শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে (Sri Lanka Series) দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ভারতীয় ব্যাটারদের শ্রীলঙ্কার ঘূর্ণি উইকেটে তাদের স্পিনারদের মোকাবিলা করতে হবে। ভারতীয় ব্যাটিংকে যাতে চাপে রাখা যায়, সে জন্য শ্রীলঙ্কা দলে রয়েছেন এক ঝাঁক স্পিনার। ভারতেরও স্পিনারের অভাব নেই। তারাও যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্য তিন বাঁহাতি স্পিনার নিয়ে এই টেস্টে নামার পরিকল্পনা করেছে। শনিবার হয়তো দেখা যাবে দুই দলই তিনজন করে স্পিনার নিয়ে মাঠে নামবে এবং টেস্ট ম্যাচটা আদতে স্পিনারদের লড়াই হয়ে উঠবে।
ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ ভারতের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সেই ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং তার পর দলের সাপোর্ট স্টাফদের একাংশের বিদায়— দুই সহকারী কোচ ও এক ফিল্ডিং কোচের চলে যাওয়া— গৌতম গম্ভীর এবং ভারতীয় দলকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, দ্বীপরাষ্ট্রে জয় না পেলেই গম্ভীরকে সঙ্গে সঙ্গে কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি হয়তো দায়িত্বে থেকেই যাবেন। তবে ভারতীয় দল যদি শ্রীলঙ্কায়ও সাফল্য না পায়, তা হলে লাল বলের ক্রিকেটে দলের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে আলোচনা এখনই শুরু হয়ে গিয়েছে।
গলে সফরকারী দলগুলির পক্ষে সফল হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই তা বোঝা যাবে। ১৯৯৮ থেকে গলে হওয়া ৪৯টি টেস্টের মধ্যে শ্রীলঙ্কা জিতেছে ২৭টিতে। ধূর্ত ও দক্ষ স্পিনারদের দাপটকে হাতিয়ার করেই এই মাঠে নিজেদের আধিপত্য গড়ে তুলেছে তারা।
মুথাইয়া মুরলীধরন ও রঙ্গনা হেরাথের স্বর্ণযুগ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও প্রভাত জয়সূর্য এবং রমেশ মেন্ডিসের মতো স্পিনার রয়েছেন শ্রীলঙ্কার দলে (Sri Lanka Series), যাঁরা গলকে কার্যত নিজেদের দুর্গে পরিণত করেছেন।
তাই এই পরিস্থিতি বর্তমান ভারতীয় দলের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, মিচেল স্যান্টনার এবং সাইমন হার্মারের মতো স্পিনারদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সমস্যায় পড়েছিলেন ভারতীয় ব্যাটাররা।
তবে এই ভারতীয় দলের সঙ্গে একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka Series) সফরে আসা ভারতীয় দলের। সেটিই ছিল শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka Series) মাটিতে ভারতের শেষ টেস্ট সিরিজ।
বিরাট কোহলির নেতৃত্বাধীন সেই দলে এমন বেশ কয়েক জন ক্রিকেটার ছিলেন, যাঁরা তখন নিজেদের কেরিয়ারের মধ্যগগনে। সেই দলই শ্রীলঙ্কা থেকে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে ফিরেছিল, যার মধ্যে গলের টেস্টেও জয় ছিল। সেই সিরিজ থেকেই কার্যত টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের দীর্ঘ আধিপত্যের সূচনা হয়েছিল।
এ বার তরুণ অধিনায়ক শুভমান গিলের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলেও রয়েছেন কেরিয়ারের মাঝপথে থাকা অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি এক ঝাঁক উদীয়মান প্রতিভা। তাঁদেরও এখন প্রয়োজন তেমনই এক স্ফুলিঙ্গের, যা ভারতীয় দলকে ফের শীর্ষে ওঠার পথে নতুন করে জ্বালানি জোগাতে পারে।
তবে এত কিছুর জন্য আগে ভারতকে বেরিয়ে আসতে হবে স্পিনের গোলকধাঁধা এবং ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত ফর্ম-সংকট থেকে। বিশেষ করে ঋষভ পন্থ ও ধ্রুব জুরেলকে। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে দু’জনের পারফরম্যান্সই প্রত্যাশার স্তরের অনেক নীচে। শ্রীলঙ্কার স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই এই সিরিজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারতের প্রথম তিন ব্যাটার— কে এল রাহুল, যশস্বী জয়সওয়াল ও দেবদত্ত পাডিক্কলের ব্যাট থেকে বড় রান আসাও জরুরি। যদিও দলের ব্যাটিংয়ের মূল ভরকেন্দ্র অধিনায়ক শুভমান গিল। তা ছাড়া দেবদত্তের সামনে রয়েছে সুবর্ণ সুযোগ। সরফরাজ খানের ভাগ্যেও শিকে ছিঁড়তে পারে। কিন্তু এঁদের প্রত্যেককেই আগে প্রতিপক্ষের স্পিন সামলে উইকেটে টিকে থাকার কথা ভাবতে হবে।
কিন্তু পারবেন কি তাঁরা এই কঠিন কাজটা করে দেখাতে? টেস্ট সিরিজ (Sri Lanka Series) শুরুর আগে ভারতীয় ব্যাটারদের স্পিন খেলার দুর্বলতা নিয়ে সরব হলেন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার অশোক মালহোত্রা (Ashok Malhotra)। তাঁর মতে, আধুনিক যুগের টি-২০ ক্রিকেটের প্রভাবেই ঘূর্ণি বলের বিরুদ্ধে ব্যাটারদের দক্ষতা ক্রমশ কমছে।
মালহোত্রার মতে, সম্প্রতি ঘরের মাঠেই ভারতীয় ব্যাটারদের প্রতিপক্ষের স্পিনারদের বিরুদ্ধে হিমশিম খাওয়ার পিছনে শুধু ব্যাটারদের দায় নেই। ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যথেষ্ট মানের স্পিনারের অভাবও বড় কারণ।
‘দৈনিক স্টেটসম্যান ডিজিটাল’-কে তিনি (Ashok Malhotra) বলেন, ‘এর কারণ, টি-২০ ক্রিকেট। টি-২০-তে এখন কেউ বল ঘোরায় না, সবাই শুধু জোরে বল ঢুকিয়ে দেয়। আমাদের সময়ে বিষেণ সিংহ বেদি, রাজিন্দর গোয়েল, দিলীপ দোশি, পদ্মাকার শিভলকর এবং ধীরাজ পারসানার মতো স্পিনার ছিলেন। প্রায় প্রতিটি দলের কাছেই ভাল মানের স্পিনার থাকত’।
বর্তমান ভারতীয় ক্রিকেটের ছবির সঙ্গে অতীতের তুলনা টেনে মালহোত্রা (Ashok Malhotra) আরও বলেন, ‘এখনকার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখবেন, সেই রবীন্দ্র জাডেজা এবং অক্ষর পটেলই রয়েছেন, যাঁরা খুব বেশি বল ঘোরান না। যখন আপনি ভাল মানের স্পিনারই পাবেন না, তখন স্পিন বোলিংয়ের বিরুদ্ধে ভালো ব্যাটিং করবেন কী করে?’
দেখুন: অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ বাতিল, প্রতিক্রিয়া ঋতব্রতের
প্রাক্তন ভারতীয় ব্যাটারের মতে, স্পিনের বিরুদ্ধে দুর্বলতার ফল ভারত ইতিমধ্যেই ভুগেছে। তাঁর কথায়, ‘এই কারণেই তো নিউজিল্যান্ড তাদের পার্ট-টাইম স্পিনারদের দিয়েও আমাদের হারিয়েছিল। পরে দক্ষিণ আফ্রিকাও একই পথ অনুসরণ করেছে’।
শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka Series) মাটিতে টেস্ট সিরিজে স্পিনাররা বড় ভূমিকা নেবেন বলেই মনে কর হচ্ছে। বিশেষ করে গলের মতো উইকেটে ঘূর্ণি বোলিং সামলানোই হতে পারে ভারতীয় ব্যাটারদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সেই সিরিজ (Sri Lanka Series) শুরুর ঠিক আগে মালহোত্রার (Ashok Malhotra)মন্তব্য তাই ভারতীয় দলের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে।
টি-টোয়েন্টির যুগে ব্যাটারদের আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের প্রবণতা বাড়লেও, টেস্ট ক্রিকেটে বলের ফ্লাইট, টার্ন এবং গতির পরিবর্তন সামলানোর পুরনো দক্ষতা হারিয়ে যাচ্ছে কি না— মালহোত্রার বক্তব্যে সেই প্রশ্নই আরও এক বার উঠে এল।