ভিএআর বিতর্কের পর ড্রেসিংরুমে ‘ফেয়ার প্লে’ বার্তা ইরান দলের, ফিফার বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন তারেমি

মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ভিএআরের সিদ্ধান্তে জয়সূচক গোল বাতিল হয়ে যায়। সেই সিদ্ধান্তে ফিফা বিশ্বকাপের নকআউটে সরাসরি ওঠার সুযোগ হাতছাড়া করে ইরান। স্বাভাবিকভাবেই হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন ফুটবলাররা। কিন্তু সেই হতাশার মধ্যেও খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার এক অনন্য নজির গড়ে ইরান দল। ম্যাচ শেষে তারা ড্রেসিংরুম ছেড়ে যাওয়ার আগে একটি আবেগঘন বার্তা লিখে রেখে যায়, যেখানে ফুটবলের মূল চেতনা—সম্মান, ন্যায্যতা ও সৌহার্দ্যের কথাই তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতীয় সময়ে শনিবার সকালে। সিয়াটেলে মিশরের বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করার পর ইরানের আশা-নিরাশার দোলাচল তৈরি হয়। সংযুক্ত সময়ে শোজাই খলিলজাদেহ বল জালে জড়িয়ে দেন। সেই গোল হলে ইরান ২-১ ব্যবধানে জিতে সরাসরি শেষ ৩২-এ পৌঁছে যেত। কিন্তু ভিএআরের পর অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের ফুটবলাররা হতাশ হয়ে মাঠে লুটিয়ে পড়েন। এখন তাদের ভাগ্য নির্ভর করছে অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের ওপর।

তবে সেই হতাশার জেরে ইরানের ড্রেসিংরুমে কোনও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়নি। বরং ইরান দল একটি হাতে লেখা বার্তা রেখে যায়, যা ছিল বেশ আবেগময় এবং দার্শনিক। কী লেখা ছিল সেই বার্তায়?’আমরা এসেছি ইরান থেকে—একটি এমন দেশ থেকে, যেখানে হাজার হাজার বছর ধরে সাফল্যের চেয়েও সম্মানকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়েছে। আমাদের কাছে ফুটবল শুধু ফলাফলের লড়াই নয়, এটি চরিত্রেরও পরীক্ষা। পয়েন্ট হয়তো নানা উপায়ে অর্জন করা যায়, কিন্তু সেভাবে সম্মান অর্জন করা যায় না। একটি দল হয়তো গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র ন্যায্যতা ও মর্যাদার মাধ্যমেই ইতিহাসের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়।


ফেয়ার প্লে ফুটবলের রুলবুকের একটি সাধারণ ধারা নয়; এটাই এই খেলার আত্মা। সিয়াটল, আমাদের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। আর ধন্যবাদ সেই সব ইরানবাসীকে, যারা নিজেদের হৃদয়, কণ্ঠস্বর এবং সর্বস্ব উজাড় করে ইরানকে সমর্থন জানিয়েছেন। ইরান—চিরকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।’ তাদের বার্তার শেষে আরও লেখা ছিল, ‘ফুটবল আমাদের একত্রিত করে। জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে থেকে এই খেলার সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখুন।’

এই বার্তা দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু ফুটবলপ্রেমী ইরান দলের ক্রীড়াসুলভ মানসিকতার প্রশংসা করেন। ভিএআর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রতিপক্ষ বা ম্যাচ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনও বিরূপ মন্তব্য না করে ইরান যেভাবে খেলাধুলার আদর্শকে সামনে রেখেছে, তা বিশ্ব ফুটবলে প্রশংসিত হচ্ছে।এর আগে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করার পর সোফাই স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে একটি বার্তা লিখে রেখে গিয়েছিল ইরান দল। সেই বার্তায় বিশ্বকাপ চলাকালীন লস অ্যাঞ্জেলেসের আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয় এবং বলা হয়, তারা মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেই শহরটি ছেড়ে যাচ্ছে।

ইরান ফুটবল ফেডারেশন প্রকাশিত হাতে লেখা সেই বার্তায় বলা হয়েছিল— ‘হাজার হাজার বছরের প্রাচীন পারস্য থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ও সভ্য ইরান—সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু ইরানের চেতনা আজও জীবন্ত, অটুট এবং অবিচল।” বার্তার শেষে লেখা ছিল— “লস অ্যাঞ্জেলেস, তোমাদের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ। আমরা গর্ব নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলাম, সম্মানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি এবং মর্যাদা অটুট রেখেই এখান থেকে বিদায় নিচ্ছি।’

শনিবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের এই ম্যাচে প্রভাবশালী পারফরম্যান্সের জন্য ইরানের রামিন রেজাইয়ানকে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ বেছে নেওয়া হয়। ম্যাচের শুরুতে মাহমুদ সাবেরের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল মিশর। পরে রামিন রেজাইয়ানের গোলে সমতা ফেরায় ইরান।মেহদি তারেমি একটি পেনাল্টি মিস করেন। শেষ মুহূর্তের ভিএআর নাটক তাদের ভাগ্য বদলে দেয়। ফলে মিশর গ্রুপের রানার্স-আপ হিসেবে শেষ ৩২-এ উঠে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হবে, আর ইরানকে অপেক্ষা করতে হবে অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের জন্য।

তবে শনিবারের ম্যাচের পর ইরান ফুটবল দলের অধিনায়ক তোপ মেহদি তারেমি সরাসরি তোপ দেগেছেন ফিফার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “ফিফা এবং যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য কিছুই করেনি। তারা চেয়েছিল ইরান টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিক।”এই তারকা ইরানি স্ট্রাইকার অভিযোগ করেন, “বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আমরা এই টুর্নামেন্টে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছি। এটা এক কথায় ভয়াবহ বিশ্বকাপ, সত্যিই ভয়াবহ!

আমরা পেশাদার ফুটবলার, একটি পেশাদার প্রতিযোগিতায় খেলছি। অথচ এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের খেলতে হয়েছে, যা মোটেও সঠিক বা ন্যায্য নয়। ফিফা যদি মনে করে এটাই ন্যায্য, তাহলে সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এটা মোটেই ন্যায্য নয়।”
তারেমির দাবি, ‘নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচের পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আমাদের ড্রেসিংরুমে এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সব সমস্যার সমাধান করা হবে। কিন্তু বাস্তবে ফিফা কিছুই করেনি!’

এর পরই সরাসরি আয়োজকদের উদ্দেশে তোপ দাগেন তারেমি। বলেন, ‘এখানে আমাদের প্রতিটি বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। মানুষ কী চেয়েছিল, আমি জানি না। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, হ্যাঁ—আমার মনে হয়, তারা চেয়েছিল যে, আমরা যেন গ্রুপ পর্বের বেশি না এগোতে পারি।’