রণজিৎ দাস
বাংলার ফুটবল কি এখন শুধুই গ্যালারির আবেগে সীমাবদ্ধ? ইন্ডিয়ান সুপার লিগে যখন ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান এবং মহামেডান—তিন প্রধানের উপস্থিতি বাংলাকে গর্বিত করছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে ঘনিয়ে আসছে এক গভীর সংকট। বাংলার ক্লাব সাফল্য পেলেও, হারিয়ে যাচ্ছে ‘বাঙালি ফুটবলার’।
এবারের আইএসএলের শুরুতেই ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান বড় জয় দিয়ে অভিযান শুরু করায় সমর্থকরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু এই সাফল্যের কারিগরদের তালিকায় বাংলার নাম খুঁজতে গেলে হতাশা বাড়ছে। কোটি কোটি টাকায় বিদেশি এবং ভিনরাজ্যের তারকাদের দলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। আর্থিক সংকটের কারণে মহামেডান এসসি কিছু বাঙালি ফুটবলারকে খেলাতে বাধ্য হচ্ছে, কিন্তু এটি তাদের পরিকল্পনার চেয়েও বেশি ছিল পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা।
গত দুই বছরে সন্তোষ ট্রফিতে বাংলার প্রায় ৪০ জন ফুটবলার নিজেদের প্রমাণ করেছেন। বাংলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, এবারও কোয়ার্টার ফাইনালে লড়াই করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রতিভারা গেল কোথায়?
ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের মতো বড় দলে এই ট্রফি জয়ী ছেলেদের নামমাত্র সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা কেবল রিজার্ভ বেঞ্চেই আটকে থাকছেন। মাত্র ১০-১৫ মিনিটের জন্য মাঠে নামিয়ে একজন ফুটবলারের প্রতিভা বিচার করা অসম্ভব। ফলে ঘরোয়া টুর্নামেন্টে যারা নায়ক, আইএসএলের গ্ল্যামারে তারা ব্রাত্য। বাঙালি ফুটবলারের ‘আকাল’ চলছে—এই অজুহাত কার্যত ভিত্তিহীন। আসল সমস্যা লুকিয়ে আছে পরিকাঠামো এবং মানসিকতায়।
ভিনরাজ্যের অ্যাকাডেমিগুলো যেভাবে ফুটবলার সাপ্লাই দিচ্ছে, বাংলার ক্লাবগুলো কি সেভাবে প্রতিভাকে লালন করতে পারছে?
ক্লাব ও আইএফএ-র মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। সন্তোষ ট্রফিতে ভালো খেলা ছেলেদের বড় মঞ্চে তুলে দেওয়ার জন্য যে ‘ব্রিজ’ বা সেতুবন্ধন দরকার, তা আজ ভাঙাচোরা। এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার যদি এই ধারা চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ হবে ঠিকই, কিন্তু মাঠের ১১জন কিংবা ডাগআউটের কোচের মধ্যেও কতজন বাঙালির দেখা মিলবে? ফুটবল শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি একটি সংস্কৃতির ধারক।
শুধুমাত্র ট্রফি জয়ের লোভে ঘরের ছেলেদের বঞ্চিত করলে বাংলার ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হবে। ফুটবলার তৈরির কারখানা হিসেবে পরিচিত বাংলা যদি কেবল ‘ক্রেতা’ হয়ে থেকে যায়, তবে অচিরেই বাঙালির ফুটবল আবেগ তার মাটি হারাবে।