লাল-হলুদের ‘মাস্টার’-এর বিরুদ্ধে অস্কার ব্রুজোঁর এক ঝাঁক অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় ময়দান, কী এমন লিখলেন প্রাক্তন কোচ?

Oscar Bruzón Photo-SNS

কথায় আছে ‘মেঘ না চাইতেই জল’। কিন্তু একে ‘মেঘ না চাইতেই বজ্রপাত’ বললে বোধহয় বিন্দুমাত্র ভুল হয় না। ইস্টবেঙ্গলকে আইএসএল খেতাব এনে দেওয়া স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোঁ হঠাৎ যে এ ভাবে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের আভ্যন্তরীন বিষয়ের ওপর থেকে পর্দা উন্মোচন করবেন এবং ক্লাবের এক ‘মাস্টার’-এর কাণ্ড কারখানা প্রকাশ্যে নিয়ে চলে আসবেন, তা কেউ কখনও ভাবতে পেরেছিলেন? বোধহয় না।

সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে তিনি তাঁর ইস্টবেঙ্গলে কাটানো দিনগুলির স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে এই ‘মাস্টার’-কে তুলে ধরেছেন, যা নিয়ে ক্লাবেও বেশ তটস্থ সবাই। শুক্রবার বিকেলে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে গিয়ে কয়েকজন সদস্য ও কর্তাদের কাছে এই প্রসঙ্গটি তুলতেই তাঁরা প্রায় পালিয়ে বাঁচলেন। ‘মাস্টার’-এর কথা শুনেই ছিটকে যান তাঁরা। ‘মাস্টার’ কি তা হলে লাল-হলুদ তাঁবুতে এক ত্রাসের নাম, যাঁর বিরুদ্ধে একটি শব্দও বলা যাবে না?

কী এমন লিখেছেন অস্কার ব্রুজোঁ?


তাঁর বক্তব্য, ‘সাফল্য কখনও তাঁর স্বার্থ ছিল না। প্রথম বার দল গঠনের ক্ষেত্রে ‘মাস্টার’-এর কোনও অর্থবহ ভূমিকা ছিল না। ফলে মরসুম সফল হলে প্রমাণ হয়ে যেত যে, দল গঠন, খেলোয়াড় নিয়োগ এবং খেলা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব ছাড়াও ক্লাব কার্যকর ভাবে চলতে পারে’।

শুরুটাই এমন চাঁছাছোলা যার, তিনি কী উদ্দেশ্য নিয়ে লিখতে বসেন, তা আন্দাজ করে নিতে খুব একটা অসুবিধা হয় না বোধহয়।

অস্কারের লেখা এগিয়েছে এ ভাবে, ‘আগে খেলোয়াড় কেনাবেচায় কত বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে, তা ইনভেস্টররা বুঝেছিল এবং স্কাউটিং ও রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়াকে পেশাদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটিই বোধহয় সরাসরি পুরনো ব্যবস্থার পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। ‘মাস্টার’-কে নিয়মিত ভাবে তাঁর নিজের নেটওয়ার্ক, লবি এবং পছন্দের এজেন্ট-ব্রোকারদের সঙ্গে যুক্ত খেলোয়াড়দের সমর্থন করতে দেখা যেত’।

এ পর্যন্ত পড়েই ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা স্পষ্ট হয়ে যায়, এই ‘মাস্টার’ আসলে কে।

প্রাক্তন লাল-হলুদ কোচ আরও লেখেন, ‘এই ধরনের অ্যাজেন্ডা শুধু একটি ক্লাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দুর্বল কাঠামোর ফুটবল সংগঠনগুলিতে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি ছবি, যেখানে খেলোয়াড় নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকে না। এই মডেলটি নির্ভর করে একের পর এক ট্রান্সফার উইন্ডোয় খেলোয়াড় বদলের উপর। নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে আসা, পরে প্রয়োজনমতো তাঁদের অযোগ্য বা ব্যর্থ প্রমাণ করা এবং তার পর আবার নতুন করে খেলোয়াড় নিয়োগের চক্র শুরু করা—এটাই হয়ে ওঠে নিয়ম। দলের সত্যিকারের উন্নতি করতে পারে এমন খেলোয়াড় খোঁজার চেয়ে দামি নাম এবং বড় মাপের ট্রান্সফার অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একই সঙ্গে, যে সমস্ত পেশাদার নিজেদের যোগ্যতায়, প্রতিষ্ঠিত পছন্দের এজেন্ট বা ব্রোকারদের নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে ক্লাবে আসেন, তাঁরা ক্লাবে পা রাখার পর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। এর ফলে নিয়মিত খেলোয়াড় পরিবর্তনই স্বাভাবিক হয়ে যায়, আর দলের মাঠের পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘমেয়াদি ভাবে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলা হয়ে পড়ে গৌণ ব্যাপার’।

ইস্টবেঙ্গলের দল বাছাইয়ে কি তা হলে এই পদ্ধতিই চলত এতদিন? অস্কার ব্রুজোঁর এই পোস্টে স্বাভাবিক ভাবেই ওঠে এই প্রশ্ন।

প্রাক্তন কোচ এ বার আরও আগ্রাসী। লিখেছেন, ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য দলের ব্যর্থ হওয়া প্রয়োজন ছিল। আমার মূল্যায়ন, খারাপ ফলাফল এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করত, যেখানে ‘মাস্টার’ আবার খেলোয়াড় নিয়োগ এবং ট্রান্সফারের ওপর নিজের প্রভাব ফিরে পেতে পারতেন। আমি তাঁর দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ না করার পর, এই মরসুমে আমরা দেখেছি যে ওই সমস্ত কর্মকাণ্ডে তিনি আবার উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফিরে পেয়েছেন’।

গোপন তথ্য ফাঁসের মারাত্মক অভিযোগও এনেছেন অস্কার। লিখেছেন, ‘কোচিং স্টাফের ভিতরের তথ্য বাইরে ফাঁস করা হচ্ছিল। স্টাফদের মধ্যে বা আশপাশে থাকা কিছু ব্যক্তি আভ্যন্তরীণ তথ্য ‘মাস্টার’-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। আমরা যখন সেই তথ্য ফাঁসের উৎস চিহ্নিত করি, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের গ্রুপগুলি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়’।

এখানেই শেষ নয়। আরো লিখেছেন প্রাক্তন কোচ। ‘বেশ কয়েক বার আমাকে ‘মাস্টার’-কে ড্রেসিংরুম থেকে বের করে দিতে হয়েছিল। তিনি ড্রেসিংরুমে ঢুকে খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফের সদস্যদের সমালোচনা করতেন। এর ফলে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল এবং কাজের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছিল। আমি বিষয়টিকে একেবারেই গ্রহণযোগ্য মনে করিনি এবং দলকে রক্ষা করার জন্য হস্তক্ষেপ করেছিলাম’।

সব শেষে এনেছেন মরসুমের শেষ ম্যাচের প্রসঙ্গ। সেই ম্যাচে কী হয়েছিল? অস্কার লিখেছেন, ‘সেই ম্যাচের আগে ‘মাস্টার’ স্টাফের বেশ কয়েক জন সদস্যকে বলেছিলেন যে, রেফারি নাকি আমাদের পক্ষ নেবেন। সেই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। যাঁরা ম্যাচটি দেখেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই বুঝতে পেরেছেন যে রেফারি স্বাধীন ভাবেই ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন। তবুও এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, দলের অভ্যন্তরে কী ধরনের বয়ান এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হত’।

কে সেই ‘মাস্টার’, তা যেমন অস্কার ব্রুজোঁও লেখেননি, তেমনই ক্লাবের কারো বলার সাহসও নেই। তবে অনুমান করতে পারছেন অনেকেই।

শুক্রবার যখন ক্লাবের অন্যতম প্রধান কর্তা দেবব্রত সরকারের (যাঁকে সবাই নিতু ডাকনামে চেনে) কাছে অস্কারের এই এক ঝাঁক অভিযোগ সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি বলেন, ‘অস্কার আমাদের আইএসএল এনে দিয়েছেন। তিনি আমাদের নয়নের মণি। আমরা সবাই ওকে হৃদয়ে রাখব। অস্কার কী বললেন, সেটা নিয়ে আমাদের কোনও বক্তব্য নেই’।

পাশাপাশি, কিছুটা শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে দেবব্রত সরকারের প্রশ্ন, ‘বর্তমানে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে অস্কার ব্রুজোঁর অস্তিত্ব কী?’

প্রশ্ন উঠছে কে এই ‘মাস্টার’? ইস্টবেঙ্গলের শীর্ষকর্তার জবাব, ‘উনি কাকে মাস্টার বলেছেন- তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না। আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ নেই। উনি কী বলেছেন, উনি কী করেছেন, তার ব্যাখ্যা উনিই দেবেন। অস্কার ব্রুজোঁ জিন্দাবাদ।’

প্রাক্তন কোচ এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নন ঠিকই। কিন্তু তাঁর কথাগুলো এবং তাঁর ‘ফাঁস’ করা ঘটনাগুলি অস্তিত্বহীন কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আন্তোনিও লোপেজ হাবাস কি এসব জানেন?