শনিবার বিকেলে দুই দলের কোচ-খেলোয়াড়দের সাংবাদিক বৈঠক সেরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন থেকে বেরনোর পথে বোঝা গেল মাঠের ভেতর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মহড়া চলছে। প্রবল শব্দে বাজছিল এ আর রহমানের সুরে বাঁধা সেই বিখ্যাত গান ‘জয় হো’। মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সেই গান, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার’।
এই জয়ের কাতর আর্তি নিয়ে শনিবার বিকেলে যখন শুরু হবে এশিয়ার প্রাচীনতম ফুটবল টুর্নামেন্ট, তখন ফুটবলের জয় হবে, না জিতবে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট বা ইস্টবেঙ্গল এফসি, এই প্রশ্নটা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে।
শনিবারের এই ‘অকাল ডার্বি’ নিয়ে চারদিকে প্রচুর হইচই হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বড় ম্যাচ দেখে মন ভরবে বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের? নাকি আরো একবার ভারতীয় ফুটবলের মানকে গালিগালাজ করতে করতে মাঠ ছাড়বেন দুই দলের সমর্থকেরা? এমন হলেও অবাক হব না।
‘অকাল ডার্বি’-ই তো। ক্লাব মরসুমের শুরুতেই মরসুমের সেরা ম্যাচটি হয়ে গেলে তা অনেকটা কোনো সিনেমার ক্লাইম্যাক্স শুরুতেই দেখিয়ে দেওয়ার মতোই ব্যাপার। দর্শক যদি শুরুতেই ক্লাইম্যাক্স দেখে নেয় বা শেষ দৃশ্যটা শুরুতেই বুঝে ফেলে, তা হলে আর টানা আড়াই-তিন ঘণ্টা বসে বসে ছবিটা দেখবে কেন?
এই ‘অকাল ডার্বি’-ও অনেকটা সে রকমই। জাতীয় ক্লাব মরসুমের প্রথম টুর্নামেন্ট ডুরান্ড কাপ এবং তার শুরুতেই এ দেশের ক্লাব ফুটবলের সেরা ম্যাচটি হয়ে যাওয়া মানে তো সব আকর্ষণ আজই শেষ হয়ে যাবে। এর পর আর পড়েই বা কী থাকবে? ডুরান্ড কাপের আয়োজকেরা কী ভেবে এমন একটা সূচি তৈরি করেছেন, তাঁরাই জানেন। এই বিষয়ে কোনো কৈফিয়ৎ দেওয়ার প্রয়োজন তাঁরা দেননি। তাঁরা দেশের সেনাবাহিনী, সব সময় মিলিটারি মেজাজে থাকেন। কৈফিয়ৎ দেওয়ার অভ্যাস তাদের নেই।
কিন্তু এমন একটা হাই ভোল্টেজ ম্যাচ খেলার জন্য যে কোনো দলই তৈরি নয়, এই সত্যিটা তারা কোনোভাবেই লুকোতে পারবেন না। সঠিক প্রস্তুতি ছাড়া যে কোনো বড় যুদ্ধে নামা যায় না, তা সেনাবাহিনী খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু ডার্বির দুই যুযুধান দলকে সেই শর্তেই ফুটবলের যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
স্বাভাবিক ভাবেই গোটা ব্যাপারটাতে দুই দলের কোচই বিরক্ত। একদিকে, মোহনবাগান এসজি-র কোচ প্যাগনিওতিস দিলম্পেরিস বললেন, ‘মরসুমের শুরুতেই ডার্বি, তাই চ্যালেঞ্জটা কঠিন। কিন্তু আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে। দলে অনেক খেলোয়াড়ই এখনো পুরো ম্যাচ খেলার অবস্থায় নেই। অনেক কিছুর সঙ্গেই এখনো তারা পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। কিন্তু যেহেতু ম্যাচটা আমাদের খেলতেই হবে, তাই দলের খেলোয়াড়দের যথাসাধ্য তৈরি করতে হবে’।
এ পর্যন্ত পাঁচটি ডার্বিতে দল নামানো স্প্যানিশ কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসকেও এই ‘অকাল ডার্বি’ নিয়ে খুব একটা খুশি বলে মনে হল না। তিনি বলেন, ‘এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আমরা তো অনুশীলনের জন্য সময়ই পেলাম না। কিন্তু আমাদের ম্যাচটা খেলতেও হবে, জিততেও হবে। দেখা যাক কী ভাবে সেটা করা যায়। মাত্র দুটো ট্রেনিং সেশনে খেলোয়াড়দেরও ভালো করে চেনা হয়ে ওঠে না। কে কোন জায়গায় ভালো খেলে, সেটাও ভালো করে জানা যায় না। তবে প্রতিপক্ষেরও একই সমস্যা’।
ডার্বি মানেই হাই ভোল্টেজ পরিবেশ। যুবভারতীর ষাট হাজার দর্শকের চিৎকার সহ্য করে স্বাভাবিক পারফরম্যান্স দেখানোর কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় ফুটবলারদের। লাইনের বাইরে থেকে কোচের নির্দেশ শুনতে পাওয়া তো দূরের কথা, মাঠের মধ্যে সতীর্থরা কী বলছে, তাও ঠিকমতো শুনতে পায় না তারা। এমন কঠিন ম্যাচ খেলতে নামার আগে মাত্র তিন দিনের অনুশীলন! এ ভাবে কি ডার্বি খেলা যায়? প্রশ্নটা তো রয়েই যাচ্ছে।
<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”in” dir=”ltr”>𝐄𝐚𝐬𝐭 𝐁𝐞𝐧𝐠𝐚𝐥 𝐅𝐨𝐨𝐭𝐛𝐚𝐥𝐥 𝐂𝐥𝐮𝐛 🆚 𝐌𝐨𝐡𝐮𝐧 𝐁𝐚𝐠𝐚𝐧 𝐒𝐮𝐩𝐞𝐫 𝐆𝐢𝐚𝐧𝐭 <br><br>𝟐𝟓 𝐉𝐔𝐋𝐘 𝟐𝟎𝟐𝟔 | 𝟓:𝟎𝟎 𝐏𝐌 𝐕𝐢𝐯𝐞𝐤𝐚𝐧𝐚𝐧𝐝𝐚 𝐘𝐮𝐛𝐚 𝐁𝐡𝐚𝐫𝐚𝐭𝐢 𝐊𝐫𝐢𝐫𝐚𝐧𝐠𝐚𝐧, 𝐊𝐨𝐥𝐤𝐚𝐭𝐚<br><br>Watch live on <a href=”https://x.com/SonySportsNetwk?ref_src=twsrc%5Etfw”>@SonySportsNetwk</a> and <a href=”https://x.com/SonyLIV?ref_src=twsrc%5Etfw”>@SonyLIV</a>… <a href=”https://t.co/vq6vD5RgKZ”>pic.twitter.com/vq6vD5RgKZ</a></p>— Durand Cup (@thedurandcup) <a href=”https://x.com/thedurandcup/status/2080753599769145747?ref_src=twsrc%5Etfw”>July 24, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>
তবু শুক্রবার সন্ধ্যায় দুই দলই নেমে পড়ে ডার্বির আগে শেষ প্রস্তুতিতে। দুই শিবিরই নিজেদের ঝালিয়ে নিল সিচুয়েশন প্র্যাকটিস, সেটপিস অনুশীলন করে। কোচেরা দেখে নিলেন, কাদের শনিবারের ম্যাচে শুরুতেই নামানো যায়। এই ম্যাচে বিদেশি ফুটবলারদের ঝলক খুব একটা পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। শনিবার সন্ধ্যায় হয়তো একটা ‘অল ইন্ডিয়ান ডার্বি’ দেখা যাবে।
মোহনবাগানের দেজান দ্রাজিচ এবং ইস্টবেঙ্গলের দানি রামিরেজ হয়তো পরের দিকে নামতে পারেন। কারণ, ভারতীয়রা যতটা দ্রুত তৈরি হতে পারেন, বিদেশিদের তার চেয়ে বেশি সময় লাগে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। ইস্টবেঙ্গলের মহ্ম্মদ রশিদ ও মোহনবাগানের আলবার্তো রদ্রিগেজরা আগেও ডার্বি খেলেছেন। কিন্তু তাঁরা দেরিতে শহরে এসে পৌঁছনোয় কোচেরা তাঁদের আজ মাঠে নামাবেন, এমন প্রত্যাশা করা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যাবে বোধহয়।
সব মিলিয়ে যা শোনা যাচ্ছে, তাতে এই ‘অকাল ডার্বি’-তে দিলম্পেরিসের প্রথম এগারোয় গোলে বিশাল কয়েথ ছাড়াও রক্ষণে থাকতে পারেন শুভাশিস বোস, রাহুল ভেকে, মেহতাব সিং ও অভিষেক সিং। মাঝমাঠে হয়তো আপুইয়া, অনিরুদ্ধ থাপা ও সহাল আব্দুল সামাদ। দুই উইং দিয়ে আক্রমণে উঠতে দেখা যেতে পারে লিস্টন কোলাসো ও আপুইয়াকে। আর স্ট্রাইকার হিসেবে থাকতে পারেন মনবীর সিং।
লাল-হলুদের প্রথম এগারোয় হাবাস রাখতে পারেন, চার ডিফেন্ডার লালচুংনুঙ্গা, আনোয়ার আলি, সন্দীপ মান্ডি ও জয় গুপ্তাকে। তাঁদের সামনে ব্লকার হিসেবে থাকতে পারেন জিকসন সিং। মাঝমাঠে রোহিত কুমার। দুই উইঙ্গার বিপিন সিং ও রোহিত দানু এবং সবার সামনে স্ট্রাইকার হয়তো এডমন্ড লালরিন্ডিকা। দুই দলের অনুশীলন দেখে অন্তত সেরকমই বোঝা গিয়েছে। কিন্তু এঁদের মধ্যে কতজন ডার্বি খেলার জায়গায় রয়েছেন, তা শনিবার তাঁরা মাঠে না নামলে বোঝার উপায় নেই।
মাঠে যেতে না পারলেও মোবাইল বা টিভি তো আছেই। ডুরান্ড কাপের সমস্ত ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখা যাবে সোনি স্পোর্টস নেটওয়ার্কে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম Sony LIV-এ প্রতিটি ম্যাচ লাইভ স্ট্রিমিং করা হবে। ফলে টিভি এবং মোবাইল— দুই মাধ্যমেই সহজে দেখা যাবে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতা।
ডার্বি মানেই যে একদিনের ‘বঙ্গভঙ্গ’, তা আর নতুন করে বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। ডার্বির দিনে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে। যার এক দিকে থাকে সবুজ-মেরুন সমর্থকেরা আর অন্যদিকে লাল-হলুদ বাহিনী। তৈরি হয় এমন এক পরিবেশ, যা সারা বিশ্বেই বিরল। আজও সকাল থেকেই তা-ই হয়েছে। কিন্তু ম্যাচের পর শেষ হাসি থাকবে কাদের মুখে, সে তো বলা কঠিন। আদৌও কেউ ভাল খেলা দেখার তৃপ্তি নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারবে কি না, সে কথা বলা তো আরও কঠিন।