বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসলেও নিশ্চিন্ত হতে পারবেন না লিওনেল মেসি। বরং বলা উচিত তাঁকে নিশ্চিন্ত হতে দেবেন না ফ্রান্সের সেরা তারকা কিলিয়ান এমবাপে। সোমবার ইরাকের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় যুগ্মভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন এমবাপে।ম্যাচের দুই অর্ধের শুরুতেই একটি করে গোল করেন ফরাসি তারকা। ফলে বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১৬ ম্যাচে ১৬।
কয়েক ঘণ্টা আগেই মিরোশ্লাভ ক্লোজের রেকর্ড ভেঙে শীর্ষে ওঠা মেসির থেকে তিনি এখন মাত্র দুই গোল পিছিয়ে। মেসির বয়স ৩৮। পরের বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কি না, ঠিক নেই। এমবাপে এখন ২৭। আর একটি বিশ্বকাপেও যদি খেলেন, তা হলেই মেসিকে পিছনে ফেলে দিতে পারেন। সোমবার যে পারফরম্যান্স দেখালেন, তাতে অনেকেরই মনে হচ্ছে এই বিশ্বকাপেই না মেসিকে ছুঁয়ে ফেলেন তিনি।
অর্থাৎ, চলতি বিশ্বকাপে মেসি ও এমবাপের গোলের লড়াই ভালই জমবে মনে হচ্ছে। এমনিতেই সোনার বুটের লড়াই প্রতিবারই জমজমাট হয়ে ওঠে। এ বার আর একটি দৌড় বিশ্বকাপকে আরও কয়েক গুণ আকর্ষণীয় করে তুলবে বলেই মনে হচ্ছে।সোমবার ফিলাডেলফিয়ায় আবহাওয়ার কারণে ম্যাচে প্রায় দু’ণ্টার বিরতি দিতে হয়। তাতে অবশ্য ফরাসি শিবির ঠাণ্ডা হয়ে যায়নি একেবারেই।
বরং ইরাককে তারা সহজেই হারিয়ে দেয়। এই প্রথম বিশ্বকাপের আসরে আবহাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় ম্যাচ। বজ্রপাতের আশঙ্কায় প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। তার আগে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে সমর্থকদের ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে প্রবেশ করাতেও অনেক দেরি হয়ে যায়। তবে নির্ধারিত সময়েই ম্যাচ শুরু হয়।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ফ্রান্স। ১৪তম মিনিটে তার ফলও পায় তারা। পেনাল্টি বক্সের প্রান্ত থেকে বাঁ-পায়ের দুর্দান্ত শটে বল দূরের পোস্টের কোণ দিয়ে জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন এমবাপে।তবে জলপান বিরতির পর ২০১৮-র বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের গোলের সুযোগ তৈরিতে কিছুটা খামতি দেখা যায়। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন উদ্যমে মাঠে নামে ফ্রান্স।
আর দ্বিতীয় গোলটি যেন উপহার হিসেবেই পেয়ে যায় তারা। ডিফেন্ডার জায়েদ তাহসিনের নেওয়া ছোট গোল-কিক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন গোলরক্ষক আহমেদ বাসিল। সুযোগ বুঝে ওসুমানে দেম্বেলে বল বাড়িয়ে দেন এমবাপেকে। সহজেই গোলে বল ঠেলে দেন তিনি।এর পর ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল ফ্রান্স। আদ্রিয়েঁ রাবিয়ত একটি সহজ হেডে গোলের সুযোগ নষ্ট করেন, আর মাইকেল ওলিজের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে।
পরে অবশ্য এক নিখুঁত শটে দলের তৃতীয় গোলটি করেন দেম্বেলে। ওলিসের আউটস্টেপে দেওয়া অসাধারণ পাস থেকে আসা এই গোলটি বড় কোনও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের জার্সিতে দেম্বেলের করা প্রথম গোল।ম্যাচের শেষদিকে এমবাপ্পে একাই রক্ষণ ভেঙে এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাঁর বাঁ-পায়ের শটটি অনেকটা ওপর দিয়ে বাইরে চলে যায়।
ফ্রান্সের জয় প্রত্যাশিতই ছিল, কিন্তু যেভাবে জয় পেল তারা, তা আবারও মনে করিয়ে দিল, কেন তারা এই টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট।গতি ও দক্ষতায় ভরপুর একটি দল দু’ঘণ্টার বিরতি এবং ভারী, ভেজা মাঠে ছন্দ হারাতে পারত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ বিরতির পর ইরাকই বরং নিজেদের গতি হারিয়ে ফেলে।
এমবাপে ফ্রান্সের সেরা তারকা হলেও ওলিসে ফের অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দেন। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই উইঙ্গার হয়তো খুব বেশি ফরাসি ভাষায় কথা বলেন না, কিন্তু সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিল দুর্দান্ত। দু’টি অ্যাসিস্ট করে গত তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ছ’টি গোলে অবদান রাখলেন তিনি।
এদিকে ব্যালন ডি’অর জয়ী দেম্বেলেও বড় টুর্নামেন্টে গোল না পাওয়ার হতাশা কাটিয়ে উঠেছেন, যা ভবিষ্যতের ম্যাচগুলিতে তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে। ইরাক কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও কখনও মনে হয়নি যে ফ্রান্স ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। বল ছাড়াও ফরাসিদের পরিশ্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। ধারাবাহিক প্রেসিংয়ের মাধ্যমে তারা ইরাকের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে একাধিকবার বিপজ্জনক এলাকায় বল কেড়ে নিতে সক্ষম হয়।
ম্যাচের পর ফরাসি কোচ দিদিয়ে দেশঁ সাংবাদিকদের বলেন, “দ্বিতীয়ার্ধে আমরা পুরোপুরি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিলাম। অবশ্য যা ঘটেছিল, তার পর পরিস্থিতি মোটেও সহজ ছিল না— সেটাও মাথায় রাখতে হবে। তবে ম্যাচের ফল নিয়ে যেন আর কোনো সংশয় না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে পারাটা খুবই ইতিবাচক বিষয়। আজই আমরা পরের পর্বে যোগ্যতা অর্জন করেছি। তবে গ্রুপে আমাদের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে তৃতীয় ম্যাচটি (নরওয়ের বিরুদ্ধে) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
দেশঁর দল প্রমাণ করেছে, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন উপায়ে আঘাত করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এমবাপে, ওলিসে, দেম্বেলেরা যদি এমনই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, তা হলে এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে রোখা বেশ কঠিন হবে।