দাবার বোর্ড মাতানোর পর এবার ভোটে দাঁড়াচ্ছেন বিশ্বনাথন আনন্দ, কঠিন লড়াইয়ে পারবেন জিততে?

Photo: X

অনেক তো হল কিস্তিমাত। এ বার বরং নির্বাচনের লড়াইয়ে নেমে দেখলে কেমন হয়? বোধহয় এমনই ভেবেছেন ‘বিশ্বের বিস্ময়, ভারতের আনন্দ’ বিশ্বনাথন আনন্দ। তাই আর বোর্ডে বসে না থেকে সরাসরি নেমে পড়ছেন ভোট-যুদ্ধে।

তবে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক ভোট-যুদ্ধে নেমে পড়ছেন, এমন ভাববেন না যেন। এ হল বিশ্ব দাবার সর্বোচ্চ মঞ্চে নেতৃত্বের লড়াই। আবার তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় দাবায় জড়িয়ে থাকা তিন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ।

এ পর্যন্ত পড়ে ধোঁয়াশা না কাটলে বরং খুলেই বলা যাক। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ফিডে (FIDE)-র নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। ফুটবলের যেমন ফিফা, ক্রিকেটের যেমন আইসিসি, তেমনই দাবার বিশ্ব নিয়ামক সংস্থা এই ফিডে। আর সেই নির্বাচনের অন্যতম আকর্ষণ পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বিশ্বনাথন আনন্দ। প্রথমে নির্বাচনে না লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে মত বদলে আবার ভোটের ময়দানে নেমেছেন তিনি। তবে এ বার লড়াইটা কিন্তু মোটেই সহজ নয়।


২৬ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের সমরকন্দে ফিডে-র বার্ষিক সাধারণ সভায় হবে এই ভোটের লড়াই। প্রতিটি সদস্য ফেডারেশনের একটি করে ভোট রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পদে ত্রিমুখী লড়াই। জার্মানির দুই ব্যবসায়ী ইয়ান হেনরিক বুয়েতনার ও ভাদিম রোজেনস্টাইন এবং কাজাখস্তানের ব্যবসায়ী তিমুর তুর্লভ—এই তিন জন লড়ছেন ফিডে-র সর্বোচ্চ পদে। এই লড়াইয়ে অবশ্য নেই আনন্দ। ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়ছেন তিনি।

হ্যাঁ, পুনর্নির্বাচনের জন্যই। কারণ, তিনি ইতিমধ্যেই ফিডে-র অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এই ভোটযুদ্ধে আনন্দের সঙ্গে রয়েছেন আরো দুই ভারতীয়।

প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বিশ্বনাথন আনন্দ তো ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়ছেন। এ ছাড়াও রয়েছেন ভরত সিংহ চৌহান, যিনি সর্বভারতীয় দাবা ফেডারেশনের (AICF) প্রাক্তন সচিব। এবং এই নির্বাচনে ফিডে-র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী। AICF-এর প্রাক্তন আইনি উপদেষ্টা এবং দেবভূমি চেস অ্যাসোসিয়েশন, উত্তরাখণ্ডের সভাপতি সঞ্জয় চাড্ডাও রয়েছেন এই লড়াইয়ে। তিনি আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী।

আনন্দের ক্ষেত্রে অবশ্য গল্পটা একটু আলাদা। জুনে তিনি জানিয়েছিলেন, তৃতীয় বারের জন্য ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন না। কিন্তু ফিডে প্রেসিডেন্ট আর্কাদি দভোরকোভিচ নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত কাজাখস্তান চেস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট তিমুর তুর্লভের নেতৃত্বাধীন প্যানেলে ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হয়েছেন আনন্দ।

প্রেসিডেন্ট পদে কারা?

ফিডে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তিনটি প্যানেল হল:

ইয়ান হেনরিক বুয়েতনার — প্রেসিডেন্ট; ম্যালকম পেইন — ডেপুটি প্রেসিডেন্ট
ভাদিম রোজেনস্টাইন — প্রেসিডেন্ট; গর্ডন ট্যাং — ডেপুটি প্রেসিডেন্ট
তিমুর তুর্লভ — প্রেসিডেন্ট; বিশ্বনাথন আনন্দ — ডেপুটি প্রেসিডেন্ট
বুয়েতনার ২০২৪-এ ‘ফ্রিস্টাইল চেস গোট চ্যালেঞ্জ’ আয়োজন করেছিলেন। রোজেনস্টাইনের সংস্থা ‘ডব্লিউআর চেস’ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় দাবার প্রতিযোগিতা আয়োজন করে এবং শিশু ও তরুণ প্রতিভাদেরও সাহায্য করে। তুর্লভ কাজাখস্তানের দাবা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত এবং এ বার প্রেসিডেন্ট পদের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার।

এখন প্রশ্ন, আনন্দ জিতলে ভরত চৌহানের কী হবে?

এখানেই নির্বাচনের অঙ্ক আরও জটিল। ফিডে-র নিয়ম অনুযায়ী, একই সদস্য ফেডারেশনের একের বেশি প্রতিনিধি একই সময়ে ফিডে কাউন্সিলে থাকতে পারেন না—ফিডে কন্টিনেন্টের প্রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম রয়েছে।

ফলে তুর্লভের প্যানেল জিতলে আনন্দ ডেপুটি প্রেসিডেন্ট হবেন। সে ক্ষেত্রে ভারতের আর এক প্রার্থী ভরত সিংহ চৌহানের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করার যোগ্যতা আর থাকবে না।

চৌহান অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি আনন্দের অনেক আগেই নিজের মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। বলেন, ‘আমার মনোনয়ন আনন্দ তাঁর কাগজ জমা দেওয়ার অনেক আগেই জমা পড়েছিল’। তাঁর মনোনয়নকে সমর্থন করেছে এসোয়াতিনি, মালয়েশিয়া, মরিশাস, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ডের জাতীয় দাবা ফেডারেশন। চৌহানের দাবি, AICF-এর সমর্থন তিনি চাননি।

ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে মোট ১৮ জন প্রার্থী রয়েছেন। ফলে চৌহানের সামনে লড়াই সহজ নয়। অন্য দিকে, চীনের প্রাক্তন মহিলা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইউহুয়া শুর ক্ষেত্রেও একই রকম অঙ্ক রয়েছে। রোজেনস্টাইনের প্যানেল জিতলে গর্ডন ট্যাং ডেপুটি প্রেসিডেন্ট হবেন এবং সে ক্ষেত্রে শু-র মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাবে।

কিন্তু আনন্দ ফিরে এলেন কেন?

আনন্দের নির্বাচনী প্রত্যাবর্তন নিয়েও রয়েছে নানা ব্যাখ্যা। দাবা মহলের একাংশের মতে, তাঁর এই সিদ্ধান্ত অনেকটা ‘নাইটের চালের’ মতো— অপ্রত্যাশিত এবং সব হিসাব উল্টে দেওয়ার মতো। তুর্লভের প্যানেলে আনন্দের উপস্থিতি নির্বাচনী সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে।

অন্য একটি মত হল, পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আনন্দ তুর্লভের প্যানেলের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর’-এর মতো। তাঁর জনপ্রিয়তা, পরিচিতি এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তুর্লভের প্রচারে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

তবে শুধু জনপ্রিয় নাম দিয়ে ফিডে নির্বাচন জেতা যায় কি? ২০১৪-য় আর এক কিংবদন্তি গ্যারি কাসপারভও প্রেসিডেন্ট পদে লড়েছিলেন। কিন্তু জিততে পারেননি।

আসলে ফিডে-র এই নির্বাচন শুধু দাবার বোর্ডে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণও ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দাবা প্রশাসনের এক কর্তা যেমন বলেছেন, ‘আসল লড়াই তুর্লভ-আনন্দ এবং রোজেনস্টাইন-ট্যাংয়ের মধ্যে। চিনের ধনকুবের ট্যাং এশিয়ান অলিম্পিক কাউন্সিলেরও পদাধিকারী। শোনা যাচ্ছে, তিনি প্রচারে তাঁর সেই পদের প্রভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন’।

গ্র্যান্ডমাস্টার এবং ফিডে-র প্রাক্তন ডেপুটি প্রেসিডেন্ট বাশার কৌয়াতলির মতে, ‘লড়াইটা এখন পুরোপুরি ওপেন। ফিডে প্রেসিডেন্ট আর্কাদি দভোরকোভিচ যদি লড়তেন, তা হলে তাঁর দলের হাতে বর্তমান পদাধিকারীর বাড়তি সুবিধা থাকত। কিন্তু এখানে তো কেউই সেই সুবিধা পাবেন না’।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন দভোরকোভিচ সাম্প্রতি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আছেন বলে তিনি নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান এবং ফিডে প্রেসিডেন্ট হিসাবে আর কাজ চালিয়ে যেতে রাজি হননি। পদত্যাগ অবশ্য করেননি। সেই পরিস্থিতিতেই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান আনন্দ।

১৫-২০ ভোটেই কি জয়-পরাজয়ের ফয়সালা?

নির্বাচনের অঙ্ক এতটাই হাড্ডাহাড্ডি যে ১৫ থেকে ২০ ভোটই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের ফারাক গড়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের কথায়, ‘ইউরোপের ভোট রোজেনস্টাইন এবং বুয়েতনারের মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে। একই ভাবে এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকা মহাদেশের ভোটও তুর্লভ এবং বুয়েতনারের মধ্যে ভাগ হবে’।

ফলে আনন্দের সামনে যে কঠিন লড়াই, তা বলাই যায়। এক দিকে তাঁর নিজের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদ ধরে রাখার লড়াই, অন্য দিকে তাঁর জয়-পরাজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ভরত চৌহানের নির্বাচনী ভবিষ্যৎও। সব মিলিয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর সমরকন্দে ফিডে-র ভোটে ভারতীয় দাবার নজর থাকবে একই সঙ্গে এই তিন ফলের দিকে।