নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোক ধাওয়ান-রাহানেদের মহলেও, ক্রিকেট-শুটিংয়েও কম ছিলেন না কিংবদন্তি অভিনেতা

Nana Patekar Photo-SNS

নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বলিউড থেকে মারাঠি চলচ্চিত্র জগৎ— সর্বত্র। সেই শোক ছুঁয়ে গিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট মহলকেও।

বৃহস্পতিবার সকালে ৭৫ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন কিংবদন্তি অভিনেতা। গোয়ার বাড়িতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চিকিৎসকেরা সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁর মৃত্যু ঘোষণা করা হয়।

তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার শিখর ধাওয়ান এবং অজিঙ্ক রাহানে। এই দুই তারকাই সমাজমাধ্যমে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতাকে।


ধওয়ানের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে উঠে এসেছে নানা পাটেকরের অভিনয়ের দীর্ঘ প্রভাব। তিনি লিখেছেন, ‘আজ ভারতীয় সিনেমা এক সত্যিই বিশেষ প্রতিভাকে হারাল। নানা পাটেকর সাহেব, আপনার কাজ আগামী প্রজন্মগুলিকে অনুপ্রাণিত করে যাবে। ওম শান্তি’।

ক্রিকেট মাঠে তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত ধওয়ানের বার্তায় তাই ছিল সিনেমার এক কিংবদন্তিকে হারানোর বেদনা। নানা পাটেকরের অভিনয় যে শুধু তাঁর সময়ের দর্শকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, পরের প্রজন্মকেও প্রভাবিত করেছে— ধওয়ানের কথায় সেটিই স্পষ্ট।

প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক রাহানে আরও একটু বিস্তারিত ভাবেই স্মরণ করেছেন নানা পাটেকরকে। তাঁর কথায়, ‘নানা পাটেকরজি সত্যিই অসাধারণ এক অভিনেতা ছিলেন। তাঁর কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং আনন্দ দিয়েছে। তাঁর প্রয়াণের খবর শুনে খুবই দুঃখিত। ঈশ্বর তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন’।

রাহানের এই শ্রদ্ধার মধ্যেই যেন ধরা পড়েছে নানা পাটেকরের দীর্ঘ অভিনয়-জীবনের ব্যাপ্তি। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ দিয়ে অভিনয় জগতে পা রাখার পর ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি’, ‘অব তক ছাপ্পান’ থেকে ‘নটসম্রাট’— একের পর এক ছবিতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি।

কোহলি আউট হলে বন্ধ করে দিতেন খাওয়া!

পর্দায় তাঁর পরিচয় ছিল দাপুটে অভিনেতা হিসাবে। কিন্তু ক্যামেরার বাইরের নানা পাটেকর ছিলেন ক্রিকেট এবং শুটিংয়েরও প্রবল অনুরাগী। বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণের পর সেই অজানা দিকগুলিও সামনে আসছে। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলেছেন, মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে অফস্পিনও করতেন। পরে রাইফেল শুটিংয়ে এমনই মন দেন যে জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় পদকও জেতেন।

ক্রিকেটের প্রতি তাঁর টান ছিল ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে কোনও দিন প্রথাগত কোচিং নেওয়ার সুযোগ হয়নি। তাতে অবশ্য ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা কমেনি। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যেও তাঁর পছন্দের তালিকায় ছিলেন বিরাট কোহলি।

কোহলির ব্যাটিংয়ের সঙ্গে নানা এতটাই জড়িয়ে পড়েছিলেন যে প্রিয় ব্যাটারের খারাপ দিনে তাঁর নিজেরও মন খারাপ হয়ে যেত। এক বার জানিয়েছিলেন, কোহলি দ্রুত আউট হয়ে গেলে তাঁর নাকি খাওয়ার ইচ্ছাটাই চলে যেত! ক্রিকেটের প্রতি অভিনেতার আবেগ কতটা গভীর ছিল, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

তবে ক্রিকেটের পর জীবনে আরও একটি খেলার সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়েন নানা— তা হল শুটিং। নিছক শখ হিসাবে শুরু করলেও ধীরে ধীরে তা গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে থাকেন। জাতীয় পর্যায়ের শুটিংয়ে অংশ নিয়ে ‘রেনোনড শট’ সম্মানও পেয়েছিলেন। প্রি-ন্যাশনালসে রুপোর পদকও জিতেছিলেন তিনি।

শুটিং তাঁর কাছে শুধু নিজের নেশা ছিল না, অন্যদের পাশে দাঁড়ানোরও মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় রাইফেল শুটারদের প্রশিক্ষণের খরচ, গুলি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন নানা। পুনের বালেওয়াড়ি শুটিং রেঞ্জেও নিয়মিত যেতেন। সেখানে তরুণ শুটারদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের উৎসাহ দিতেন।

তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং পদ্মশ্রী-সহ একাধিক সম্মানে সম্মানিত নানা পাটেকরের প্রয়াণে তাই শুধু বলিউড নয়, ভারতীয় খেলাধুলারও একটি অধ্যায়ের অবসান হল। অভিনয়ের পাশাপাশি খেলাধুলোর প্রতি এমন গভীর টান— নানা পাটেকরের জীবনের এই দিকটিও হয়তো তাঁর ভক্তদের মনে তাঁকে আরও আলাদা করে বাঁচিয়ে রাখবে।