নির্বাচকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটে বোমা ফাটালেন মিসবাহ

Photo: X

পাকিস্তান ক্রিকেটে বিতর্ক যেন থামতেই চাইছে না। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে ভরাডুবির পর একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন এ বার সরাসরি পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্দরমহলের ‘দুমুখো আচরণ’ নিয়ে মুখ খুললেন প্রাক্তন অধিনায়ক মিসবাহ উল হক।

তাঁর অভিযোগ, পাকিস্তানে বিদেশি কোচদের কদর অনেক বেশি। তুলনায় স্থানীয় কোচদের অনেক বেশি নিন্দা শুনতে হয় এবং প্রবল চাপের মুখে পড়তে হয়। শুধু তাই নয়, বিদেশি কোচদের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতাও তুলে দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।

সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন মিসবাহ। ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তান দলের বিপর্যয়ের পর নির্বাচকদের কাছে বোর্ডের নোটিস যাওয়ার পরই তিনি পদত্যাগ করেন। সেই ঘটনার পর একটি পাক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মুখ খুলে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান ক্রিকেটে স্থানীয় এবং বিদেশি কোচদের সঙ্গে যে আলাদা আচরণ করা হয়, সেটা সত্যি। বিদেশি কোচদের তুলনায় স্থানীয় কোচদের অনেক বেশি নজরদারি এবং সমালোচনার মুখে পড়তে হয়’।


বিদেশি কোচ নিয়োগের বিরোধী নন মিসবাহ। তবে তাঁর আপত্তি অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, ‘বিদেশি কোচ নিয়োগে আমার কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু যে বিষয়টা আমাকে ভাবায়, তা হল—সমর্থক, সমালোচক, সংবাদমাধ্যম এমনকি পিসিবিও বিদেশি কোচদের প্রতি নরম মনোভাব দেখায়’।

তাঁর আরও অভিযোগ, ‘বিদেশি কোচদের আমরা বেশি ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দিয়ে থাকি। দল খারাপ খেললেও তাঁদের দায় তুলনামূলক ভাবে কম নিতে হয়। কিন্তু স্থানীয় কোচদের কেউ রেয়াত করে না। তাদের সব সময় সমালোচনার মধ্যে থাকতে হয়’। মিসবাহর মতে, স্থানীয় কোচদের শুধুমাত্র সমালোচনা না করে আরও বেশি সমর্থন দেওয়া উচিত।

পাকিস্তান ক্রিকেটে আর একটি প্রবণতাও মিসবাহকে চিন্তায় ফেলেছে। তাঁর মতে, কোনও ক্রিকেটার খারাপ খেললেই তাঁকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়ে যায়, যা মানসিক ভাবে ক্রিকেটারকে আরও দুর্বল করে দেয়। তিনি বলেন, ‘এখন পাকিস্তান ক্রিকেটে খারাপ পারফরম্যান্সের পর ক্রিকেটারদের আক্রমণ করা এবং মানসিক ভাবে ভেঙে দেওয়ার একটা নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে ক্রিকেটারদের ফর্ম এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে’।

সমস্যার সমাধান হিসেবে ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উপর জোর দিয়েছেন মিসবাহ। তাঁর সাফ কথা, ‘চাপের মুখে পড়ে আমাদের আতঙ্কিত হয়ে কসমেটিক সার্জারি করার দরকার নেই। পারফরম্যান্স এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তার পর ঠিক করতে হবে কী ভাবে এগোনো যায়’। তাঁর সংযোজন, ‘দুর্ভাগ্যজনক ভাবে পাকিস্তান ক্রিকেটে আমরা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি’।

ইংল্যান্ড সফরে ইতিমধ্যেই তার নমুনা দেখা গিয়েছে। প্রথম দুই টেস্টে হারের পরই পাকিস্তান দলে বড়সড় পরিবর্তন করা হয়েছে। সাত ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে হেড কোচ সরফরাজ আহমেদ এবং বোলিং কোচ উমর গুলকেও।

পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে ভারতের তুলনাও টেনেছেন মিসবাহ। তাঁর মতে, ভারতীয় ক্রিকেট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগিয়েছে বলেই আজ তারা সাফল্য পাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকের পর ভারত তাদের ক্রিকেট ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে উন্নতি করেছে। তারা সময় নিয়েছে, ক্রিকেটার তৈরি করেছে। কোনও দ্রুত সমাধান নেই’।

ভারতের সাফল্যের আরও একটি কারণ হিসেবে লাল বলের ক্রিকেটের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন মিসবাহ। ‘আমাদের তরুণ ক্রিকেটাররা সাদা বলের ক্রিকেট খুব বেশি খেলছে। লাল বলের ক্রিকেটে, বিশেষ করে চার দিনের ক্রিকেটে তাদের অভিজ্ঞতা কম। ফলে চাপের পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাও বেশি’।

পাকিস্তান ক্রিকেটে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, ধৈর্য এবং পরিকল্পনা—এটাই মিসবাহর বক্তব্যের মূল সুর। ইংল্যান্ড সফরের মাঝপথে একের পর এক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সেই সমস্যাকেই আরও প্রকট করে তুলেছে বলে মনে করেন তিনি।