শেষটা শেষ পর্যন্ত এসেই গেল! আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে। জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা করে দিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। দীর্ঘ ২০ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত যে তাঁর জন্য কতটা কঠিন, তা মেসির কথাতেই স্পষ্ট। একই সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জায়গা করে দেওয়ার সময়ও এসে গিয়েছে।
মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে অনেক ভেবেছেন। শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মেসির কথায়, ‘ফাইনালের পর থেকে এতটা সময় কেটে গিয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তে আমি সবাইকে জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি’।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর পক্ষে মোটেই সোজা ছিল না। সমাজমাধ্যমে মেসি বলেছেন, ‘এটা এমন একটা সিদ্ধান্ত, যা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং এখনও ভিতর থেকে গভীর ভাবে কষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়’।
আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মেসি। শুধু সাম্প্রতিক সাফল্যের সময় নয়, তারও বহু আগে থেকে দেশের হয়ে নিজের সবটা উজাড় করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘আমি শপথ করে বলতে পারি, আমি সব সময় নিজের সবটুকু দিয়েছি। শুধু গত কয়েক বছরে নয়, যখন আমরা সব কিছু জিতেছি, তারও আগে। আমি সব সময় এই জার্সির জন্য লড়েছি এবং নিজের সবটা দিয়েছি। চেয়েছি তোমাদের আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে তোমাদের আর্জেন্টাইন হওয়ার জন্য গর্বিত করতে’।
তবে সময় যে থেমে থাকে না, সেটাও মেনে নিচ্ছেন মেসি। তাঁর কথায়, ‘আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। একের পর এক অধ্যায়ের শেষ হয়ে আসছে। এটাও এমনই একটা অধ্যায়, যা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। আমি জাতীয় দলের অংশ হতে ভালবাসি, ভালবেসেছি এবং চিরকাল ভালবাসব। আমার যা দেওয়ার ছিল, সবটাই দিয়েছি। আমার কাছে আর কিছু দেওয়ার নেই’।
🚨🚨🚨💣 LEO MESSI STATEMENT:
“After all this time since the final, and after thinking about it a lot, I want to tell everyone that I’m retiring from the national team…
“It was a decision that hurt and still hurts deep inside, but I understand that this is the right moment.… pic.twitter.com/42A3dSTDOQ
— All About Argentina 🛎🇦🇷 (@AlbicelesteTalk) August 31, 2026
তরুণদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন মেসি। তাঁর বক্তব্য, ‘এ ছাড়াও দারুণ কিছু তরুণ ফুটবলার উঠে আসছে, যারা এখানে থাকার যোগ্য’। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন আট বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকা। দুই দশকের ভালবাসা মনে রেখে মেসি বলেন, “এই ২০ বছর ধরে তোমরা যে ভালবাসা দিয়েছ, তার জন্য ধন্যবাদ। মাঠের ভিতর থেকে তোমাদের আওয়াজ শোনা আমি খুব মিস করব। এখন আমি তোমাদেরই একজন হয়ে যাব। বাইরে থেকে সব সময় তোমাদের সমর্থন করব— ভাল সময়ে যেমন, খারাপ সময়ে তার থেকেও বেশি’।
এই দীর্ঘ এবং কঠিন সফরে পরিবারের ভূমিকার কথাও আলাদা করে উল্লেখ করেছেন মেসি। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের প্রতি ধন্যবাদ, সব সময় আমার পাশে থাকার জন্য এবং এই সুন্দর, কিন্তু কঠিন যাত্রায় আমার সঙ্গে থাকার জন্য। আমার প্রত্যেক কোচ, সতীর্থ এবং সেই সব কর্মকর্তাকেও ধন্যবাদ, যাঁদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি এমন কিছু স্মৃতি এবং মুহূর্ত, যা কোনও দিন ভুলতে পারব না’।
জাতীয় দলের হয়ে যা অর্জন করেছেন, তা নিয়েই শান্তি ও গর্ব নিয়ে সরে দাঁড়াতে চান মেসি। তাঁর কথায়, ‘আমি শান্তি এবং গর্ব নিয়ে সরে যাচ্ছি। কারণ, আমি জানি, সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আমরা তোমাদের এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছি, যার স্বপ্ন আমরা এক সময় দেখতাম। তোমাদের সঙ্গে এই সব কিছু অনুভব করা ছিল পাগল করা এক অভিজ্ঞতা। আমি তোমাদের ভালবাসি!’
আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে পারার জন্য ঈশ্বরকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মেসি। আবেগঘন বার্তায় লিখেছেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাকে আর্জেন্টাইন করে জন্ম দেওয়ার জন্য’।
তার পরেই তাঁর চিরপরিচিত ডাক—’ভামোস আর্জেন্টিনা’!
তবে মেসির বিবৃতির শেষ অংশটিই সবচেয়ে বেশি আবেগে ভেজা। জানিয়েছেন, এই বার্তাটি তিনি আসলে লিখেছিলেন ফাইনালের দু’দিন পর, ২১ জুলাই। পরে বাবাকে হারানোর পর নিজের সিদ্ধান্তে আরও দৃঢ় হয়েছেন। মেসি লিখেছেন, ‘আমি এই কথাগুলি ২১ জুলাই লিখেছিলাম, ফাইনালের দু’দিন পর। আজ, আমার বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পরে আমি আগের থেকেও বেশি নিশ্চিত যে এটাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঠিক সময়’।
বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের আনন্দ, অধিনায়ক হিসাবে একের পর এক ট্রফি— সব মিলিয়ে মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ার পূর্ণতার চূড়ায় পৌঁছেছিল। এ বার সেই অধ্যায়েই ইতি টানার ঘোষণা। ফুটবলবিশ্বের সামনে থেকে সরছেন না মেসি, কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর সেই বাঁ পায়ের জাদু আর দেখা যাবে না— এই বাস্তবই হয়তো সবচেয়ে বেশি কাঁদাবে সমর্থকদের।