বিশ্বকাপ জেতার পর সাধারণত ফুটবলাররা ট্রফি নিয়ে উদ্যাপন করেন, পদক গলায় ঝুলিয়ে ছবি তোলেন। কিন্তু স্পেনের বিশ্বজয়ের পর আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক অন্য প্রতিশ্রুতি। দলের ঝাঁকরা চুলের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়াকে এবার নিজের শরীরে স্পেনের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তের মুখের ট্যাটু করাতে হবে!
স্পেন বিশ্বকাপ জিততে পারলে যে এমনই করবেন, সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কুকুরেয়া। আর আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এখন সেই কথাই মনে করিয়ে দিলেন খোদ কোচই। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে এক সাক্ষাৎকারে কুকুরেয়া বলেছিলেন, স্পেন যদি ট্রফি জেতে, তা হলে তিনি কোচ দে লা ফুয়েন্তের মুখের একটি ছোট ট্যাটু নিজের শরীরে আঁকিয়ে নেবেন। সেই সময় অনেকেই মন্তব্যটিকে নিছক মজার ছলে করা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি যে ভোলেননি কোচ, তা বোঝা গেল বিশ্বজয়ের পর তাঁর সাংবাদিক বৈঠকে।
৬৫ বছর বয়সি দে লা ফুয়েন্তে হেসে বলেন, ‘ট্যাটু করানোর বয়স আমার আর নেই। কিন্তু আমার ফুটবলাররা কথার দাম দেয়। আমি জানি, ওরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি রাখবে। ওরা একটা ভুল করেছে, এখন সেই কথাই রাখতে হবে। আমি অতটা কুৎসিতও নই!’
এরপর সাংবাদিকরা মজা করে কোচকে প্রশ্ন করেন, কুকুরেয়ার শরীরের কোন জায়গায় নিজের মুখের ট্যাটু দেখতে চান তিনি? উত্তরে দে লা ফুয়েন্তেও রসিকতার সুরে বলেন, ‘হয়তো শরীরের এমন কোনও জায়গায়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে একটা কথা বললে সেটা রাখতেই হবে’।
এই বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে দে লা ফুয়েন্তের মুকুটে যোগ হল আরও একটি পালক। তাঁর কোচিংয়েই ২০২৪-এ ইউরো জিতেছিল স্পেন। এবার বিশ্বকাপও জিতে ইতিহাস গড়ল ‘লা রোহা’। ফলে স্পেনের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম স্থপতি হিসেবে আরও একবার প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন তিনি।
এখন অবশ্য স্পেনের সমর্থকদের কৌতূহল একটাই— কুকুরেয়া সত্যিই কি প্রতিশ্রুতি রাখবেন? যদি রাখেন, তা হলে কোচের মুখের সেই ট্যাটু শরীরের ঠিক কোন জায়গায় দেখা যাবে?
‘আমরা এক পরিবার’
স্পেনের কোচের দাবি, এই সাফল্যের আসল রহস্য কৌশল, পরিসংখ্যান বা তারকা ফুটবলারদের প্রতিভা নয়— বরং দলের পারিবারিক বন্ধন। বিশ্বকাপ জয়ের পর সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানালেন, স্পেনের এই দলটা শুধু ফুটবলারদের একটি দল নয়, বরং ‘একটি পরিবার’। আর সেই ঐক্যই শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছে ‘লা রোহা’-কে।
ফাইনাল জয়ের পরে আবেগপ্রবণ হয়ে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার থেকেও বড় বিষয় হল দল হিসেবে একসঙ্গে থাকা। এই ছেলেরা শুধু সতীর্থ নয়, ওরা একে অপরের জন্য বাঁচে। ওরা সত্যিই একটা পরিবারের মতো’।
কোচের কথায়, টুর্নামেন্ট চলাকালীন তিনি বিশেষ ভাবে জোর দিয়েছিলেন দলের মধ্যে সম্পর্ক আরও মজবুত করার উপর। একসঙ্গে খাওয়া, সময় কাটানো, আলোচনা— সব কিছুর মধ্য দিয়েই ফুটবলারদের মধ্যে বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, কঠিন মুহূর্তে সেই সম্পর্কই দলকে বাড়তি শক্তি দিয়েছে।
ফাইনালের প্রসঙ্গ টেনে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘ম্যাচের অনেক সময়ই চাপ ছিল। প্রতিপক্ষে ছিল মেসির মতো কিংবদন্তি। কিন্তু আমি বেঞ্চ থেকে দেখছিলাম, আমাদের ফুটবলাররা একে অপরকে কীভাবে সাহস দিচ্ছে। সেই দৃশ্যই আমাকে বিশ্বাস করায় যে আমরা শেষ পর্যন্ত জিততে পারব’।
স্পেনের সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাও তুলে ধরেন তিনি। ২০২৪ সালে ইউরো জয়ের পর এবার বিশ্বকাপ— দুই বড় ট্রফিই এসেছে তাঁর কোচিংয়ে। তবে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের বদলে তিনি পুরো দলের প্রশংসাই করতে চান। ‘এই সাফল্য আমার নয়। এটা পুরো দলের, কোচিং স্টাফের, আর সেই সব মানুষের যারা প্রতিদিন এই ফুটবলারদের পাশে থেকেছে,’ বলেন স্পেন কোচ।
বিশ্বজয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও দে লা ফুয়েন্তের বার্তা ছিল স্পষ্ট— ফুটবলে শুধু প্রতিভা যথেষ্ট নয়, দরকার পারস্পরিক বিশ্বাস, আত্মত্যাগ এবং ঐক্য। আর সেই কারণেই, তাঁর ভাষায়, ‘এই স্পেন দলটা শুধু চ্যাম্পিয়ন নয়, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা একটি পরিবার’।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা
২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার কথা ভাবছেন কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে দে লা ফুয়েন্তে জানান, ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি কিছুটা সময় নিতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমরা ঠিক সেই জায়গাতেই পৌঁছেছি, যেখানে পৌঁছতে চেয়েছিলাম। এমন ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া সত্যিই আমাদের সৌভাগ্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। আগে এই সাফল্যটা উপভোগ করতে চাই। হয়তো সেপ্টেম্বরের ম্যাচগুলির কথা ভাবতে হবে, কিন্তু তার আগে এটা উপলব্ধি করা দরকার। কারণ, আমরা ইতিহাস গড়েছি। তাই আপাতত এক ম্যাচ করে এগোতেই চাই’।
ফাইনালের জয়সূচক গোলদাতা ফেরান তোরেস বলেন, টুর্নামেন্টে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গোল করতে পেরে তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।
তোরেসের কথায়, এই গোলটা স্পেনের ৪ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষের। এটা শুধু আমার নয়, এমনকি এই দলে থাকা ২৬ জন ফুটবলারেরও একার নয়। আমার বিশ্বাস, এই গোল হওয়ারই ছিল। ভাগ্যেই লেখা ছিল যে এটাই হবে জয়সূচক গোল’।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি ফাইনালই কঠিন। আর প্রতিপক্ষে যখন (আর্জেন্টিনার) লিওনেল মেসির মতো একজন ফুটবলার থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা স্নায়ুচাপ কাজ করে। তবে আমরা আরও ভাল ফুটবল খেলেছি’।