প্রথমে ৭০ রানে পাঁচ উইকেট ও পরে ছ’উইকেটে ১১৩— ভারতের স্কোরবোর্ডের এই হাল দেখে শনিবার সকলেই যখন প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন এই ম্যাচ ভারত জিততে পারবে না, তখন ক্রাইস্টচার্চের হেগলি ওভালে ভারতীয় দলের ডাগ আউটে বসে তাদের অধিনায়কেরও কি মনে হয়েছিল একই কথা?
ম্যাচের পর শ্রেয়স আইয়ার স্বীকার করে নেন, সত্যিই তিনি তখন হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তিলক ভার্মা ও নীতিশ কুমার রেড্ডি যে এমন অসাধারণ একটা পার্টনারশির গড়ে দলকে শেষ পর্যন্ত জিতিয়েই মাঠ ছাড়বেন, তা ভাবতে পারেননি তাঁদের অধিনায়ক।
তবে দলের হেড কোচ গৌতম গম্ভীর অবশ্য ব্যাট করতে যাওয়ার আগে তিলককে বলেছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত উইকেটে টিকে থাকলে দলকে যে জেতাতে পারেন, সেই বিশ্বাস তাঁর আছে।
শনিবার ক্রাইস্টচার্চে ভারত তাদের ৩০০তম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে টস জিতে নিউজিল্যান্ডকে ব্যাট করতে পাঠায়। জয়ের জন্য নিউজিল্যান্ড তাদের ১৮১ রানের লক্ষ্যের সামনে দাঁড় করায়। শুরুটা ভালই করলেও মাঝের ওভারগুলিতে একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় শ্রেয়স আইয়ারের দল।
নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারের স্পিনে দিশাহারা হয়ে পড়েন ভারতীয় ব্যাটাররা। চার উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের রং বদলে দেন কিউয়ি অধিনায়ক। ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ১১৩ রানে ৬ উইকেট। সেখান থেকে জয় কার্যত অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু তিলক ও নীতিশ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় ব্যাট করে সপ্তম উইকেটে ৬৯ রানের পার্টনরাশিপ গড়ে ভারতকে তাদের দুশোতম টি-টোয়েন্টি জয় এনে দেয়।
মূলত তিলকের ২৬ বলে অপরাজিত ৫১ রানের ইনিংসই ভারতের জয়ের রাস্তা তৈরি করে দেয়। তিলকের ইনিংসে ছিল ছ’টি চার ও একটি ছয়। তাঁকে দুর্দান্ত সঙ্গত দেন নীতিশ। ১৩ বলে অপরাজিত ২৬ রান করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।
ম্যাচের পরে ভারতীয় অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার স্বীকার করেই নেন, একটা সময় তাঁর মনে হয়েছিল, ম্যাচটা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। সম্প্রচারকারী চ্যানেলকে তিনি বলেন, ‘পরপর উইকেট হারানোর পর মনে হচ্ছিল, ম্যাচটা আমাদের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নীতিশ ও তিলক দারুণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। আমাদের প্রত্যেক ক্রিকেটারই ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা রাখে। আজ তারই একটা উদাহরণ পাওয়া গেল। নমনও গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছে। ও অসাধারণ বোলারও, পাশাপাশি ওর মধ্যে প্রচুর লড়াকু মানসিকতা রয়েছে। সব দিক থেকেই ও সম্পূর্ণ ক্রিকেটার’।
নিউজিল্যান্ডের স্পিনারদেরও প্রশংসা শোনা যায় ভারত অধিনায়কের মুখে। তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে আমরা অনেক ডট বল খেলেছিলাম। তার ফলে প্রয়োজনীয় রানের গতি বেড়ে যাচ্ছিল। আমরা যখন ব্যাট করতে নেমেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম সহজেই ম্যাচটা জিতে যাব। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের স্পিনারেরা দারুণ বল করেছে। বিশেষ করে ব্রেসওয়েল ও স্যান্টনার। আমরা যদি ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে বাউন্ডারি মারতে পারতাম, তা হলে অনেক সহজেই ম্যাচটা জিততে পারতাম। ফিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য ছিল, প্রতিটি বলের জন্য তৈরি থাকতে হবে। যাতে বিপক্ষের ব্যাটাররা দু’রান নেওয়ার আগেও দু’বার ভাবে’।
ম্যাচের সেরা তিলক ভার্মা বলেন ‘ব্যাট করতে নামার সময় শুধু একটাই কথা ভাবছিলাম— শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে। ইনিংসের আগে গৌতম স্যর এবং কোটাক স্যরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ওঁরা বলেছিলেন, গোটা ভারতীয় দল তোমার উপর আস্থা রাখে। তুমি যদি শেষ পর্যন্ত ব্যাট করতে পারো, তা হলে আমরা ম্যাচ জিততে পারি। নিজের পারফরম্যান্সে আমি সত্যিই গর্বিত’।
প্রথমে নমন ধীরের সঙ্গে ২৪ বলে ৪২ রানের পার্টনারশিপ ও পরে নীতিশ রেড্ডির সঙ্গে ৩০ বলে ৬৯ রানের পার্টনারশিপ গড়েন তিলক। তাঁদের সঙ্গে এই দুই পার্টনারশিপ নিয়ে তিলক বলেন, ‘আমি নমনকে বলছিলাম, আমাদের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে। উইকেটটা একটু মন্থর ছিল। স্পিনাররা যখন বল করছিল, তখন নমনকে বলেছিলাম, আমাদের দ্রুত রান তুলতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, মিচেলের শেষ ওভারে নমন আউট হয়ে যায়। তা না হলে হয়তো ১৮তম ওভারেই ম্যাচ জিতে যেতে পারতাম’।
নমন আউট হয়ে যাওয়ার পর হায়দরাবাদের দুই ক্রিকেটার লড়াই শুরু করেন এবং সেই লড়াইই শেষ পর্য্ত ভারতকে রুদ্ধশ্বাস জয় এনে দেয়। তিলক বলেন, ‘আমি খুশি যে নীতীশ এবং আমি মিলে ম্যাচটা শেষ করতে পেরেছি।পেসারদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হওয়ার আগে পর্যন্ত অপেক্ষা করার একটা পরিকল্পনা ছিল। স্পিনারদের বিরুদ্ধে চার-পাঁচ বার দু’টি করে রান নেওয়াটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এত বড় মাঠে দ্রুত রান তোলার জন্য সেই গতি প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত যে দারুণ ভাবে ম্যাচটা শেষ করতে পেরেছি, এটাই ভালো লাগছে’।
তবে সিরিজ যেহেতু পাঁচ ম্যাচের এবং সবে দুটি ম্যাচ হয়েছে, তাই এখনই এই জয় নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসতে রাজি নন অধিনায়ক শ্রেয়স। বলেন, ‘এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। সবে অর্ধেক কাজ হয়েছে। বাকিটুকুও করতে হবে’।
সিরিজের পরবর্তী ম্যাচ ওয়েলিংটনে, আগামী মঙ্গলবার। এই ম্যাচ জিতলেই সিরিজ পকেটে পুরে ফেলবে ভারত। সিরিজে লড়াইয়ে থাকতে গেলে নিউজিল্যান্ডকে তাই এই ম্যাচে জিততেই হবে।