জয়সূর্য, মেন্ডিসের স্পিন-অস্ত্রেই ভারতকে বিপদে ফেলার ছক শ্রীলঙ্কার! ভারতের সামনে পুরনো আতঙ্ক

Photo: Representational Image

স্পিনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ব্যাটিং—এক সময় যে বিষয়টি ছিল দলের অন্যতম শক্তি, সাম্প্রতিক টেস্ট সিরিজগুলিতে সেটিই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। ঘূর্ণি উইকেটে ফুটওয়ার্ক কমে যাচ্ছে, ধৈর্য হারিয়ে ভুল শট খেলছেন ব্যাটাররা, কখনও আবার নিখুঁত বলের সামনে রক্ষণেও দেখা যাচ্ছে গলদ। সেই পুরনো দুর্বলতাই এ বার শ্রীলঙ্কা সফরে ভারতীয় ব্যাটিংকে নতুন করে পরীক্ষার মুখে ফেলবে না তো? এই প্রশ্ন উঠছেই।

প্রভাত জয়সূর্য  (Prabhat Jayasuriya) ও রমেশ মেন্ডিস— প্রথম টেস্ট গলে, পরেরটি কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে। দুই মাঠেই স্পিন সহায়ক পরিবেশে ভারতের ব্যাটারদের পরীক্ষা নিতে প্রস্তুত শ্রীলঙ্কার দুই অভিজ্ঞ স্পিনার।

ভারতের সাম্প্রতিক স্পিন-ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাওয়া গিয়েছে ২০২৪-এ নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে হোম সিরিজে। সেই সিরিজে ০-৩ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল ভারত। পুনেতে মিচেল স্যান্টনার একাই নিয়েছিলেন ১৩ উইকেট। অন্য দিকে, আজাজ পটেলের সংগ্রহ ছিল সিরিজে ১৫ উইকেট।


এর পর ২০২৫-এ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আরও এক বার স্পিনের সামনে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল ভারতকে। সাইমন হার্মার দু’টি টেস্টে নিয়েছিলেন ১৭ উইকেট— কলকাতায় আট এবং গুয়াহাটিতে ন’টি। শেষ পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এই দুই সিরিজই বুঝিয়ে দিয়েছে, শুধু বল কতটা ঘুরছে, সেটাই আসল নয়, প্রতিপক্ষ স্পিনাররা যদি ধৈর্য ধরে একই জায়গায় বল রেখে ব্যাটারদের ধারাবাহিক ভাবে চাপে রাখতে পারেন, তা হলে শুভমান গিলদের বিপদে ফেলা সম্ভব।

আরও পড়ুন: মাঠে মৃত্যুর পর মর্গে নড়েচড়ে উঠলেন নাইজেরিয়ান ফুটবলার! তার পর কী হল?

শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় অস্ত্র নিঃসন্দেহে বাঁহাতি স্পিনার প্রভাত জয়াসূর্য (Prabhat Jayasuriya) । এখন পর্যন্ত ২৩টি টেস্টে তাঁর উইকেট ১২৫। তার মধ্যে গলেই মাত্র ১১টি টেস্টে নিয়েছেন ৮১ উইকেট। গল টেস্টে সর্বাধিক উইকেট নেওয়া বোলারদের তালিকায় তিনি রয়েছেন তৃতীয় স্থানে। তাঁর আগে শুধু মুথাইয়া মুরলীধরন—১১১ উইকেট এবং রঙ্গনা হেরাথ—১০২ উইকেট।

২০২৪-এ নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার ২-০ সিরিজ জয়ের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা ছিল জয়সূর্যের (Prabhat Jayasuriya)। প্রথম টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পরে দ্বিতীয় ম্যাচে ছয় উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। খুব বেশি নাটকীয় টার্ন নয়, বরং লাইন-লেংথ, গতির পরিবর্তন এবং ব্যাটারদের উপর ক্রমাগত চাপ— এই অস্ত্রেই সাফল্য পেয়েছেন জয়সূর্য।

কলম্বোর এসএসসি-তেও তাঁর রেকর্ড যথেষ্ট ভাল। সেখানে তিন টেস্টে ১৫ উইকেট নিয়েছেন তিনি। ফলে গলের পরে কলম্বোতে গিয়েও যে ভারতের ব্যাটাররা স্বস্তি পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

জয়সূর্যের  (Prabhat Jayasuriya) সঙ্গে ভারতের সমস্যার কারণ হতে পারেন রমেশ মেন্ডিসও। ডানহাতি অফস্পিনার হিসেবে তিনি আক্রমণে সম্পূর্ণ অন্য মাত্রা যোগ করতে পারেন। ১৬টি টেস্টে তাঁর ৭১ উইকেট, রয়েছে পাঁচটি পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও।

কলম্বোয় প্রস্তুতি ম্যাচেও ভারতের দুই উইকেটকিপার-ব্যাটার ঋষভ পন্থ এবং ধ্রুব জুরেলকে আউট করেছিলেন মেন্ডিস। বাঁহাতি জয়সূর্য এবং ডানহাতি মেন্ডিসের ভিন্ন ধরনের স্পিন ভারতের ব্যাটারদের সমস্যায় ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন: বাবার শেষকৃত্য সেরেই মাঠে মেসি, আবেগঘন প্রত্যাবর্তনেও রক্ষা হল না মায়ামির—লিগ কাপ থেকে বিদায়

ভারতকে তাই প্রতিটি পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আক্রমণ করবেন, খুচরো রান নিয়ে চাপ কমাবেন, না কি ধৈর্য ধরে খারাপ বলের অপেক্ষা করবেন। সাম্প্রতিক অতীত অন্তত একটি শিক্ষা দিয়েছে— অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো মারাত্মক হতে পারে।

স্পিনের চ্যালেঞ্জ যে ভারতীয় দল যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই দেখছে, তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে দেবদত্ত পাডিক্কলের প্রস্তুতিতে। চলতি বছরের শুরুতে ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কায় লাল বলের সফরে এসেছিলেন তিনি। সেই সফরে স্থানীয় পরিবেশে স্পিন সহায়ক উইকেটে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর কাজে লাগতে পারে।

শুধু তা-ই নয়, শ্রীলঙ্কা সফরের আগে লাল কোকাবুরা বলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজের ছোটবেলার কোচ মহম্মদ নাসিরউদ্দিনের কাছেও অনুশীলন করেছেন পাডিক্কল। বিভিন্ন ধরনের স্পিনের বিরুদ্ধে নিজের কৌশল নিয়েও আলাদা করে কাজ করেছেন তিনি। শোনা গিয়েছে গত কয়েক দিনে ভারতীয় ব্যাটাররা এবরো-খেবরো উইকেটে ও ভিজে বলে অনুশীলন করে স্পিনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেছেন।

কলম্বোয় পৌঁছে ভারত যে চার দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে, তাতে অবশ্য জয় পায় তারা। ফলে শ্রীলঙ্কার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন ব্যাটাররা। কিন্তু সেই ম্যাচের উইকেট ও টেস্ট ম্যাচের উইকেট এক হবে না, এমনই ধরে নিচ্ছেন গৌতম গম্ভীর ও তাঁর সাপোর্ট স্টাফ। গল ও কলম্বোর উইকেটে অনেক বেশি ঘূর্ণি থাকবে বলেই তাঁদের অনুমান, যা নিয়ে বেশ চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা।

গলে জয়সূর্যের (Prabhat Jayasuriya) ঘূর্ণি এবং কলম্বোয় মেন্ডিস-সহ শ্রীলঙ্কার স্পিন আক্রমণ। ভারতের সাফল্য নির্ভর করবে বল কতটা ঘুরছে তার উপর নয়, বরং সেই ঘূর্ণিকে কতটা ঠান্ডা মাথায় সামলাতে পারছেন ব্যাটাররা, তার উপর।

স্যান্টনার, আজাজ এবং হার্মার-রা সম্প্রতি যে শিক্ষা দিয়েছেন ভারতীয় ব্যাটারদের, সেই শিক্ষা যদি ভারত নিতে পারে, তা হলে জয়সূর্য-মেন্ডিসদের মোকাবিলা করা হয়তো সম্ভব হবে। কিন্তু সেই পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে শ্রীলঙ্কার এই সিরিজ ভারতের ব্যাটারদের কাছে কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

দেখুন: ডাক পরিষেবায় প্রযুক্তির ছোঁয়া, ড্রোনে পৌঁছচ্ছে প্রত্যন্ত ভারতের চিঠি