সোমবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন থেকে বেরনোর সময় নিশ্চয়ই মোহনবাগান সমর্থকদের আলোচনার মূল বিষয় হতে পারত, এত বিরক্তিকর ফুটবল তাদের প্রিয় দল শেষ কবে খেলেছে? কিন্তু ৮৫ মিনিটের মাথায় মনবীরের দেওয়া গোল সেই আলোচনার বিষয়টাই পাল্টে দেয়। এক লাইনে বলতে হলে, সারাক্ষণ জঘন্য ফুটবল খেলেও শেষ পর্যন্ত চেন্নাইন এফসি-কে ১-০-য় হারিয়ে জয়ের ধারা বজায় রাখল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। সৌজন্যে মনবীর সিং।
এত গোলের সুযোগ নষ্ট করে, এত ভুল পাস দিয়ে এবং এত অগোছালো ফুটবল খেলেও যে ম্যাচ জেতা যায়, তা দেখাল মোহনবাগান। এবং এটাও বলতে হবে যে প্রতিপক্ষের নাম চেন্নাইন এফসি বলেই এটা সম্ভব হল। দক্ষিণের দল এ দিন যে সব সুযোগ পেয়েছিল, সেগুলির অন্তত কুড়ি শতাংশ কাজে লাগাতে পারলেও মনবীরের গোলের আগেই একাধিক গোলে এগিয়ে যেত তারা। সারা ম্যাচে চেন্নাইন অন্তত সাতটি শট লক্ষ্যে রেখেছিল, একটি থেকেও গোল পায়নি। অন্যদিকে মোহনবাগানও প্রায় সমসংখ্যক শট গোলে রাখে। যেখানে অন্তত তিন-চার গোল দেওয়া উচিত ছিল তাদের, সেখানে একটির বেশি গোল করতে পারেনি তারা।
এ দিন যুবভারতীতে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে চেন্নাইন, যা কিছুটা অপ্রত্যাশিতই ছিল। কিক-অফের পরেই নিকোলা স্তোজানোভিচের শট ক্রসবারের উপর দিয়ে চলে যায়।এর পরেও আক্রমণের ঝাঁঝ বজায় রাখে তারা। মাদি তালাল ও ইরফান ইয়াডওয়াডের সৌজন্যে বেশ কয়েকটি ভাল সুযোগও তৈরি হয়।
স্তোজানোভিচের ক্রস থেকে হেড করে অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হন ইয়াডওয়াড। এর পর বক্সের ভিতর থেকে তাঁর নিচু শট দক্ষতার সঙ্গে আটকে দেন মোহনবাগানের গোলরক্ষক বিশাল কয়েথ। দূর থেকে তালালের নিচু শটও রুখে দেন কয়েথ।
ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরে মোহনবাগান। দুই প্রান্ত ধরে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে তারা। ডান দিক থেকে কঠিন কোণ থেকে আলবের্তো রদ্রিগেসের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। অন্য দিকে, লালিয়ানজুয়ালা ছাংতের পাস থেকে দেজান দ্রাজিচের শট দারুণ দক্ষতায় বাঁচান চেন্নাইনের গোলরক্ষক মহম্মদ নওয়াজ়। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ব্রাইসন ফার্নান্দেসের শটও অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
দু’দলই গোলের একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধের বিরতিতে স্কোরলাইন ০-০-ই থাকে। এই অর্ধে দুই দলই তিনটি করে শট লক্ষ্যে রাখে। কিন্তু কেউই সেগুলি গোলে পরিণত করতে পারেনি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সমর্থকেরা এই ফুটবল দেখে হতাশই হন। ফুটবলে গোলই যেখানে আসল সেখানে দুই দলের অ্যাটাকাররা এ দিন গোল ছাড়া সবই করেছেন। এতেই প্রশ্ন ওঠে, তা হলে তাঁদের অ্যাটাকার বলা হয় কেন?
মোহনবাগান সমর্থকদের একটু বেশিই হতাশ হওয়ার কথা, তাদের প্রিয় দলের বেহাল অবস্থা দেখে। গোছানো ফুটবল থেকে এ দিন কয়েকশো মাইল দূরে ছিল সবুজ-মেরুন বাহিনী। পারফেকশন বলে কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি তাদের খেলায়।
বিরতির পর সহাল আব্দুল সামাদ যখন যে সুযোগে বক্সের মাথা থেকে সোজা শট মারলে গোল পেয়ে যেতেন সেই শটে বল চলে যায় ডানদিকের পোস্টের অন্তত দশ ফুট দূর দিয়ে। ইরফান ইয়াডওয়াড, মাদি তালাল-রাও চেন্নাইনের গোলের সুযোগগুলি হেলায় নষ্ট করেন।
৫৪ মিনিটের মাথায় মোহনবাগান অনিরুদ্ধ থাপাকে সামির জেলকোভিচের জায়গায় মাঠে নামায়। ৬৪ মিনিটে রাহুল ভেকে-কে তুলে শুভাশিস বোসকে মাঠে নামায়। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তিন মাস ধরে প্রস্তুতি, অনুশীলন, টুর্নামেন্টের পরও একটা দলের এমন বেহাল দশা হয় কী করে, তা যে কোনো ফুটবলপ্রেমীরা পক্ষেই বোঝা কঠিন।
দুই প্রান্ত দিয়ে একাধিক সুযোগ তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত বারবার প্রতিপক্ষের গোলের সামনে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন দুই দলের ফুটবলাররাই। সেটপিসে আরও খারাপ অবস্থা তাদের। কর্ণার, ফ্রিকিক দেখে মনে হয়েছে প্রি সিজনে এসবের কোনো অনুশীলনই হয়নি তাদের। ৭২ মিনিটে ডান উইং থেকে মনবীরের জোরালো দূরপাল্লার শট অনায়াসে আটকে দেন চেন্নাইনের গোলকিপার মহম্মদ নাওয়াজ।
ম্যাচের সেরা শটটি নেন নিকোলা, ৭৮ মিনিটে। কিন্তু বক্সের মাথা থেকে নেওয়া তাঁর শট বিশালের হাতে লেগে বারে লেগে ফিরে আসে। ৮১ মিনিটের মাথায় লিস্টন ও অভিষেককে নামান বাগান-কোচ প্যানোস। লক্ষ্য প্রতিপক্ষের গোলের দরজা খোলা। সেই লক্ষ্য পূরণ করেন লিস্টন। বাঁদিকের উইং দিয়ে উঠে দূরের পোস্টের সামনে একটি লম্বা ক্রস বাড়ান তিনি। সেখানে এসে বুক দিয়ে গোলে বল ঠেলে দেন মনবীর। তিন পয়েন্ট এখান থেকেই চলে আসে। কিন্তু প্রচুর সংশয় রয়ে যায় যুবভারতীর মাঠে।