জয় দিয়ে ডুরান্ড কাপ এবং জাতীয় ক্লাব মরসুম শুরু করল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। গতবার কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১-এ হারিয়ে মোহনবাগানকে ডুরান্ড কাপ থেকে ছিটকে দিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। শনিবার যুবভারতীতে সেই হারের বদলা নিয়ে নিল সবুজ-মেরুন বাহিনী।
৫৩ মিনিটে সহাল আব্দুল সাহালের একমাত্র গোলে এ দিন ম্যাচ জিতে নেয় মোহনবাগান। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পরই বিশ্বকাপে নরওয়ের সমর্থকদের মতো গ্যালারিতে সমর্থকদের ভাইকিং সেলিব্রেশনও দেখা যায়। প্রাক্তন কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দলকে হারিয়ে তারা এদিন বাড়তি তৃপ্তি নিয়েই ঘরে ফেরে। কলকাতায় এই প্রথম হাবাসের দল কোনো ডার্বিতে হারল। এর আগের পাঁচটিতেই অপরাজিত ছিলেন তিনি। কিন্তু এ বার তাঁকে হারিয়ে দিলেন গ্রিসের প্যানাগিওতিস দিলেমপেরিস।
প্রথমার্ধ্ব গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মোহনবাগান গোল করে এগিয়ে গেলেও শেষ দিকে এতটাই রক্ষণাত্মক হয়ে যায় যে, যে কোনো মুহূর্তে গোল খেয়ে যেতে পারত। ইস্টবেঙ্গল আটটি গোলের সুযোগ তৈরি করে। তার মধ্যে তাদের দুটি শট ছিল গোলের লক্ষ্যে। অন্যদিকে, মোহনবাগান লক্ষ্যে রাখে তিনটি শট। তার মধ্যে একটি থেকে গোল পায়।
দুই দলই এদিন বিদেশিহীন প্রথম এগারো নামালেও পরে দুই পক্ষই দুজন করে বিদেশি ফুটবলার নামায়। তাতে সবুজ-মেরুন বাহিনীর লাভ হলেও ইস্টবেঙ্গলের কোনো লাভ হয়নি। বরং ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পেয়েও হাতছাড়া করেন ইস্টবেঙ্গলের প্যালেস্তিনীয় মিডফিল্ডার মহম্মদ রশিদ।
এ দিন ম্যাচের শুরুর দিকে দুই দলেরই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে জড়তা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় বহুদিন পরে খুব কম প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছেন তাঁরা। প্রথম দশ মিনিটের মধ্যে একবার একবার মনবীর সিংয়ের হেড ও একবার রোহিত দানুর শট গোলের খুব কাছাকাছি গেলেও লক্ষ্যে ছিল না। প্রথম ৪৫ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল কোনো শটই গোলে রাখতে পারেনি। মোহনবাগানের মনবীরের একটি শট ও সাহালের একটি হেড লক্ষ্যে থাকলেও তা গোলকিপার গিল বাঁচিয়ে দেন। কিন্তু বিশাল কয়েথকে সে ভাবে পরীক্ষা দিতে হয়নি।
ডান দিক থেকে বিপিন সিংয়ের ক্রসের নাগালই পাননি এডমন্ড লালরিন্ডিকা। রোহিত দানুর একটি অনবদ্য পাস পেয়ে বক্সের মধ্যে ডেভিডের একটি শট দারুন ভাবে ব্লক করেন রাহুল ভেকে। এ ছাড়া ইস্টবেঙ্গল আর তেমন কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
বরং মোহনবাগান এসজি তাদের চেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করে। ২৩ মিনিটের মাথায় অভিষেকের ক্রস থেকে অসাধারণ গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন কিয়ান। কিন্তু ২৪ মিনিটের মাথায় মনবীরের দেওয়া ক্রসে গোলের সামনে যে সুযোগ পান লিস্টন, তাও কঠিন ছিল না। তিনি হেডে গোলের সুযোগ মিস করায় বক্সের বাঁ দিকে বল পান সহাল। তিনি গোল শট নিলেও তাঁর ব্লকার জিকসনের হাতে লাগে বল। পেনাল্টির জোরালো আবেদন করলেও সাড়া দেননি রেফারি লক্ষয়। ৩৫ মিনিটের মাথায় সাহাল ডানদিক দিয়ে উঠে গোলে শট নিলেও তা সাইড নেটে লাগে।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে আপুইয়াকে এডমন্ড ফাউল করায় বক্সের সামনে ফ্রি কিক পায় মোহনবাগান। লিস্টন কোলাসো তাঁর পরিচিত হাওয়ায় ভাসানো গোলমুখী কিক নিলেও তা সামনে ওয়ালে থাকা বিপিনের মাথায় লেগে গোলের বাইরে চলে যায়। কর্নার থেকেও কোনো লাভ হয়নি সবুজ-মেরুন বাহিনীর।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোলের দরজা খুলে ফেলে মোহনবাগান। ডানদিক থেকে কিয়ান নাসিরির অসাধারণ ক্রস গোলের সামনে মনবীরের পায়ে গেলেও তিনি তা ব্যাকহিল করে দূরের পোস্টের সামনে থাকা সাহালের কাছে পাঠিয়ে দেন। সাহাল নিখুঁত টাচে জালে বল জড়িয়ে দেন।
গোল খাওয়ার পরেই দুই রোহিতের জায়গায় যথাক্রমে মহম্মদ রশিদ ও পিভি বিষ্ণুকে মাঠে নামান ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাস। উল্টোদিক থেকে মোহনবাগান কোচ প্যানোসও কিয়ান ও সহালকে তুলে নামান দেজান দ্রাজিচ ও দীপক টাঙরিকে। মিনিট দশেক পরে মনবীরের জায়গায় নামেন সুহেল ভাট এবং ডেভিডের জায়গায় নামেন আর এক বিদেশি দানি রামিরেজ।
গোল খাওয়ার পর রশিদ-বিষ্ণুদের ওপর ভর করে আক্রমণে গতি আনে ইস্টবেঙ্গল। ঘনঘন আক্রমণে উঠতে শুরু করে তারা। ৬৮ মিনিটের মাথায় গোল শোধ করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে ফেলেন বিষ্ণু। বাঁদিক দিয়ে বক্সে ঢুকে সোজা গোলে শট নেন, যা গিলের হাতে লেগে সামনে ছিটকে আসে। সেই বল ক্লিয়ার করে দেন মেহতাব সিং।
৭২ মিনিটের মাথায় গোলমুখী ডেভিডকে বক্সের সামনে শুভাশিস ফাউল করলে বেশ বিপজ্জনক জায়গা থেকে ফ্রিকিক পায় ইস্টবেঙ্গল। রমিরেজের ফ্রি কিকে বল গোলের সামনে গিয়ে পড়লেও তা ক্লিয়ার হয়ে যায়।
এর পাঁচ মিনিট পরেই বক্সের ডান দিক থেকে গোলে শট নেন লালচুঙনুঙ্গা। যা গিলের হাত থেকে ফিরে আসে ফের তাঁর মাথায়। নুঙ্কার হেড বক্সের মাঝখানে গিয়ে পড়লে শট নেন রশিদ, যা বারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। এর মধ্যে রক্ষণকে আরো জমাট করে তোলার লক্ষ্যে শুভাশিসের জায়গায় আলবার্তো রদ্রিগেজকে নামান সবুজ-মেরুন কোচ। লিস্টনকেও তুল নেন তিনি। নামান সায়ন বন্দ্যাপাধ্যায়কে।
আসি মিনিটের পর থেকে ইস্টবেঙ্গল ক্রমশ চাপ বাড়াতে শুরু করে। এই সময়ে মোহনবাগানও অতি রক্ষণাত্মক হয়ে যায়। জিকসনের দূরপাল্লার শট আটকে দেন বিশাল। রামিরেজের শট পোস্টে লেগে বেরিয়ে যায়। ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি রশিদ পান সংযুক্ত সময়ে। বাঁ দিক থেকে রামিরেজের ক্রসে গোলে শট নিলেও সামনে থাকা বিশালের হাতে লেগে তা বেরিয়ে যায়। এর পরে আর সমতা আনার সুযোগ পায়নি লাল-হলুদ বাহিনী।
মোহনবাগান এসজি: বিশাল কয়েথ (গোল), অভিষেক সিং, মেহতাব সিং, রাহুল ভেকে, শুভাশিস বোস (আলবার্তো রদ্রিগেজ), অনিরুদ্ধ থাপা, সাহাল অব্দুল সামাদ (দেজান দ্রাজিচ), আপুইয়া, লিস্টন কোলাসো (সায়ন ব্যানার্জি), মনবীর সিং (সুহেল ভাট), কিয়ান নাসিরি (দীপক টাঙরি)।
ইস্টবেঙ্গল এফসি: প্রভসুখন গিল (গোল), আনোয়ার আলি, সন্দীপ মান্ডি, লালচুঙনুঙ্গা, জয় গুপ্তা, বিপিন সিং (জেসিন টিকে), রোহিত কুমার (মহম্মদ রশিদ), রোহিত দানু (পিভি বিষ্ণু), জিকসন সিং, এডমন্ড লালরিন্ডিকা, ডেভিড লালনসাঙ্গা (দানি রামিরেজ)।
ডুরান্ডের ডার্বিতে জয় দিয়ে জাতীয় ক্লাব মরসুম শুরু করল মোহনবাগান, সহালের গোলে এল জয়
PIC-X