অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ২-০ জয়ের পর ফের আলোচনার কেন্দ্রে লিওনেল মেসি। হবে নাই বা কেন? জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে এসেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। পেনাল্টি থেকে গোলের সুযোগ নষ্ট করলেও মেসিকে দমানো যায়নি। আরও দুটো স্মরণীয় গোল করে আর্জেন্টিনাকে নক আউট পর্বে তুলে দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্র বোধহয় এটাই বোঝাতে চাইলেন যে, পেনাল্টির মতো পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা সুযোগে গোল করা তাঁর পছন্দ নয়।
বরং নিজে গোলের সুযোগ বানিয়ে কঠিন পরিস্থিতি থেকে গোল করাই তাঁর বেশি পছন্দ।সোমবার ডালাসে সে রকমই হল। ম্যাচের শুরুতেই ইতিহাস গড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। তবে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন তিনি। তাতেও দমে যাননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। প্রথমার্ধের ৩৮ মিনিটে দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। এরপর সংযুক্ত সময়ে আরও এক গোল করে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
এই জোড়া গোলের সুবাদে বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা পৌঁছে যায় ১৮-য়। যার ফলে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এককভাবে বসে পড়লেন। কয়েক দিন আগেই আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে জার্মান কিংবদন্তি মিরোশ্লাভ ক্লোজ-এর ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে সেই নজির ভেঙে নতুন ইতিহাস লিখলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
৩৮ বছর বয়সেও মেসির গোলখিদে যে একটুও কমেনি, তার প্রমাণ মিলল এই ম্যাচে। টানা ছ’টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কৃতিত্বও অর্জন করেছেন তিনি। এই নিয়ে ছ’নম্বর বিশ্বকাপ খেলছেন তিনি, যা নিজেই একটি রেকর্ড। সোমবার সন্ধ্যার পর সারা ফুটবল দুনিয়া চলে গেল একজনেরই দখলে। তিনি লিওনেল মেসি। সারা বিশ্বে আলোচনা শুধু তাঁকে নিয়েই। অবাক সবাই, সবার মনে একই প্রশ্ন, এই বয়সেও এত চনমনে ও তরতাজা থাকা কী করে সম্ভব?
তবে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, মেসির কীর্তি দেখে তিনি আর অবাক হন না।ম্যাচের পর সাংবাদিক বৈঠকে স্কালোনি বলেন, “শুধু আর্জেন্টিনার মানুষই নয়, বিশ্বের প্রত্যেক মানুষই ওর খেলা দেখতে চায়। গোটা পৃথিবীই ওকে মাঠে দেখতে চায়। কারণ ওর প্রভাব শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বের ফুটবল সমর্থকদের উপরও সমানভাবে পড়ে।”
স্কালোনির মতে, মেসির উপস্থিতি শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে নয়, গোটা দলের মানসিক শক্তিকেও বাড়িয়ে দেয়। কোচের ভাষায়, “লিও সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বলাই সম্ভব না। ও সব সময় আমাদের পাশে ছিল এবং আমাদের দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও ও ঠিক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। ও যখন সচল থাকে, তখন দলের সবাই সচল থাকে। লিওর পারফরম্যান্সে আমরা খুবই খুশি। বলের দখল হারিয়ে যখন দল কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখনও ওর দায়বদ্ধতা স্পষ্ট দেখা গিয়েছে। ও মাঠের সর্বত্র ছিল, বল কেড়ে নিচ্ছিল এবং দলের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছে।”
আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিও মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, “ও শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলারই নয়, একজন বড় যোদ্ধাও। ওর সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করে, ওকে সমর্থন করতে ইচ্ছে করে, ওর জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে ইচ্ছে করে। আর ওর সঙ্গেই সব সময় প্রাণ খুলে হাসতে ইচ্ছে করে।” অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে স্কালোনি প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নিতে রাজি ছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, অস্ট্রিয়া অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং সংগঠিত দল, যারা উচ্চগতির প্রেসিং ফুটবল খেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেসির জাদুতেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।
ম্যাচ শেষে নিজের রেকর্ড নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে চাননি মেসি। বরং দলের সাফল্যকেই বড় করে দেখেছেন। তবে ফুটবলবিশ্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে— ৩৮ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর স্কালোনির কথাতেই যেন তার সেরা ব্যাখ্যা মিলেছে।
এ দিন অস্ট্রিয়া অবশ্য সহজে হার মানেনি। ম্যাচের অনেকটা সময়জুড়ে তারা আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। অন্যদিকে মেসির অভিজ্ঞতা ও আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের কার্যকারিতাই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়।
এই জয়ের ফলে গ্রুপ ‘জে’-তে টানা দুই ম্যাচ জিতে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে ফেলল আর্জেন্টিনা। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের লক্ষ্য এখন গ্রুপের শীর্ষস্থান ধরে রেখে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। আর ফুটবলপ্রেমীদের চোখ থাকবে মেসির দিকে— কারণ প্রতিটি ম্যাচেই তিনি যেন নতুন করে ইতিহাস লিখে চলেছেন।বিশ্বকাপের মঞ্চে একের পর এক রেকর্ড গড়তে থাকা মেসিকে ঘিরে উন্মাদনা যে শুধু আর্জেন্টিনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের অংশ হয়ে উঠেছে— এই ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।