নিউজিল্যান্ডে পা রেখেই বিরাট-রোহিতরা বুঝে নিলেন কতটা আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন স্যান্টনাররা!

New Zealand's Record T20I Photo-SNS

বিরাট কোহলি অকল্যান্ডে পা রাখার দিনেই হারের মুখ দেখল ভারত। দুই ঘটনা কাকতালীয় হলেও কোনোটাই মিথ্যা নয়। তবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্তও নয়। শুক্রবার সকালে ফ্যানদের তুমুল হইচইয়ের মধ্যে অকল্যান্ড বিমানবন্দরে পা রাখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিউজিল্যান্ডের কাছে প্রথম হারের মুখোমুখি হয় ভারতীয় টি-টোয়েন্টি দল।

এ দিন চুনকামের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ইডেন পার্কে পা রাখলেও বোলার ও ব্যাটার—দুই বিভাগে ব্যর্থতাতেই ভারতের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, যা ওয়ান ডে সিরিজ শুরুর আগে খুব একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত নয়। উজ্জীবিত নিউজিল্যান্ডের কাছে ৮৭ রানে হারটা ভারতের ঘুম ভাঙানোর ফল বলা যেতেই পারে। নিউজিল্যান্ড চেষ্টা করলে কতটা আগ্রাসী হতে পারে, তারই ইঙ্গিত দিয়ে রাখল এই ম্যাচে। যা ওয়ান ডে সিরিজ শুরুর আগে প্রয়োজন ছিল।

টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে কুড়ি ওভারে সাত উইকেট হারিয়ে ২৫৯ রানের বিশাল ইনিংস গড়ে নিউজিল্যান্ড। অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার হয়তো ভেবেছিলেন তাঁর দলের ফর্মে থাকা ব্যাটাররা হয়তো যে কোনো রান তাড়া করে ম্যাচ জিতে নিতে পারবেন। কিন্তু সবসময় যে তা সম্ভব নয়, সেদিকটা ভেবে দেখেননি। ফলে তাদের নির্ধারিত ২০ ওভারে ১৭২-৯-এর বেশি তুলতে পারেনি।


গত ম্যাচে বৈভব সূর্যবংশী ভালো ব্যাটিং করা সত্ত্বেও তাঁকে এই ম্যাচে বসিয়ে রেখে দল নামানোর ফলেই যে ম্যাচ হারল ভারত, তা বলা যায় না। এই হারের কারণ একাধিক। বোলারদের ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা তো চলছেই। এতদিন সেই ব্যর্থতা ঢাকার কাজটা করছিলেন ব্যাটাররা। এ বার সিরিজ জয়ের আত্মতুষ্টিতে ব্যাটাররাও ঝিমিয়ে পড়লেন এবং প্রায় আত্মসমর্পণ করার মতো করেই ম্যাচটা হেরে বসলেন।

ঝড়ের নাম ফিলিপস-ব্রেসওয়েল

প্রথম তিন ম্যাচে ব্যাট হাতে যে দাপট দেখিয়েছিল ভারত, একের পর এক ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিধ্বস্ত করেছিলেন শুভমান-শ্রেয়সরা, ইডেন পার্কে চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে সেই ছবি উধাও। এ বার ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ করতে দেখা গেল নিউজিল্যান্ডকে। গ্লেন ফিলিপ্‌সের বিধ্বংসী সেঞ্চুরি এবং মাইকেল ব্রেসওয়েলের ঝোড়ো হাফ সেঞ্চুরিতে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজেদের সর্বোচ্চ রান তোলে কিউইরা। যার ভার রাখতে না পেরে ৮৭ রানে হারে ভারত।

ইডেন পার্কে কানায় কানায় পূর্ণ গ্যালারির সামনে এ দিন টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন ভারত অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার। শুরুটা অবশ্য খারাপ করেননি ভারতীয় বোলাররা। ভুবনেশ্বর কুমারের পরিবর্তে দলে সুযোগ পাওয়া ময়াঙ্ক যাদব প্রথম ওভারেই টিম সেইফার্টকে ফিরিয়ে দেন। ড্যারিল মিচেল ময়াঙ্কের পরের ওভারে চার বলে ২০ রান তুললেও নিখুঁত ইয়র্কারে তাঁকে এলবিডব্লিউ-র ফাঁদে ফেলেন ভারতীয় পেসার।

ফিন অ্যালেনের ব্যাটে অবশ্য রান উঠতে থাকে দ্রুত। পাওয়ার প্লে-তে ২ উইকেটে ৬৭ রান তুলে ফেলে নিউজিল্যান্ড। অ্যালেন ৩১ রান করে অক্ষর প্যাটেলের বলে আউট হন। ১১ ওভারে ৪ উইকেটে ১১২ রান ছিল কিউইদের। তখনও মনে হচ্ছিল, ম্যাচে ফিরে আসতে পারে ভারত। কিন্তু তার পরেই শুরু হয় ফিলিপ্‌স-ব্রেসওয়েল ঝড়।

পঞ্চম উইকেটে মাত্র ৪০ বলে ১১৫ রান যোগ করেন ফিলিপ্‌স ও ব্রেসওয়েল। ভারতের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টিতে ১০০-র বেশি রানের দ্রুততম জুটি গড়লেন তাঁরা। ব্রেসওয়েল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন। অন্য দিকে ফিলিপ্‌স বুঝিয়ে দেন, কেন এই সিরিজে তিনি এতটা বিপজ্জনক।

Sinks India Photo-SNS

১৬তম ওভারে নীতীশ কুমার রেড্ডিকে পর পর চারটি ছয় হাঁকান ফিলিপ্‌স। সেই ওভার থেকে আসে ৩২ রান। পরের ওভারে ময়াঙ্কের বলে তিনটি ছক্কা মারেন ব্রেসওয়েল। মাত্র ৯ বলে সাতটি ছয় দেখে কার্যত দিশাহারা হয়ে পড়ে ভারতীয় শিবির। এ দিন অর্শদীপ সিং (৯.৫০) ছাড়া কোনো ভারতীয় বোলারের বোলিং ইকোনমি দশের নীচে ছিল না। সবচেয়ে খরুচে নীতীশ কুমার রেড্ডি (১৬.০০) ও নমন ধীর (১৬.০০)। মাত্র ১৯ বলে ৫০ পূর্ণ করেন ব্রেসওয়েল। ভারতের বিরুদ্ধে যৌথ ভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরি এটি। শেষ পর্যন্ত প্রিন্স যাদবের বলে ৬৫ রান করে আউট হন তিনি।

তবে তাতে নিউজিল্যান্ডের রান তোলার গতি কমেনি। ৪৬ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ফিলিপ্‌স। নিউজিল্যান্ডের কোনও ব্যাটারের করা দ্রুততম শতরানের তালিকায় এটি যুগ্ম ভাবে দ্বিতীয়। ৪৯ বলে ১০৭ রান করে আউট হন তিনি। ইনিংসে ছিল ১০টি ছয়। শেষ ১০ ওভারে ১৫০ রান তোলে নিউজিল্যান্ড। মোট ছয়ের সংখ্যা ২০, যা টি-টোয়েন্টিতে তাদের নতুন রেকর্ড।

৪৮ রান দিয়ে তিন উইকেট নেন ময়াঙ্ক। অর্শদীপ সিং, প্রিন্স যাদব, অক্ষর পটেল এবং নীতীশ একটি করে উইকেট পান। তবে নীতীশের চার ওভারে খরচ ৬৪ রান। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনও ভারতীয় বোলারের চতুর্থ সর্বাধিক রান দেওয়ার নজির এটি। অর্শদীপ অবশ্য স্যান্টনারকে আউট করে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন।

প্রথম ওভারেই শেষ ভারতের আশা

২৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় ভারত। প্রথম ওভারেই সঞ্জু স্যামসন এবং ইশান কিষাণকে ফিরিয়ে দেন জ্যাকব ডাফি। স্যামসন চার মেরে শুরু করলেও পরের বলেই আউট হন। ইশান কোনও রান করতে পারেননি। কেন এ দিন বৈভবকে খেলানো হয়নি, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অভিষেক শর্মা ২৭ রান করে কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু ম্যাট ফিশারের বলে আউট হন তিনি। শ্রেয়স আইয়ারও ২২ রানের বেশি করতে পারেননি। অ্যাডাম মিলনের বলে বোল্ড হন ভারত অধিনায়ক। পাওয়ার প্লে-র শেষে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৫৬।

এর পর মিচেল স্যান্টনারের আঘাত। নবম ওভারে নীতীশ কুমার রেড্ডি (২১) এবং অক্ষর পটেলকে ফিরিয়ে দেন তিনি। ১৩ বলে ২৮ রান করে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন নামান ধীর। কিন্তু ডাফির বলে লং অনে ধরা পড়ে ফিরে যান তিনিও।

১২ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ভারতের রান ছিল ১২১। তিলক বর্মা ৩৫ রান করে সর্বোচ্চ স্কোরার হন। প্রিন্স যাদব ১৮ রানে অপরাজিত থাকেন। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৭২ রানেই থামে ভারতের ইনিংস।

টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রানের ব্যবধানে এটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম হার। একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ভারতের টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার দৌড়ও থামল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: নিউজিল্যান্ড ২০ ওভারে ২৫৯/৭ (গ্লেন ফিলিপ্‌স ১০৭, মাইকেল ব্রেসওয়েল ৬৫; ময়ঙ্ক যাদব ৩/৪৮)। ভারত ২০ ওভারে ১৭২/৯ (তিলক বর্মা ৩৫, নামান ধীর ২৮; জ্যাকব ডাফি ৪/২৩, মিচেল স্যান্টনার ২/২৪)। নিউজিল্যান্ড ৮৭ রানে জয়ী।