শহরের ঘুম ভাঙল মেসির হ্যাটট্রিকে, ভক্তদের আক্ষেপ, রোজ কেন এমন ভোর আসে না

ভোর ছ’টায় রোজ কলকাতার ঘুম ভেঙেই যায়। ভাঙবে নাই বা কেন? বাঙালির দৈনন্দিন লড়াইয়ের শুরু যে এই ভোর থেকেই। কিন্তু বুধবারের ভোরটা যেন ছিল একটু অন্য রকম। এ দিন ছিল মেসি-দিবসের ভোর। যে মেসি এই শহরের অনেকের কাছে ঈশ্বর। যে মেসিকে চাক্ষুস দেখতে পায়নি বলে এই শহরের মানুষ বিদ্রোহ করেছিল, বিগত সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদও ঘোষণা করেছিল অনেকে, ইনি সেই মেসি। লিওনেল মেসি।

৩৮ বছর বয়সী সেই ফুটবলের ভগবান যখন প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে হ্যাটট্রিক করেন, তখন কি আর কলকাতা শুধু আড়মোড়া ভাঙতে পারে? মেসির হ্যাটট্রিকে যেন ভোরবেলায় উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ ঘটল টালা থেকে টালিগঞ্জ, বাগবাজার থেকে বজবজ। আগের রাতে এমবাপের জোড়া গোলের ঘোর কাটতে না কাটতেই মেসির হ্যাটট্রিক। যেন চাঁদ হাতে পাওয়ার চেয়েও এক বিরল প্রাপ্তি। এমন ভোর তো আর রোজ রোজ আসে না।

কচিকাচাদের মর্নিং স্কুল, তাই তাদের অভিভাবকদেরও ব্যস্ততা।মর্নিং শিফটের কর্মীদের হন্তদন্ত হয়ে কাজে বেরনো।পুরসভার কর্মীদের সাফাই অভিযান। প্রাতঃভ্রমণে বেরনো স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের ইচ্ছাকৃত তাড়াহুড়ো— এ সব দেখতে দেখতে ভোর সাড়ে ছ’টা নাগাদ গাঙ্গুলি বাগানের অরুণাচল সঙ্ঘের মাঠে পৌঁছে দেখা গেল সাদা-নীলের ভীড়।


বিশাল এলইডি স্ক্রিনে চলছে আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়ার ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার। আট থেকে আশি, কেউ বাদ নেই দর্শকদের মধ্যে। বেশিরভাগেরই গায়ে সাদা-নীল জার্সি। ভোরের রোদ উপেক্ষা করেই অনেকে ঠায় মাঠে ফাইবারের চেয়ার পেতে হাঁ করে তাকিয়ে জায়ান্ট স্ক্রিনের দিকে। মেসি পায়ে বল পেলেই হল— রীতিমতো হইহই করে উঠছিল সবাই মিলে।

ঘড়ির কাঁটা তখন ৬.৪৫ পেরিয়ে গিয়েছে। স্ক্রিনে দেখা গেল বিপক্ষের গোল থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে বলের দখল পাওয়ার পর মেসি নিজের মার্কারকে কাটিয়ে দ্রুত সামনে এগিয়ে যান এবং এর পর দারুণ এক কার্লিং শটে বল জড়িয়ে দেন জালে, যা লুকা জিদানের নাগালের একেবারেই বাইরে ছিল। অসাধারণ এই গোল দেখার পরই উপস্থিত দর্শকদের চিৎকারে কার্যত কেঁপে ওঠে এলাকা।

এই পুরো ব্যবস্থাপনা কলকাতার আর্জেন্টিনা অ্যান্ড মেসি ফ্যান ক্লাবের, যাদের সদস্যরা এ দিনই সকালে দলবেঁধে কালীঘাট মন্দিরে গিয়ে নারকেল ফাটিয়ে মেসি ও তাঁর সতীর্থদের নামে পুজো দিয়ে আসেন। তার পরে জায়ান্ট স্ক্রিনে বসেন খেলা দেখতে। এরপরেও কি মেসি হ্যাটট্রিক না করে পারেন, নাকি আর্জেন্টিনা না জিতে মাঠ থেকে বেরোতে পারে?

এমন ভোর কেন রোজ আসে না? আক্ষেপ এক মেসি ভক্তের। অরুণাচল সঙ্ঘের মাঠে খেলা দেখতে দেখতে বাপ্পা সরকার নামের কিশোর ভক্তটি বলেন, ‘আমি কোনও দিনই এত ভোরে ঘুম থেকে উঠি না। কিন্তু রোজই যদি এমন ভোর হত, ঘুম থেকে উঠেই মেসির হ্যাটট্রিক দেখতে পেতাম, তা হলে যত কষ্টই হোক রোজই ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। কাল মাঝরাত পর্যন্ত জেগে ফ্রান্সের জয়, এমবাপের জোড়া গোল দেখেছি। তাও ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়েছি আর্জেন্টিনা, মেসির খেলা দেখব বলে। মেসির হ্যাটট্রিক দেখার পর সব কষ্ট, ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।’মাঝবয়সী, ছিপছিপে চেহারার রঞ্জিত দত্ত বলছিলেন, ‘এই বয়সেও এমন তীরের বেগে দৌড়চ্ছে, বিদ্যূতের গতিতে গোল করছে মেসি! এই বয়সেও কী করে পারে। এ ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা ছাড়া সম্ভব নয়’।

সারা মাঠ সাজানো মেসি ও বিশ্বকাপের অন্যান্য তারকাদের ছবিতে। সঙ্গে সাদা-নীল বেলুন। ২০০২-এর বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের উদ্যোগে এই বিশ্বকাপ উৎসব চলে আসছে, যার ফোকাস অবশ্যই আর্জেন্টিনা। এর প্রধান উদ্যোক্তা উত্তম সাহা বলেন, ‘এই নিয়ে সপ্তম বিশ্বকাপে আমরা উৎসব করছি। গতবার আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তো আমরা দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে বিজয়মিছিল করেছিলাম। এ বারও আর্জেন্টিনাই চ্যাম্পিয়ন হবে, এ বারও আমরা বিজয়োৎসব করব’।

শুধু কি দক্ষিণ কলকাতার গাঙ্গুলি বাগান? দক্ষিণেরই পাটুলি, উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে ফারিয়াপুকুর, হাতিবাগান, হাওড়ার ক্যারি রোডে বাঙালপাড়া—সব অঞ্চলই আজ মেতে উঠেছে মেসি-উৎসবে। বাঙালপাড়ার এক ক্লাব ঘরে বসে খেলা দেখছিলেন সে ক্লাবের সদস্যরা। মেসির হ্যাটট্রিকের গোল হতেই ক্লাবের ভিতর থেকে যে উল্লাসের শব্দ ভেসে আসে, তাতে গোটা পাড়াই বুঝে যায়, নিশ্চয়ই বিশ্বকাপে কিছু একটা হয়েছে।

সেখানকার এক সদস্য বলেন, ‘শুরুতেই মেসির এই পারফরম্যান্স! ফাইনালে আমরা কী দেখব, ভেবে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে’। হ্যাঁ, বুধবার ভোরেই বোধহয় কলকাতা ধরে নিল, আর্জেন্টিনা এ বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠছে। আবার বিজয়োল্লাসে ভাসবে শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ? এর উত্তর পেতে আপনাকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।