৪২.১৯৫ কিলোমিটার দৌড় শেষে এল এশিয়ান গেমসের রুপোর পদক। সঙ্গে নিজের জাতীয় রেকর্ডও ভেঙে গড়লেন নতুন নজির। এশিয়াডে পুরুষদের ম্যারাথনে সাওয়ান বারওয়াল যা করলেন, তা ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে। ২ ঘণ্টা ১১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে রুপো জিতলেন হিমাচল প্রদেশের ২৮ বছরের এই সেনা অ্যাথলিট।
মহিলাদের ৫০ মিটার রাইফেল থ্রি পজিশনসের দলগত ইভেন্টেও রুপো জিতল ভারত। বাংলার শুটার তিলোত্তমা সেন ও তাঁর সতীর্থ বিদর্সা বিনোদ ও আশি চৌকসের দল মোট ১৭৬৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে। গেমস রেকর্ড গড়ে ১৭৭৩ পয়েন্ট নিয়ে সোনা জিতেছে চিন। দলগত পদকের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইভেন্টেও সুখবর। যোগ্যতা পর্ব পেরিয়ে ফাইনালে উঠেছেন তিলোত্তমা ও বিদর্সা। অর্থাৎ শুটিংয়ে আরও একটি পদকের সম্ভাবনা তৈরি হল।
সাওয়ানের রুপো দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাল। ১৯৮২ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমসে হোসুর কুক্কাপ্পা সীতারান ব্রোঞ্জ জেতার পর এই প্রথম এশিয়ান গেমসের ম্যারাথনে পদক পেল ভারত।
শুধু পদকই নয়, এ দিন নিজের জাতীয় রেকর্ডও ভেঙেছেন সাওয়ান। এ বছর এপ্রিলেই রটারডাম ম্যারাথনে ২ ঘণ্টা ১১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড সময় করে শিবনাথ সিং-এর ৪৮ বছরের পুরনো জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছিলেন তিনি। নিজের দ্বিতীয় ম্যারাথনেই সেই রেকর্ড আরও ২১ সেকেন্ড কমিয়ে দিলেন। অর্থাৎ দু’টি ম্যারাথন, দু’বার জাতীয় রেকর্ড! জাপানের ইচিকাতা ইয়ামাশিতা ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে সোনা জেতেন।
দৌড় শেষ করে সাওয়ান বলেন, ‘এই পদকটা আমার কাছে খুবই মূল্যবান। ১৫-১৬ বছর ধরে আমি প্রশিক্ষণ নিচ্ছি এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছি। এই পদকটা না পেলে মনে হত এত দিন যা করেছি, সবই অর্থহীন এবং সময়ের অপচয়। এটা আমার কাছে খুব বড় সাফল্য’।
দৌড়ের শুরু থেকেই সামনের সারিতে ছিলেন সাওয়ান। হাফওয়ে মার্কে ১ ঘণ্টা ৫ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তিনি। ৩৫ কিলোমিটার পেরোনোর পর সামনের দলে ছিলেন মাত্র তিন জন—সাওয়ান এবং দুই জাপানি প্রতিযোগী। শেষ দিকে ইয়ামাশিতা গতি বাড়িয়ে এগিয়ে গেলেও রুপোর জায়গা ধরে রাখেন ভারতীয় অ্যাথলিট।
<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>A new National Record and a historic Silver for India! 🥈🔥
44 years later, Sawan Barwal puts India back on the Men’s Marathon podium at the Asian Games with a sensational 𝟐:𝟏𝟏:𝟑𝟕 finish! 💪
Watch the 20th Asian Games Aichi-Nagoya LIVE on Sony Sports Network TV channels & Sony LIV.
#SonySportsNetwork #SonyLIV #AsianGames #AichiNagoya2026 #TeamIndia #BaarBaarBharatHarBaarBharat</p>— Sony Sports Network (@SonySportsNetwk) <a href=”https://x.com/SonySportsNetwk/status/2103676878880157711?ref_src=twsrc%5Etfw”>September 26, 2026</a></blockquote>
<script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>
নিজের রেসের কৌশল নিয়ে সাওয়ান বলেন, ‘আমার লক্ষ্য ছিল ৩৯-৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রথম দলের সঙ্গে থাকা। আমি সেই দলেই ছিলাম এবং ঠিক করেছিলাম শেষ এক-দুই কিলোমিটারে লড়াই করব। গতি খুব বেশি ছিল, তাই নিজের স্বচ্ছন্দ গতিটাই ধরে রাখার চেষ্টা করেছি’।
আরও মজার ব্যাপার, এ দিন জাতীয় রেকর্ড ভাঙার কথা মাথাতেই ছিল না তাঁর। লক্ষ্য ছিল শুধু পদক। সাওয়ানের কথায়, ‘আমি জাতীয় রেকর্ড ভাঙার জন্য দৌড়াইনি। সময় যতই হোক, আমার লক্ষ্য ছিল পদক জেতা। যখন ভাল গতিতে দৌড় শুরু করলাম, তখন মনে হল জাতীয় রেকর্ডও ভাঙতে পারি। কিন্তু তখনও সেটা মাথায় ছিল না। শুধু নিজের গতি ধরে রাখতে চেয়েছিলাম’।
হিমাচল প্রদেশের মান্ডি জেলার জোগিন্দরনগরের বাসিন্দা সাওয়ানের দৌড়ের শুরুটাও ছিল অনেকটা আকস্মিক। ১৪ বছর বয়সে দাদার সঙ্গে ট্র্যাকে গিয়ে ১৫০০ মিটারের প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন। পরে ৫০০০ ও ১০,০০০ মিটারে দৌড়েছেন। ২০২৫-এর জাতীয় গেমসে দু’টি ইভেন্টেই সোনা জেতেন। ২০১৯ সালে স্পোর্টস কোটায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
এই বছর কোচদের পরামর্শে ম্যারাথনে চলে আসেন সাওয়ান। কোচেরা মনে করেছিলেন ৪২.১৯৫ কিলোমিটারের দৌড়ে তিনি সফল হতে পারেন। সাওয়ানও সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, ম্যারাথনে সফল হওয়ার ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। তাই এটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল’।
রটারডামে জাতীয় রেকর্ড ভাঙার পরে উটি-তে উচ্চতাজনিত প্রশিক্ষণ নেন। তার পরে প্রায় দু’মাস আমেরিকার কলোরাডো স্প্রিংসে অনুশীলন করেন। সেই প্রস্তুতিতে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনও তাঁকে সাহায্য করে। সাওয়ানের কথায়, ‘আমি অভিজাত স্তরের প্রশিক্ষকদের সঙ্গে অনুশীলন করেছি। সেটা আমাকে এশিয়ান গেমসে ভাল করতে পারার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে’।
এশিয়ান গেমসে ম্যারাথনে পদকজয়ী ভারতীয়দের তালিকায় সাওয়ান হলেন চতুর্থ। ১৯৫১-র প্রথম এশিয়ান গেমসে ছোটা সিং সোনা এবং সুরত সিং মাথুর ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। তার পরে ১৯৮২-তে হোসুর কুক্কাপ্পা সীতারান ব্রোঞ্জ পেয়েছিলেন। ৪৪ বছর পরে সেই তালিকায় নতুন নাম—সাওয়ান বারওয়াল।
এ বার সামনে নতুন লক্ষ্য। এশিয়ান গেমসের সাফল্য উপভোগ করে এক মাস বিশ্রাম নিতে চান সাওয়ান। তার পরে লক্ষ্য ২০২৭ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের যোগ্যতা অর্জন। তাঁর কথায়, ‘আমি এক মাস বিশ্রাম নেব। তার পরে ২০২৭ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করব’।
চিনের কাছে হেরেও রুপোর হাসি তিলোত্তমাদের!
এ দিন মহিলাদের ৫০ মিটার রাইফেল থ্রি পজিশনসের দলগত ইভেন্টে রুপো জিতল ভারত। তিলোত্তমা সেন, বিদর্সা বিনোদ ও আশি চৌকসির ভারতীয় দল মোট ১৭৬৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে।
ব্যক্তিগত ইভেন্টে যোগ্যতা পর্ব পেরিয়ে ফাইনালে উঠেছেন তিলোত্তমা ও বিদর্সা। অর্থাৎ ভারতীয় শুটিংয়ের সামনে আরও একটি পদকের সম্ভাবনা তৈরি হল। তিলোত্তমা শুরু থেকেই ভারতীয়দের মধ্যে এগিয়ে ছিলেন। হাঁটু গেড়ে এবং শুয়ে শুটিং—প্রথম দুই পর্বের পরে তাঁর স্কোর ছিল ৩৯৫। দাঁড়িয়ে শুটিংয়ের পর মোট স্কোর দাঁড়ায় ৫৯০। সেই সুবাদে যোগ্যতা পর্বে তৃতীয় হয়ে আট জনের ফাইনালে জায়গা করে নেন তিনি।
অন্য দিকে, শুরুটা তেমন ভাল না হলেও দারুণ ভাবে ঘুরে দাঁড়ান বিদর্সা। বিশ্ব ক্রমতালিকায় ১৫ নম্বরে থাকা এই ভারতীয় শুটার যোগ্যতা পর্বে মোট ৫৮৮ পয়েন্ট করেন। শেষ পর্যন্ত ষষ্ঠ হয়ে ফাইনালের টিকিট পান তিনি।
তবে অল্পের জন্য ফাইনালে উঠতে পারেননি আশি। যোগ্যতা পর্বে ৫৮৫ পয়েন্ট নিয়ে শেষ করেন বিশ্ব ক্রমতালিকায় ১৮ নম্বরে থাকা এই ভারতীয় শুটার। ফলে দলগত ইভেন্টে রুপো জিতলেও ব্যক্তিগত ফাইনালে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন তিলোত্তমা ও বিদর্সাই।
৫০ মিটার রাইফেল থ্রি পজিশনস ইভেন্টে শুটারদের তিনটি ভঙ্গিতে গুলি চালাতে হয়—হাঁটু গেড়ে, শুয়ে এবং দাঁড়িয়ে। তিন পর্ব মিলিয়ে যোগ্যতা পর্বের স্কোরের ভিত্তিতেই আট জন ফাইনালিস্ট বেছে নেওয়া হয়। এই কঠিন ইভেন্টে ভারতের তিন শুটারই দলগত লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত চিনের সঙ্গে পদকের লড়াইয়ে ছিলেন।
এশিয়ান গেমসে ভারতীয় শুটিংয়ের ধারাবাহিক সাফল্যের তালিকায় আরও একটি পদক যোগ হল। এ বার ব্যক্তিগত ফাইনালে তিলোত্তমা ও বিদর্সা কী করেন, সেই দিকেই নজর। দলগত রুপোর পরে কি ব্যক্তিগত ইভেন্টেও আসবে পদক? উত্তর মিলবে ফাইনালে।
রুপো নিশ্চিত স্কোায়াশেও
এশিয়ান গেমস স্কোয়াশে মহিলাদের সিঙ্গলসের ফাইনালে উঠেছেন ভারতের অনাহত সিংহ। শনিবার সেমিফাইনালে প্রথম দুই গেমে পিছিয়ে পড়েও দারুণ ভাবে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। বিশ্ব ক্রমতালিকায় ছ’নম্বরে থাকা সাতোমি ওয়াতানাবেকে ৩-২ গেমে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন অনাহত। এর ফলে ভারতের অন্তত রুপো নিশ্চিত হয়েছে।