‘শেষ’ ম্যাচে আর্থার অ্যাশে, রেড কার্পেটে সেই চেনা লাজুক হাসি-কথায় মন জিতলেন কিংবদন্তি ফেডেরার

Photo: X

টেনিস কোর্টে তাঁর রাজকীয় উপস্থিতি দেখেছেন গোটা বিশ্ব। এ বার কোর্টের বাইরে রেড কার্পেটেও নজর কাড়লেন রজার ফেডেরার। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় আচমকাই তাঁর জন্য রেড কার্পেট পেতে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই মুহূর্তে সুইস কিংবদন্তির লাজুক হাসি, হাত নাড়ানো এবং মৃদু পোজই হয়ে উঠল দিনের সবচেয়ে চর্চিত দৃশ্য।

ফেডেরারের সামনে রেড কার্পেট! দৃশ্যটা যেন সিনেমার। কিন্তু তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারেই অন্য রকম। কোনও তারকাসুলভ দম্ভ নয়, বরং খানিকটা লজ্জা মেশানো হাসি দিয়ে ভক্তদের দিকে হাত নাড়লেন ২০টি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক। তার পর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দিলেন ছোট্ট একটি পোজ। মুহূর্তেই সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।

ভিডিওটি শেয়ার করেছেন ‘রেড কার্পেট গাই’ নামে পরিচিত অ্যান্ড্রু ওয়েভ। সেখানে দেখা যায়, নিউ ইয়র্কের রাস্তায় ফেডেরারকে দেখে তাঁকে যেন স্বাগত জানাতেই রেড কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। টেনিস মহাতারকাও বিষয়টি হাসিমুখে গ্রহণ করেন। তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ী প্রতিক্রিয়াই নজর কেড়ে নেয় নেটদুনিয়ার।


ফেডেরারের নিউ ইয়র্ক সফর এমনিতেই এ বার বিশেষ। ৪৫ বছর বয়সি সুইস তারকা অবসর নেওয়ার পরেও টেনিসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে একটুও ফিকে হয়নি, তা ফের প্রমাণ হয়েছে ইউএস ওপেনের আবহে।

চার বছর আগে অবসর নিলেও রজার ফেডেরার কোর্টে ফিরলে যে এখনও নিউ ইয়র্কের গ্যালারি একই ভাবে গর্জে ওঠে, তা আরও এক বার দেখা গেল। মঙ্গলবার ইউএস ওপেনের প্রদর্শনী ম্যাচে আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে ফিরলেন ২০টি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক।

দাঁড়িয়ে উঠে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান কানায় কানায় ভর্তি গ্যালারির দর্শকেরা। তার পর রজার দেখালেন পুরনো ঝলক। অ্যান্ডি রডিককে এক সেটের ম্যাচে ৬-৩ হারালেন তিনি। পরে জন ম্যাকেনরোর সঙ্গে জুটি বেঁধে ডাবলসে হারালেন আন্দ্রে আগাসি ও রডিককে।৭-৫-এ।

সেই ম্যাচেও যেন ফিরে এসেছিল পুরনো ‘ফেডেক্সপ্রেস’। একহাতের ব্যাকহ্যান্ড, নিখুঁত পাসিং শট—সব কিছুতেই মুগ্ধ নিউ ইয়র্কের দর্শক। ম্যাচ শেষে ফেডেরার বলেন, ‘নিউ ইয়র্কে ফিরে এসে দারুণ লাগছে। এই কোর্ট, এখানকার দর্শক এবং এই শহরকে ঘিরে আমার অসাধারণ সব স্মৃতি রয়েছে’।

<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>A send-off in Arthur Ashe Stadium fit for a 👑<br><br>Thank you, <a href=”https://x.com/rogerfederer?ref_src=twsrc%5Etfw”>@rogerfederer</a>. <a href=”https://t.co/uObq3eMNo8″>pic.twitter.com/uObq3eMNo8</a></p>&mdash; US Open Tennis (@usopen) <a href=”https://x.com/usopen/status/2092434087441039722?ref_src=twsrc%5Etfw”>August 26, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>

আর্থার অ্যাশে ফেডেরারের ইতিহাসও কম রোমাঞ্চকর নয়। ২০০৪ থেকে ২০০৮—টানা পাঁচ বার ইউএস ওপেন জিতেছিলেন তিনি। তাই বহু বছর পর সেই কোর্টে তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে আবেগ ছিল তুঙ্গে। দর্শকাসনে দেখা গিয়েছে তাঁর বিখ্যাত ‘RF’ লোগো-সহ নানা স্মারকও।

রডিকও বন্ধুর প্রত্যাবর্তনে আপ্লুত। ফেডেরারকে নিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘বিষয়টা আসলে রজারকে ঘিরেই। আমরা অনেক বার খেলেছি, ও আমাকে অনেক বার হারিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল, তা আজও রয়েছে এবং আশা করি চিরকাল থাকবে। রজার ডাকলে শুধু হাজির হওয়াটাই আসল’।

ফেডেরার নিজেও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ম্যাচের পর বলেন, ‘নিউ ইয়র্কে ফিরে এসে দারুণ লাগছে। অসাধারণ লাগছে। এই কোর্ট, এখানকার দর্শক এবং এই শহরকে ঘিরে আমার অসাধারণ সব স্মৃতি রয়েছে। ২০০৪, ২০০৫—সেই সময় থেকেই নিউ ইয়র্কের প্রেমে পড়েছিলাম’।

এ দিন কোর্টে পা রাখতেই সেই পুরনো নায়ককে স্বাগত জানায় নিউ ইয়র্ক। ফেডেরার বলেন, ‘প্রথম দিন থেকেই এই শহর এবং এই কোর্টের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। ২০০১-এ আন্দ্রের বিরুদ্ধে সম্ভবত প্রথম বার সেন্টার কোর্টে খেলেছিলাম। ও আমাকে ৬-১, ৬-২, ৬-৪ হারিয়েছিল। আমার কোনও সুযোগই ছিল না। তখন মনে হয়েছিল, ‘আচ্ছা, এত সহজ নয়, এত তাড়াতাড়িও নয়, রজার!’ কথার শেষে হেসে ফেলেন তিনি।

স্মৃতির রাতকে আরও বিশেষ করে তুলেছিল কিংবদন্তিদের জমায়েত। ম্যাকেনরো, আগাসি, রডিক—এক সময় যাঁদের সঙ্গে ফেডেরারের কোর্টের লড়াই, তাঁরাই এ দিন ছিলেন একই অনুষ্ঠানের অংশ। ম্যাকেনরোর সঙ্গে জুটি বেঁধে ডাবলসে জেতার পর যেন টেনিসের এক সোনালি যুগই ফিরে এল আর্থার অ্যাশে।

ফেডেরারের আসন্ন দিনগুলিও বিশেষ। ৪৫ বছরে পা দেওয়া সুইস তারকাকে ২৯ অগস্ট আন্তর্জাতিক টেনিস হল অফ ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিশ্বর‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে মোট ৩১০ সপ্তাহ ছিলেন তিনি। তার মধ্যে টানা ২৩৭ সপ্তাহ শীর্ষস্থান ধরে রাখার রেকর্ডও রয়েছে তাঁর।

ম্যাকেনরোর কথাতেও সেই আবেগ। তিনি বললেন, ‘টেনিসের জন্য সাধারণ ভাবেই দারুণ একটা সপ্তাহান্ত হতে চলেছে। নিউপোর্টে কয়েক দিন থাকতে পারব এবং এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে পারব বলে আমি খুব খুশি। আর মজা করো—এটাই আমার পরামর্শ। আমি জানি, রজার সেটাই করবে’।

আগাসির রসিকতাতেও ছিল বন্ধুত্বের ছাপ। তিনি বললেন, ‘এই লোকটা এ বছর হল অফ ফেমে যাচ্ছে—ভাবতে কত ভাল লাগে! রজার, আমি ভীষণ উত্তেজিত। ওর ১৯তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের পরই আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, ওর হয়ে গেল।’ এরপর অবশ্য নিজের স্বভাবসিদ্ধ মজা করে যোগ করেন, ‘আমার মনে হয়েছিল ২০তমটা দরকার ছিল না, একটু নিরাপত্তাহীনতার ব্যাপার ছিল’।

আর রডিক? ফেডেরারের পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে এখন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর কথায়, ‘আমরা প্রচুর বার খেলেছি এবং ও আমাকে প্রচুর বার হারিয়েছে। কিন্তু কেরিয়ারের মাঝেও আমরা বন্ধুত্বটা ধরে রাখতে পেরেছিলাম। সেই বন্ধুত্ব আজও রয়েছে, আশা করি চিরকাল থাকবে’।

রাত শেষ হয় ফেডেরারকে ঘিরে বিশেষ ড্রোন শো দিয়ে। নিউ ইয়র্কের আকাশে ফুটে ওঠে তাঁর অবয়ব, বিখ্যাত ‘RF’ লোগো এবং ইউএস ওপেন ট্রফির ছবি। কোর্ট থেকে বিদায় নিয়েছেন ফেডেরার। কিন্তু আর্থার অ্যাশের আলোয় মঙ্গলবারের রাত বুঝিয়ে দেয়— ফেডেরারের জাদুতে এখনও আচ্ছন্ন নিউ ইয়র্ক।