রঞ্জি ট্রফি ক্রিকেটে এক নতুন ইতিহাসের রূপকার হল জম্মু-কাশ্মীর দল। তারা কর্ণাটকের মতো শক্তিশালী দলকে ক্রিকেট ফাইনালে হারিয়ে দিয়ে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটাররা। আর এই সাফল্যের পিছনে বিশ্বকর্মা হলেন ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার অজয় শর্মা। দেশের হয়ে তিনি একটি টেস্ট ও ৩১টি একদিনের ম্যাচ খেলার পরে ক্রিকেট জগৎ থেকে অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লির এই প্রাক্তন ক্রিকেটার জম্মু-কাশ্মীরের চরিত্রই একেবারে বদলে দিলেন।
জম্মু-কাশ্মীরের কর্ণধার হলেন মিঠুন মানহাস। তিনি অজয় শর্মার হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দেন। অজয় নিজে খুব শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করেন। তাই খেলোয়াড়দের সেইভাবেই তৈরি করেছেন। তিনি বলেছেন, জম্মু-কাশ্মীরের প্রতিভার কোনও অভাব নেই। তাই ক্রিকেটারদের যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলেই দলের চেহারা অনেক পরিবর্তন হয়ে যাবে। তাই প্রথমে শুরু থেকেই সেদিকে বেশি নজর দেওয়া হয়েছিল, যাতে খেলোয়াড়রা সুশৃঙ্খলভাবে দলের হাল ধরতে পারেন।
অনেকেই চেষ্টা করেছিলেন এমন দলে বেশ কিছু প্রলোভন দেখিয়ে কোনও খেলোয়াড়কে জায়গা করে দেওয়ার। কিন্তু কোচ কোনওভাবেই তাঁদের সমর্থন করেননি। বরঞ্চ খেলোয়াড়দের তিনি বলেছিলেন, দলের কাছে প্রয়োজন ব্যাটসম্যানদের রান আর বোলারদের উইকেট। তাই কীভাবে সেটা সম্ভব হয়, তা অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করা। এখন প্রশ্ন হল, আবদুল সামাদ আইপিএল ক্রিকেটে কীভাবে আগ্রাসী ব্যাটিং করলেন? কোচ অজয় বলেছেন, সকলের জন্য এক নিয়ম। দলে কোনওরকম তারকা প্রথা চলবে না। একটা ম্যাচে খারাপ খেলে হয়তো আউট হতে পারে, আবার পরের ম্যাচে তাকে বসিয়েও দেওয়া যেতে পারে। তাই ইচ্ছামতো খেলা যাবে না।
এদিকে জম্মু-কাশ্মীর ও কর্ণাটকের ফাইনাল খেলার পঞ্চম দিনে জম্মু-কাশ্মীর ৪ উইকেটে ৩৪২ রান করে ডিক্লেয়ার ঘোষণা করে দেয়। কামরান ইকবাল ১৬০ রানে অপরাজিত থাকেন। সাহিল লোটরাও শতরান করেছেন। তিনি ১০১ রানে অপরাজিত থেকে যান। স্বাভাবিকভাবেই জম্মু-কাশ্মীর দলের ব্যাটসম্যানরাও তাঁদের স্কোরবোর্ডকে উজ্জ্বল করেছেন। জম্মু-কাশ্মীর প্রথম ইনিংসে ৫৮৪ রান করেছিল। শুভম পুন্ডি ১২১ রান করার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। কর্ণাটক প্রথম ইনিংসে ২৯৩ রানে সবাই আউট হয়ে যান। প্রথম ইনিংসে এগিয়ে যাওয়ার সুবাদে কর্ণাটককে পিছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হল জম্মু-কাশ্মীর। এই জয়ের পিছনে দলের সমন্বয় সবচেয়ে বেশি কথা বলেছে।
জম্মু-কাশ্মীর প্রথমবার রঞ্জি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মহম্মদ আবদুল্লা। তিনি বলেছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনটা জম্মু-কাশ্মীরের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে ধরে রাখার জন্য মাঠে উপস্থিত থেকে খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করেছেন তিনি নিজে। গত শুক্রবার রাতেই তিনি শ্রীনগর থেকে উড়ে এসেছিলেন উবালিতে। দলের জয়ের সেলিব্রেশনে ওমর আবদুল্লা সামিল হয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য বিশেষ পুরস্কার থাকছে। দলের সমস্ত ক্রিকেটার ও সাপোর্ট স্টাফদের ২ কোটি টাকার আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হবে। দেওয়া হবে সরকারি চাকরিও। খেলা শেষ হওয়ার পরে দুই দলের খেলোয়াড়রা এক অভূতপূর্ব নিদর্শন রাখলেন। খেলার মাঠে এই মিলন মেলা অবশ্যই খেলোয়াড়দের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জম্মু-কাশ্মীর দল রঞ্জি জয়ের জন্য সারা রাজ্যের মানুষ আনন্দে মেতে ওঠেন। যুগান্তকারী মুহূর্তকে যেমন খেলোয়াড়রা উপভোগ করেছেন, তেমনই এই জয় গোটা রাজ্যকে গর্বিত করেছে। ৬৭ বছরের ইতিহাসে রঞ্জি ট্রফি জয়ের আনন্দে জম্মু-কাশ্মীরের রাজপথে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। সবাই আকিব নবি ও পরশ ডোগরার নামে জয়ধ্বনি দিতে থাকেন। দ্বিতীয় ইনিংস কাশ্মীরের অধিনায়ক যখন ডিক্লেয়ার ঘোষণা করেন, তখন কর্ণাটকের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় তারা আর ব্যাট করতে নামবেন না দ্বিতীয় ইনিংসে। তারা বুঝতে পেরেছিল বিরাট অঙ্কের রানে এগিয়ে থাকা জম্মু-কাশ্মীরের সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াই করার কোনও অর্থ হয় না। আকিব নবিদের এই জয়কে অভিনন্দন জানিয়েছেন আইসিসি-র প্রেসিডেন্ট জয় শাহ। এই ঐতিহাসিক জয়কে তিনি সারাজীবন মনে রাখবেন বলে জানিয়েছেন।