মাঠের ভেতরে ফুটবল, আর মাঠের বাইরে রাজনৈতিক প্রতিবাদ– ইরানের প্রথম ম্যাচ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে দেখা গেল এক বিরল দৃশ্য। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইরানের গ্রুপ-পর্বের ম্যাচকে কেন্দ্র করে শয়ে শয়ে ইরানি-আমেরিকান বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের দাবি, ইরানের জাতীয় দল বর্তমান তেহরান সরকারের প্রতীক, তাই বিশ্বকাপের মঞ্চকে ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
লস অ্যাঞ্জেলিসে বিশ্বের বৃহত্তম ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়গুলির একটি বসবাস করে। ফলে এই ম্যাচকে ঘিরে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায়। একদল সমর্থক জাতীয় দলকে সমর্থন জানাতে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, অন্য দিকে আরেক দল স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভে শামিল হয়ে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীদের অনেকেই ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ পতাকা বহন করেন, যা স্টেডিয়ামের ভিতরে নিষিদ্ধ করে ফিফা। যদিও আদালতও ফিফার এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে, তবুও কিছু দর্শক লুকিয়ে-চুরিয়ে সেই পতাকা স্টেডিয়ামের ভেতরে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। এই পতাকা বর্তমানে ইরানের বিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ম্যাচের আগে ও পরে বিক্ষোভকারী এবং সমর্থকদের মধ্যে কয়েক দফা উত্তেজনা তৈরি হয়। নিরাপত্তাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা এক সমর্থকের হাতে থাকা সরকারি ইরানি পতাকা ছিনিয়ে নিয়ে তা মাটিতে ফেলেও দেন।
তবে সব ইরানি-আমেরিকান একই মত পোষণ করেন না। অনেকেই মনে করেন, ফুটবলকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা উচিত। তাঁদের মতে, জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন, সরকারের নয়। এ কারণে তারা দলকে সমর্থন করতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন।
বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া বঙ্গসন্তান ও মোহনবাগান সমর্থক স্মরজিৎ ব্যানার্জিও এই ম্যাচে ইরানের সমর্থকদের সঙ্গে বসেই খেলা দেখেন। ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচেও যেমন তিনি ভারতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে খেলা দেখেছিলেন, এ দিনও সেই জার্সি গায়েই তিনি লস অ্যাঞ্জেলিস স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজির ছিলেন।
গ্যালারির সমর্থকদের নিয়ে চন্দননগরের এই মোহনবাগান-প্রেমী সেখান থেকে ফোনে জানান, ‘ইরানের প্রবাসী সমর্থক বেশি ছিল। ইরানের লোক যারা এসেছিল তারা হয় আমেরিকায় থাকে অথবা তারা অন্য দেশের নাগরিক। যেমন কানাডা, যেখান থেকে ভিসা পেতে সমস্যা না হয়। ওই সমর্থকদের মুখেই শুনলাম, ইরান থেকে কেউ আসতে পারেনি, ভিসা সমস্যার জন্য।‘
তিনি আরও বলেন, ‘আর ছিল প্রচুর মেক্সিকোর লোক। লস অ্যাঞ্জেলিস মেক্সিকোর খুব কাছাকাছি, তাই এখানে মেক্সিকান অনেক। তারা সবাই ইরানকে সমর্থন করছিল। নিরাপত্তারক্ষী ছিল অনেক। তবে সিকিউরিটি চেক খুব কড়া ছিল না। স্বচ্ছ্ব প্লাস্টিক ব্যাগ ও সিল করা জলের বোতল নিয়ে ঢুকতে পারছিল সবাই। সিগারেট ও লাইটার নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল, তবে মাঠে সিগারেট খাওয়ার ওপর কড়া বিধিনিষেধ ছিল।
নিরাপত্তা রক্ষার নামে কোনও সমর্থককে হেনস্থা করা হয়েছে বলে শুনিনি। কাউকেই নিরাপত্তা নিয়ে বিরক্ত হতে দেখিনি’। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি বিশ্বকাপের আগে বলেছিলেন, “আমরা ইরানের ভেতরে কিংবা প্রবাসে থাকা সব ইরানির জন্য খেলি। মানুষের মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু আমরা সবাইকে একত্রিত করতে চাই এবং বিশ্বের যেখানেই থাকুক, সব ইরানির মুখে হাসি ফোটাতে চাই।”
বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ এমনিতেই নানা বিতর্কে ঘেরা। চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত, ভিসা জটিলতা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দলটিকে অ্যারিজোনা থেকে প্রশিক্ষণ শিবির সরিয়ে মেক্সিকোতে নিয়ে আসতে হয়। কয়েকজন ইরানি ফুটবল কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতিও পাননি।
সব বিতর্কের মাঝেও অবশ্য সোমবার (ভারতীয় সময়ে মঙ্গলবার) মাঠের লড়াই ছিল জমজমাট। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দু’বার পিছিয়ে পড়েও ইরান ২-২ ড্র করে এক পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে। তবে ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে স্টেডিয়ামের বাইরে চলা রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং প্রবাসী ইরানিদের দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা।