কোচ গম্ভীরকে নিয়ে বোর্ডে নালিশ সিনিয়র ক্রিকেটারদের, অসন্তোষ লক্ষণদের কাজ নিয়েও, সমস্যায় ভারতীয় ক্রিকেট

Photo: X

আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে ‘দুঃস্বপ্নের’ সফরের পর থেকেই বোধহয় ভারতীয় ক্রিকেটে শনির দশা শুরু হয়ে গিয়েছে। চারদিক থেকে বিভিন্ন মহলের অসন্তোষের খবর পাওয়া গিয়েছে।

খোদ ভারতীয় ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমেই নাকি অশান্তির আঁচ পাওয়া গিয়েছে। হেড কোচ গৌতম গম্ভীরের কাজের ধরন ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভারতীয় দলের একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার বিসিসিআইয়ের শীর্ষ কর্তাদের কাছে নালিশ করেছেন বলে খবর। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতীয় ক্রিকেট মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। অসন্তোষ ক্রিকেটারদের চোট সামলানোর পদ্ধতি নিয়েও। অনেকের অভিযোগ যারা এই দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরা হয়তো ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না।

অসন্তোষ ১:


বিভিন্ন সূত্রের দাবি, অভিযোগের মূল বিষয় গম্ভীরের কোচিং পদ্ধতি নয়, বরং তাঁর কঠোর এবং অনেক ক্ষেত্রেই একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা এবং জেদ। কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের মতে, দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আলোচনা বা মতামত বিনিময়ের চল এখন অনেক কমে গিয়েছে। ফলে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি গুমোট হয়ে উঠেছে।

সূত্রের খবর, এই বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার সরাসরি বোর্ডের কর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যদিও তাঁরা কোচ পরিবর্তনের দাবি জানাননি। বরং দলের স্বার্থে কোচ ও ক্রিকেটারদের মধ্যে আরও খোলামেলা সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার আবেদন জানিয়েছেন।

গম্ভীর ২০২৪ সালে ভারতের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দলের খেলার ধরনে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। আক্রমণাত্মক মানসিকতা, ফিটনেসের উপর বাড়তি জোর এবং কঠোর শৃঙ্খলার নীতি তাঁর কোচিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাফল্যও এসেছে। তবে সেই কঠোর পদ্ধতিই এখন দলের একাংশের মধ্যে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

যদিও বিসিসিআই বা গৌতম গম্ভীর— কোনও পক্ষই এখনও এই খবর নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেনি। বোর্ডের অন্দরেও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে শোনা গিয়েছে এই নালিশ জানার পর গম্ভীরকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে এবং নিজেকে শোধরানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় দল আগামী গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সিরিজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার আগে ড্রেসিংরুমে এই ধরনের খবর সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, দলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে এর কোনও প্রভাব পড়বে কি না। এখন নজর, বিসিসিআই এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় এবং কোচ-ক্রিকেটার সম্পর্কে আদৌ কোনো উন্নতি হয় কি না।

অসন্তোষ ২:

শুধু গম্ভীরের কোচিং নিয়ে নয়, অসন্তোষ জসপ্রীত বুমরার সাম্প্রতিক চোট নিয়েও। তাঁর চোট শুধু ভারতীয় দলের পেস আক্রমণকেই দুর্বল করেনি, প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বোর্ডের ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ (CoE)-এর স্পোর্টস সায়েন্স ও মেডিক্যাল বিভাগকেও। অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তাদের নিয়েও।

শ্রীলঙ্কায় টেস্ট সিরিজ থেকে বুমরাহ-র ছিটকে যাওয়ার পর বোর্ডের অন্দরে শুরু হয়েছে জোর পর্যালোচনা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, চোটের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে নির্বাচক কমিটি এবং স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি কীভাবে তৈরি হল?

বোর্ড সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথমে জাতীয় নির্বাচক কমিটিকে জানানো হয়েছিল যে, ১৫ আগস্ট থেকে শ্রীলঙ্কা সিরিজে একটি টেস্টে বুমরাহকে পাওয়া যাবে। পরে হঠাৎই জানানো হয়, তাঁর চোট প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর। এই অবস্থার জেরেই CoE কর্তাদের সঙ্গে প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকরের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। কিন্তু বুমরাহকে পাওয়া যায়নি।

ফলে প্রশ্ন উঠছে CoE-র স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের কার্যকারিতা নিয়ে। নীতিন পটেল দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে স্থায়ী প্রধান ছাড়াই চলছে এই বিভাগ। বর্তমানে অন্তর্বর্তী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ধনঞ্জয় কৌশিক। তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও, ক্রিকেটারদের রিহ্যাবের সময়সীমা নির্ধারণ এবং ‘রিটার্ন টু প্লে’ প্রোটোকল ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

শুধু বুমরাহ নন, হর্ষিত রানাকে সম্পূর্ণ ফিট ঘোষণা করার পরও তাঁর হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট ফিরে আসে। ওয়াশিংটন সুন্দরের বারবার একই ধরনের চোটও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আবার নীতীশ কুমার রেড্ডিকে বোলিংয়ে গতি বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়ার অনুমতি কীভাবে দেওয়া হল, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বোর্ডের একাংশের মতে, এই ঘটনাগুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ফিটনেস ম্যানেজমেন্টে কোথাও না কোথাও গলদ রয়েছে।

এদিকে ভারতীয় দলের ফিজিও কমলেশ জৈনের ভূমিকাও পর্যালোচনার আওতায় এসেছে। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন চোটের ঘটনার জেরে তাঁর কাজ নিয়েও আলোচনা হবে বলে বোর্ড সূত্রের খবর।

ইংল্যান্ড সফরের ব্যর্থতার পর বোর্ড একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেখানে গম্ভীর, আগারকর, লক্ষ্মণ এবং বোর্ড সচিব দেবজিৎ সইকিয়ার উপস্থিত থাকার কথা।