জাতীয় দলের ম্যাচের রেফারিদের ‘যৌন পরিষেবা’ দিত কোরিয়া! বিস্ফোরক তথ্য উঠে আসতেই তোলপাড় সে দেশে

Photo: X

দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলে নতুন করে বিস্ফোরণ। আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে বিদেশি রেফারি ও ম্যাচ অফিসিয়ালদের ‘বিশেষ আপ্যায়ন’-এর নামে যৌন পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে দেশের ফুটবল সংস্থার বিরুদ্ধে। অতীতের সেই ঘটনা এত দিন কার্যত চাপা পড়ে থাকলেও সম্প্রতি এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগের জেরে শেষ পর্যন্ত ক্ষমাও চাইতে হয়েছে কোরিয়া ফুটবল সংস্থাকে (KFA)।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম JTBC-র তদন্তে দাবি করা হয়েছে, ২০১১-র মার্চ থেকে ২০১২-র মার্চের মধ্যে অন্তত সাতটি আন্তর্জাতিক ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিদেশ থেকে আসা রেফারি ও ম্যাচ অফিসিয়ালদের জন্য এই ধরনের ‘অনৈতিক বিনোদনের’ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঘটনাগুলির মধ্যে ছিল ২০১৪-র ব্রাজিল বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব এবং ২০১২-র লন্ডন অলিম্পিক্সের বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচও।

অভিযোগের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি আর্থিক লেনদেনকে ঘিরে। তদন্তে পাওয়া ক্রেডিট কার্ডের হিসাব এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রীড়া মন্ত্রকের পুরনো অডিট নথির ভিত্তিতে জানা গিয়েছে, KFA-র কর্পোরেট কার্ড ব্যবহার করে ম্যাসাজ পার্লারের খরচ মেটানো হয়েছিল। সেই পরিষেবার সঙ্গে যৌন পরিষেবা যুক্ত থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই খাতে কয়েক লক্ষ দক্ষিণ কোরীয় ওন খরচ হয়েছিল।


অভিযোগ, এই সময়ে জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইরান, বাহরিন এবং উজবেকিস্তান-সহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০ জন রেফারি এই ধরনের আপ্যায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন শহরে— সোল, চ্যাংওন এবং উলসানে— ম্যাচের আগে এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বিষয়টি শুধু সাধারণ প্রীতি ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বলেই বিতর্ক আরও বেড়েছে। অভিযোগে উঠে এসেছে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব এবং ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক্সের বাছাইপর্বের ম্যাচের কথাও। অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ম্যাচ পরিচালনাকারী বিদেশি রেফারিদের এই ধরনের আপ্যায়ন করা হত বলে অভিযোগ। এখনও সেই প্রথা চালু রয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি।

একটি ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া কুয়েতকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল। তবে এই ধরনের ‘আপ্যায়নের’ ফলে মাঠের সিদ্ধান্ত বা ম্যাচের ফল কোনও ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরও পাওয়া যায়নি।

তদন্তে দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল প্রশাসনের এক প্রাক্তন কর্মকর্তার বক্তব্যও সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, সেই সময় এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যত ‘প্রচলিত রীতি’ হিসাবেই দেখা হত। এই মন্তব্য সামনে আসার পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে— বিদেশি রেফারিদের সন্তুষ্ট রাখার নামে কোনও প্রতিষ্ঠিত রীতি থাকলেও, তা কি আন্তর্জাতিক ফুটবলের নৈতিকতা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বিশেষ করে যখন সেই খরচ একটি ফুটবল সংস্থার কর্পোরেট কার্ড থেকে মেটানো হয়েছে বলে অভিযোগ, তখন বিষয়টি নিছক ‘আতিথেয়তা’র গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

প্রায় ১৫ বছর আগের ঘটনা এবং প্রায় এক দশক পুরনো সরকারি তদন্তের তথ্য এখন নতুন করে জনসমক্ষে আসায় চাপ বেড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল প্রশাসনের উপর। বিতর্ক ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষমা চেয়েছে KFA। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, বহু বছর আগের এমন ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসায় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার জন্য তারা দুঃখিত।

KFA-র মূল বক্তব্য, ‘প্রায় ১৫ বছর আগে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে এখন সংস্থার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কঠোর নীতি চালু করা হয়েছে’।আরও জানানো হয়েছে, অতীতে যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, বর্তমানে এ ধরনের অনুপযুক্ত বিনোদন বা সেই উদ্দেশ্যে সংস্থার কর্পোরেট কার্ড ব্যবহারের ঘটনা আর ঘটে না।

দেড় দশক আগের এই ‘বিশেষ আপ্যায়ন’-এর অভিযোগ নতুন করে সামনে এসে আরও বড় অস্বস্তিতে ফেলেছে দেশের ফুটবল সংস্থাকে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে রেফারিদের আতিথেয়তার নামে ঠিক কতটা দূর গিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল প্রশাসন? আর এত বছর ধরে সেই তথ্য কেন জনসমক্ষে আসেনি? তদন্তের পুরনো নথি নতুন করে সামনে আসার পরে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলপ্রেমীরাও।