ক্রিকেট মাঠের পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে এ বার এক সুরে ইমরান খানের পাশে দাঁড়ালেন অস্ট্রেলিয়ার সাত প্রাক্তন অধিনায়ক। জেলে বন্দি পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের আবেদন করলেন তাঁরা। সরাসরি পাকিস্তান সরকারের কাছে নয়, অস্ট্রেলিয়ার বিদেশমন্ত্রী পেনি ওয়ংয়ের কাছেই চিঠি পাঠিয়েছেন অ্যালান বর্ডার, গ্রেগ চ্যাপেল, ইয়ান চ্যাপেল, বেলিন্ডা ক্লার্ক, কিম হিউজ, মার্ক টেলর এবং স্টিভ ওয়।
ইমরানের আইনি বা রাজনৈতিক মামলায় তাঁরা কোনও পক্ষ নিচ্ছেন না—চিঠির শুরুতেই তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সাত প্রাক্তন অধিনায়ক। তাঁদের বক্তব্য, বিষয়টি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু জেলে একজন বন্দির সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা মানবিকতার প্রশ্ন। আর সেই জায়গাতেই তাঁদের উদ্বেগ।
অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল ইমরানের বিষয়টি নিয়ে বিদেশমন্ত্রী পেনি ওয়ংয়ের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলারও আবেদন করেছেন। কেন এতটা উদ্বেগ? চ্যাপেলের উত্তর অত্যন্ত সরাসরি—‘আমরা আশঙ্কা করছি, ও জেলেই মারা যাবে।’
ইমরানের দুই ছেলে এবং বোনেরা গত কয়েক মাস ধরে তাঁর স্বাস্থ্য ও জেলে থাকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা মিলছে না, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত এবং আইনি পরামর্শ নেওয়ার সুযোগও কমে গিয়েছে। সেই দাবিগুলির কথাও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন অস্ট্রেলীয় অধিনায়কেরা।
চিঠিতে সাত অধিনায়ক লিখেছেন, ‘ইমরান খানের বিরুদ্ধে আইনি বা রাজনৈতিক মামলায় আমরা কোনও অবস্থান নিচ্ছি না। সেটা পাকিস্তানের বিষয়। কিন্তু কোনও বন্দির সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করা হচ্ছে, তা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, মৌলিক মানবিকতার প্রশ্ন।’
ইমরানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্রেগ চ্যাপেল ২০২২ সালে ইসলামাবাদে শেষ বার ইমরানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখন ইমরান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। সাত প্রাক্তন অধিনায়কের কথায়, ‘তখন তিনি সুস্থ, শক্তিশালী এবং ফিট ছিলেন। এখন তাঁর বন্দিদশা নিয়ে যে সব খবর আসছে, তার সঙ্গে সেই ছবিটা মেলানো কঠিন।’
চিঠিতে ইমরানের ক্রিকেটীয় অবদানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি পাকিস্তানকে তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন। পরে দেশের প্রধানমন্ত্রীও হন। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়কদের মতে, ‘ক্রিকেটার হিসাবে তাঁর দক্ষতা এবং নেতৃত্ব ক্রিকেটে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে। পাকিস্তানের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি করেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।’
তাই ইমরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নীরব থাকতে চাননি তাঁরা। এর আগেও গত ছ’মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের একাধিক প্রাক্তন অধিনায়ক ইমরানের মানবিক চিকিৎসা এবং বন্দিদশার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের মতে, পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। বরং এ বার ইমরানের পরিবারও একই আশঙ্কার কথা সামনে এনেছে।
চিঠির শেষ দিকে সাত প্রাক্তন অধিনায়ক অস্ট্রেলিয়া সরকারকে অনুরোধ করেছেন, পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি তুলতে। তাঁদের আবেদন, ‘অস্ট্রেলিয়া সরকার যদি এই বিষয়টি সরাসরি পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে, আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।’
গ্রেগ চ্যাপেল ইতিমধ্যেই পেনি ওয়ংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আবেদন করেছেন। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু একটি চিঠিতে থামিয়ে রাখতে চাইছেন না তাঁরা। ক্রিকেটের বাইরের এই মানবিক প্রশ্নে কূটনৈতিক স্তরেও আলোচনা চান অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়কেরা।
ক্রিকেট মাঠে এক সময় যাঁরা ইমরানের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাঁরাই আজ তাঁর বন্দিদশা নিয়ে সরব। ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী সেই অধিনায়কের জন্য তাঁদের বার্তা স্পষ্ট— রাজনীতি যার যার, কিন্তু বন্দির নিরাপত্তা এবং মানবিক চিকিৎসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।