গায়ে কাঁটা দেয়।’
মধ্যবয়সী স্মরজিৎ পেশায় পর্যটন-ব্যবসায়ী। চন্দননগরের মানুষ। সারা বছর বাঙালি পর্যটকদের নিয়ে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ আয়োজন করেন তিনি। এই পেশা তাঁকে এই বিশ্বকাপ সফরে অনেক সাহায্য করেছে। বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর নতুন নয়। এর আগেও গিয়েছেন একাধিকবার। বিদেশে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসরেও গিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে এই প্রথম।
কলকাতায় মাঠে গিয়ে ডার্বি দেখেন নিয়মিত। ডার্বির সেই পরিবেশ আর বিশ্বকাপের ম্যাচের পরিবেশের মধ্যে ফারাক তো থাকবেই। কেমন ফারাক? স্মরজিৎ বলেন, ‘ডার্বিতে দুই দলের সমর্থকেরা ৫০-৫০ শতাংশ থাকে। এই ম্যাচে তো ব্রাজিলের সমর্থকই ছিল বেশি। মরক্কোর সমর্থকেরা সংখ্যায় ছিল অনেক কম। মরক্কো দারুণ খেলেছেও। ব্রাজিলের খেলা দেখে তো সমর্থকেরা হতাশ হয়েছেনই। তবে সে জন্য একে অপরকে আক্রমণ করার প্রবৃত্তি কারও মধ্যে দেখলাম না। গ্যালারিতে তো নয়ই, মাঠ থেকে বেরিয়েও কোনও দলের সমর্থকেরা অপর দলের সমর্থকদের উদ্দেশ্যে কোনও কটূ মন্তব্য করেনি বা আক্রমণ করেনি। এখানে সমর্থকেরা প্রত্যেকেই বেশ ভদ্র।’
ব্রাজিলের সমর্থকদের দেখে মুগ্ধ স্মরজিৎ বলেন, ‘ওরা সবসময় হইচই করে খেলা দেখতে ভালবাসে। সবসময় নাচ-গানে মেতে থাকে। তবে কারও মধ্যে অসভ্যতা বা আগ্রাসনের প্রবৃত্তি দেখিনি। প্রত্যেকেই শালীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করে। শনিবার মাঠে বোধহয় ৭৫ শতাংশ ব্রাজিল সমর্থক ছিল। প্রিয় দল ড্র করায় সবাই বেশ হতাশও হয়। কিন্তু মরক্কো যে রকম খেলেছে সে দিন, তাতে এই ফল মেনে নিয়েছে সবাই। তা ছাড়া ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ ছিল এটা। তাই কেউ হতাশায় ভেঙে পড়েনি। প্রত্যেকেরই বিশ্বাস, তাদের দল জয়ে ফিরবে এবং এর চেয়ে অনেক ভাল খেলবে’।
ব্রাজিলের ম্যাচ দেখার পর এ বার স্মরজিতের সফরসূচীতে রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলিস, যেখানে সোমবার ইরান বনাম নিউজিল্যান্ড ম্যাচ দেখবেন তিনি। এই ম্যাচ ঘিরে নিরাপত্তার প্রচণ্ড কড়াকড়ি থাকছে। যেহেতু ইরান খেলতে আসছে যুক্তরাষ্ট্রে এবং বছরের শুরু থেকেই যুদ্ধ চলছে দুই দেশের মধ্যে, তাই বেনজির নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হচ্ছে পুরো স্টেডিয়ামকে। এই ম্যাচে যে অন্য রকমের এক অভিজ্ঞতা হতে চলেছে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই স্মরজিতের।
১৯ জুন সান ফ্রান্সিসকোয় প্যারাগুয়ে বনাম তুরস্ক ম্যাচও রয়েছে তাঁর সফরসূচীতে। যাবেন কানাডাতেও। সেখানে ২৩ জুন টরন্টোয় দেখবেন ক্রোয়েশিয়া বনাম পানামা ম্যাচও। কলকাতায় ফিরবেন এক বিরল অভিজ্ঞতা নিয়ে। যে অবিজ্ঞতা সঞ্চয়ের স্বপ্ন দেখেন বহু বাঙালি। কারও স্বপ্ন পূরণ হয়, কারও হয় না। প্রথম দলে অবশ্যই থাকবেন চন্দননগরের স্মরজিৎ ব্যানার্জি।