বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন নয়। গোললাইন প্রযুক্তি, ভার কিংবা সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেম ইতিমধ্যেই খেলার চেহারা বদলে দিয়েছে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে আরও এক ধাপ এগোতে চলেছে ফিফা। এবার মাঠে নামছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সমৃদ্ধ স্মার্ট বল ‘ট্রায়োন্ডা’ , যা রেফারিদের সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল এবং দ্রুত করে তুলবে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের অভাব নেই। ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে জিওফ হার্স্ট-এর সেই বিখ্যাত ‘ভূতের গোল’, ২০১০-এ ফ্রাঙ্ক লাম্পার্ডের জার্মানির বিরুদ্ধে স্পষ্ট গোল না দেওয়ার ঘটনা, মারাদোনার গোলে ‘ভগবানের হাত’ এবং অসংখ্য বিতর্কিত অফসাইড সিদ্ধান্ত—ফুটবলপ্রেমীরা এখনও সেসব ভুলতে পারেননি। সেই ধরনের বিতর্ক কমাতেই প্রযুক্তির উপর আরও বেশি নির্ভর করতে চাইছে ফিফা।
নতুন এআই-সমৃদ্ধ বলে একটি বিশেষ সেন্সর বসানো থাকবে, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার বলের গতিবিধি এবং স্পর্শ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। অর্থাৎ কোনও খেলোয়াড় ঠিক কখন বল স্পর্শ করলেন, বলের গতি বা দিক কতটা বদলাল—সব তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচ অফিসিয়ালদের কাছে পৌঁছে যাবে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা মিলবে অফসাইড নির্ধারণে। বর্তমানে VAR এবং সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও কোনও খেলোয়াড় বল স্পর্শ করার সুনির্দিষ্ট মুহূর্ত নির্ধারণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। স্মার্ট বল সেই সমস্যার সমাধান করবে। সেন্সর বল স্পর্শের সঠিক সময় জানিয়ে দেবে, ফলে অফসাইড সিদ্ধান্ত আরও নিখুঁত হবে।
শুধু অফসাইড নয়, স্মার্টবলের জন্য হ্যান্ডবল কিংবা পেনাল্টি সংক্রান্ত বিতর্কও কমতে পারে। কোনও খেলোয়াড়ের হাত বা শরীরের অন্য অংশে বল লেগেছে কি না, সেটিও প্রযুক্তি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারবে। ফলে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মানবিক ভুলের সম্ভাবনা কমবে।
তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও রেফারিদের হাতেই থাকবে। ফিফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এআই কেবল সহায়ক তথ্য দেবে। মাঠের রেফারি ও ভার কর্মকর্তারাই শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ ফুটবলের মানবিক উপাদান পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ প্রযুক্তিনির্ভর রেফারিংয়ের নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। ফিফার লক্ষ্য স্পষ্ট— বিতর্ক কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানো এবং ম্যাচের ফলাফলে ভুলের প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।তবে প্রশ্নও রয়েছে।
প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কি খেলার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করবে? দর্শকদের আবেগ কি আরও যান্ত্রিক হয়ে উঠবে? সেই বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার— ২০২৬ বিশ্বকাপে শুধুমাত্র ফুটবলাররাই নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এই বলও।কারণ, এবার বল শুধু গড়াবে না, বল কথাও বলবে ও তথ্যও দেবে। আর সেই কথা ও তথ্যই হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির ভিত্তি হয়ে উঠবে।