আট গোলের ম্যাচে জিতে বিশ্বকাপ থেকে পাকিস্তানকে ছিটকে দিয়ে দ্বিতীয় পর্বে ভারত, গ্যালারিতে বলের আঘাতে জখম তরুণী

India Defeated Pakistan Photo-SNS

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে হারিয়ে হকি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা নিশ্চিত করল ভারত। আট গোলের এই ম্যাচে ৫-৩-এ হারিয়ে বিশ্বকাপ থেকে পাকিস্তানকে ছিটকে দিল ভারত।

বুধবার নেদারল্যান্ডসের অ্যামস্টেলভিনে ভারতের হয়ে জোড়া গোল করেন হরমনপ্রীত সিং ও অভিষেক। আর একটি গোল করেন হার্দিক সিং। পাকিস্তানের হয়ে দু’টি গোল করেন হান্নান শাহিদ এবং একটি সুফিয়ান খানের। তবে তাঁদের গোল শেষ পর্যন্ত সান্ত্বনা হয়েই থেকে গেল।

এ দিনই ওয়েলসকে ৮-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপের শীর্ষে উঠে পড়ে ইংল্যান্ড। এই জয়ের ফলে পাওয়া তিন পয়েন্ট এবং +২ গোলের ব্যবধান নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে গেল তারা। সেখানে ভারত ও ইংল্যান্ডের সঙ্গে যোগ দেবে নেদারল্যান্ডস এবং আর্জেন্টিনা বা নিউজ়িল্যান্ডের মধ্যে একটি দল।


এ দিন সারা ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। ভারত-পাক দ্বৈরথের উত্তেজনা ওঠে চরমে। তবে আগাগোড়া আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য রেখে ও বুদ্ধিদীপ্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত।

এ দিন পাঁচ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল পায় ভারত। ভারতীয় অধিনায়ক হরমনপ্রীত ড্র্যাগ ফ্লিক থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। তার মিনিট তিনেক আগেই অবশ্য গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন দিলপ্রীত সিং। পাঁচ মিনিটের মাথায় প্রথম পেনাল্টি কর্নারও পায় ভারত। তবে কোনো সুযোগই তারা কাজে লাগাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত গোলের মুখে খোলেন হরমনপ্রীত।

১১ মিনিটের মাথায় ব্যবধান দ্বিগুণ করে ভারত। অভিষেকের পাস পাকিস্তানের এক খেলোয়াড়ের স্টিকে লেগে ছিটকে যায়। ডি-এর ভিতরে ভিড়ের মধ্যে মনদীপ সিং-এর টাচেই বলের গতিপথ বদলে যায় ও বল গোলে ঢুকে পড়ে।

ম্যাচের ১৩ মিনিটের মাথায় সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন মনপ্রীত। ড্র্যাগ করার সময় ভারতীয় অধিনায়ক বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং শটও নিতে পারেননি। রেফারালের আবেদন জানাতে আম্পায়ারের কাছে ছুটে যান মনপ্রীত। কিন্তু তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এই পরিস্থিতিতে রেফারাল চাওয়া যাবে না। প্রথম কোয়ার্টার দু’গোলে এগিয়ে থেকেই শেষ করে ভারত।

দ্বিতীয় কোয়ার্টারের শুরুতেই একটি দুর্ঘটনা ঘটে। বলের আঘাতে গ্যালারিতে এক দর্শক আহত হন। আম্পায়ার সাময়িক ভাবে খেলা থামিয়ে গ্যালারিতে চিকিৎসক পাঠানোর অনুরোধ করেন। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয় এবং ফের খেলা শুরুও হয়। পরে জানা যায়, বলটি এক তরুণী দর্শকের মুখে আঘাত করে। তাঁর চিকিৎসা করা হয় এবং পরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।

দ্বিতীয় কোয়ার্টারের ছ’মিনিটের মাথায় তৃতীয় গোল পায় ভারত। হরমনপ্রীত ড্র্যাগ-ফ্লিকের পথে না গিয়ে বলটি পিছনে রাজিন্দর সিং-এর দিকে ফ্লিক করেন। তাঁর শটটি অবশ্য গোলরক্ষক আটকে দেন। তবে ছিটকে আসা বলট ভারতীয়দের কাছেই আসে। শেষ পর্যন্ত বল এসে পড়ে হরমনপ্রীতের স্টিকেই। তাঁর জোরালো শট গোলের নীচের ডান দিকের কোণ দিয়ে ঢুকে পড়ে। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল হরমনপ্রীতের পঞ্চম গোল।

এই গোলের দু’মিনিট পরেই প্রথম গোল শোধ করে পাকিস্তান। প্রথম গোলটি করেন হান্নান শাহিদ। তাঁর প্রথম শটটি মাটিতে বাউন্স খেয়ে উপরে উঠে যায়, যা ভারতীয় গোলরক্ষক সূরজ কারকেরা ঠেলে দূরে সরিয়ে দেন। দ্বিতীয় শটটিও ভারতীয় গোলকিপার পা দিয়ে আটকে দেন। তবে সেই বল ছিটকে এলে দ্রুত দূরের কোণ দিয়ে গোলে ঠেলে দিয়ে ব্যবধান কমান হান্নান।

তবে এর দুমিনিটের মধ্যেই ব্যবধান ফের বাড়িয়ে নেয় ভারত। ম্যাচের দ্বিতীয় গোল করেন অভিষেক। আরও এক বার পাকিস্তানের খেলোয়াড়ের স্টিকে লেগে বলের গতিপথ বদলে যায়। পাকিস্তানের দুই খেলোয়াড়ের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গিয়ে বল বাড়ান ভারতীয় দলের ফরোয়ার্ড অভিষেক। তাঁর পাস পাকিস্তানের এক খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে সোজা গোলে ঢুকে যায়।

ভারতের এই চতুর্থ গোলের পরেই ফের ব্যবধান কমান পাকিস্তানের সুফিয়ান খান। প্রথম রাশারের গায়ে সামান্য ডিফ্লেকশন হয়ে বলের গতিপথ বদলে যায় এবং কারকেরা দ্বিতীয় বারের মতো পরাস্ত হন।

এর পর থেকেই ক্রমশ চাপ বাড়াতে শুরু করে পাকিস্তান। তবে ভারত যথাসম্ভব বল নিজেদের দখলে রেখে ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে রাখার চেষ্টা করে। দ্বিতীয় কোয়ার্টার শেষ হয় ৪-২-এ।

এই বিরতিতে টিভিতে দুই কোচের কথার লড়াইও শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানের ডাচ কোচ বব জোহান ভেলডফ বলেন, ‘আমাদের এখনও সুযোগ রয়েছে। আমরা শুরুটা খুবই হালকা ভাবে করেছিলাম। কয়েক জন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মার্ক করেছিল। তবে পরে আমরা বেশ ভাল ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের আরও ভাল খেলতে হবে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব’।

অন্যদিকে, ভারতের কোচ ক্রেগ ফালটনের বক্তব্য ছিল, ‘এই ধরনের ম্যাচ খুব দ্রুত ঘুরে যেতে পারে। বল পজেশনে আমাদের আরও ভাল হতে হবে, যাতে সহজে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রতিপক্ষকে সুযোগ না দিয়ে ফেলি আমরা’।

তৃতীয় কোয়ার্টারের শুরুতেই ফের এগিয়ে যায় ভারত। পাঁচ মিনিটের মাথায় আদিত্য লালাগেকে ফাউল করেন আরশাদ, আর সঙ্গে সঙ্গেই ভারতকে পেনাল্টি স্ট্রোকের নির্দেশ দেন আম্পায়ার! ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, পাকিস্তানি খেলোয়াড়টি কার্যত নিজের স্টিক দিয়ে ভারতীয় খেলোয়াড়ের পায়ে আঘাত করে তাঁকে ফেলে দেন। ফলে পেনাল্টি স্ট্রোকের সিদ্ধান্ত একেবারেই ভুল ছিল না।

পেনাল্টি স্ট্রোকে কোনো ভুল করেননি হার্দিক সিং। নীচের বাঁ দিকের কোণ দিয়ে বল গোলে পাঠিয়ে ভারতের পঞ্চম গোলটি করে ফেলেন তিনি। ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-২। এই ব্যবধানেই তৃতীয় কোয়ার্টার শেষ হয়।

চতুর্থ ও শেষ কোয়ার্টারের প্রথম মিনিটেই ফের ব্যবধান কমায় পাকিস্তান। মাঝমাঠে হার্দিক বলের নিয়ন্ত্রণ হারানোয়, সেখান থেকেই পাকিস্তানের পাল্টা আক্রমণের সূত্রপাত হয়। শেষ পর্যন্ত শাহিদ নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে ফেলেন এবং দুই দলের ফারাক দাঁড়ায় দু’গোলের।

শেষ কোয়ার্টারে ভারতকে বেশ চাপে ফেলে দেয় পাকিস্তান। ব্যবধান কমানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। ভারতও তাদের আটকানোর যাবতীয় চেষ্টা করে যায়। এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে।

ন’মিনিটের মাথায় ভারত রেফারাল নেয়। তাদের আবেদন ছিল, দিলপ্রীতের ডাইভিং প্রচেষ্টার সময় পাকিস্তানের এক ডিফেন্ডারের পায়ে বল লেগেছিল, তাই ভারতের পেনাল্টি কর্নার পাওয়া উচিত। তবে রেফারালে ভারতের দাবি খারিজ হয়ে যায়। এর পর আর ভারতের কাছে রেফারেলের কোনো সুযোগ ছিল না।

পাকিস্তানের কাছে রেফারেল নেওয়ার সুযোগ ছিল এবং ১৩ মিনিটের মাথায় রেফারাল নেয় তারা। সার্কলের ভিতরে ভারতীয় খেলোয়াড়ের পায়ে বল লেগেছিল বলে দাবি করে তারা এবং সেই কারণেই পেনাল্টি কর্নার চায় তারা।

দেখা যায়, সঞ্জয়ের পায়ে বল লেগেছিল। ফলে রেফারাল মঞ্জুর হয় এবং পেনাল্টি কর্নার পায় পাকিস্তান।উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে! পেনাল্টি কর্নারে ড্র্যাগ-ফ্লিক না নিয়ে সতীর্থের দিকে পাস বাড়ালে সেই পাস ঠিকঠাক হয়নি। ফলে বলের দখল ফিরে পায় ভারত।

শেষ দু’মিনিট প্রতিপক্ষকে ঠেকিয়ে রাখতে সমর্থ হয় ভারত এবং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে হারিয়ে দ্বিতীয় পর্বে পৌঁছে যায় ভারত! শেষ কোয়ার্টার টানটান উত্তেজনায় ঠাসা। তবে শেষ পর্যন্ত দুই গোলের ব্যবধান ধরে রেখে ম্যাচ জিতে নেয় ভারতীয় দল।