চল্লিশ পেরিয়ে গেলেও বিশ্বকাপে পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখনও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বয়স ৪১ পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর ফিটনেস, শৃঙ্খলা এবং গোল করার খিদে ফুটবল বিশ্বকে এখনও বিস্মিত করে চলেছে। বিশ্বকাপের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজেই বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কেন এই বয়সেও তিনি পর্তুগালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন রোনাল্ডো। কিন্তু তার পরদিনই তাঁকে দেখা যায় পর্তুগালের প্রথম প্র্যাকটিস সেশনে সবার আগে মাঠে নামতে। জাতীয় দলের অনুশীলন শিবিরে তাঁর উপস্থিতিই যেন নতুন করে বার্তা দেয়— তিনি এখনও শেষ হয়ে যাননি, বরং আরও একবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘শারীরিক ভাবে আমি তো ঠিকই আছি। ম্যাচে আমার খেলা দেখেননি?’ তবে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও একাধিক প্রস্তুতি ম্যাচের জন্য তিনি যে এখন কিছুটা ক্লান্ত, তাও স্বীকার করেছেন সিআর৭। বলেন, ‘প্রস্তুতি তো ভালই হয়েছে। তবে বেশ ক্লান্তিদায়ক। কারণ, আমরা প্রচুর পরিশ্রম করেছি। ম্যাচগুলোতে আমাদেরই আধিপত্য ছিল বেশি। তবে ১৭ তারিখে আমরা যখন মাঠে নামব এবং তারপর থেকে যে চাপটা ক্রমশ বাড়বে, তা আমরা কী করে সামাল দেব, সেটাই আসল। এই পরীক্ষাতেই আসল চ্যাম্পিয়নরা ওতরাতে পারে’।
এবারের বিশ্বকাপ রোনাল্ডোর কেরিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ২২৬টি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি তাঁর গোলসংখ্যাও সর্বাধিক— ১৪৩। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, পর্তুগিজ কিংবদন্তির প্রভাব এখনও কতটা গভীর।
রোনাল্ডোর ফিটনেস নিয়েও আলোচনার শেষ নেই। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, তিনি এখনও অত্যন্ত কঠোর অনুশীলন সূচি মেনে চলেন। নিয়মিত জিম, রিকভারি প্রক্রিয়া, আইস বাথ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই শৃঙ্খলাই তাঁকে চল্লিশের কোঠা পেরিয়েও বিশ্বসেরাদের তালিকায় রেখেছে।
তবে চিলি ও নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে খেললেও কোনও গোল পাননি রোনাল্ডো। এটাই চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে পর্তুগাল শিবিরে। শুধু রোনাল্ডোর ওপর ভর করে কি পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিততে পারবে?
এই প্রসঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা বলেন, “আমরা এর উত্তর বিশ্বকাপের শেষে জানতে পারব। আমরা সত্যিই বিশ্বকাপের জন্য মুখিয়ে আছি। আমরা জানি, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বিশ্বকাপও সব সময়ই একটি বিশেষ টুর্নামেন্ট। তাই আমরা অনেক আশা নিয়ে সেখানে এসেছি। এই প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে গড়া খুব ভাল একটা দল রয়েছে আমাদের। তবে কিছু বিষয় আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যেমন ম্যাচের ফলাফল। শেষ পর্যন্ত জয় বা পরাজয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’।
পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী রোনাল্ডো আরও বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আমাদের ফুটবলারদের এই প্রজন্ম পর্তুগালের মানুষকে অনেক আনন্দ এনে দেবে।আসল বিষয় হলো ভালোভাবে টুর্নামেন্টটা শুরু করা এবং গ্রুপের শীর্ষে থেকে পর্ব শেষ করা। তারপর প্রতি ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে হবে। শান্ত থাকতে হবে, আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে এবং নিজেদের ছন্দ খুঁজে নিতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “অনেক বিষয়ের ওপর সবকিছু নির্ভর করবে আমাদের সাফল্য-ব্যর্থতা। তবে আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী যে সবকিছু ভালোই হবে”।
বর্তমান পর্তুগাল দল শুধুমাত্র রোনাল্ডো-নির্ভর নয়। ব্রুনো ফার্নান্ডেজ, ভিতিনহা, বার্নার্ড সিলভা এবং রুবেন ডায়াসদের মতো তারকারা দলকে ভারসাম্য এনে দিয়েছেন। তবুও বিশ্বকাপ মঞ্চে পর্তুগালের স্বপ্ন এখনও অনেকটাই রোনাল্ডোকে ঘিরেই।
উল্লেখ্য, ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল পর্তুগাল। এবারের বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ কে-তে রয়েছে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ কঙ্গো, উজবেকিস্তান এবং কলম্বিয়া।
পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রোনাল্ডোকে শুধুমাত্র অতীতের কৃতিত্বের জন্য দলে রাখা হয়নি। তাঁর মতে, ‘সম্প্রতি ৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ২৫টি গোল করেছে রোনাল্ডো, যা প্রমাণ করে সে এখনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার ক্ষমতা রাখে। উন্নতির জন্য প্রতিদিন লড়াই করার মানসিকতা এবং খিদেই ওকে রোনাল্ডোকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে’।
সম্ভবত এটাই রোনাল্ডোর শেষ বিশ্বকাপ। তাই ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন আরেকবার ইতিহাস রচনার। বিশ্বকাপ ট্রফিটাই একমাত্র বড় আন্তর্জাতিক সম্মান, যা এখনও রোনাল্ডোর ট্রফি ক্যাবিনেটে নেই। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের শেষ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।