রবিবার নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালে এক দিকে টানা দ্বিতীয় এবং মোট চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে নামছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, অন্য দিকে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে স্পেন। জয়ী দল তো ট্রফি জিতবেই, সঙ্গে নিয়ে যাবে রেকর্ড অঙ্কের আর্থিক পুরস্কারও।
ফিফা আগেই জানিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের মোট পুরস্কারমূল্য ৬৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের সংস্করণের তুলনায় অনেকটাই বেশি। ৪৮ দলের এই সম্প্রসারিত বিশ্বকাপে প্রতিটি পর্যায়ের জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক পুরস্কার ধার্য করা হয়েছে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার। যা টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় প্রায় ৪৮১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি।
ফাইনালে পরাজিত, অর্থাৎ, রানার্স দল পাবে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ (৩৩ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বা ৩১৭ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকারও বেশি।
তৃতীয় স্থানাধিকারী দল ইতিমধ্যেই পেয়ে গিয়েছে ২ কোটি ৯০ লক্ষ (২৯ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বা ২৭৯ কোটি টাকারও বেশি আর চতুর্থ স্থানে শেষ করা দল পেয়েছে ২ কোটি ৭০ লক্ষ (২৭ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৬০ কোটি টাকা।
শুধু সেমিফাইনালিস্টরাই নয়, কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নেওয়া চারটি দল প্রত্যেকে পেয়েছে ১ কোটি ৯০ লক্ষ (১৯ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বা ১৮৩ কোটি টাকা করে।
শেষ ষোলোয় বিদায় নেওয়া আটটি দলের প্রাপ্য ১ কোটি ৫০ লক্ষ (১৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৪৪ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা করে।
আর ৩২ দলের রাউন্ড থেকে ছিটকে যাওয়া ১৬টি দল পেয়েছে ১ কোটি ১০ লক্ষ (১১ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বা ১০৫ কোটি ৯১ লক্ষ টাকারও বেশি করে।
ফিফার মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দেশের মধ্যে এই রেকর্ড অঙ্কের পুরস্কার বণ্টনের উদ্দেশ্য হল বিশ্ব ফুটবলে আর্থিক সহায়তা বাড়ানো এবং বড় মঞ্চে সাফল্যের মূল্য আরও বৃদ্ধি করা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দল ৪২ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিল। সেই তুলনায় এবারের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দলের প্রাপ্তি ৮ মিলিয়ন ডলার বেশি। মোট পুরস্কারমূল্যের দিক থেকে দেখতে গেলে কাতারের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি মূল্যের আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে এ বার।
সোনার দামে আকাশছোঁয়া বিশ্বকাপ ট্রফি!
যে ট্রফিটি জয়ের জন্য ফাইনালে লড়াই করবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন, তার আর্থিক মূল্যও এখন রেকর্ড উচ্চতায়। বিশ্ববাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির জেরে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির সোনার মূল্য পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষ ১৩ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬.১ কোটি টাকায়। ২০২২ বিশ্বকাপের তুলনায় যা প্রায় ১৫৭ শতাংশ বেশি।
আর্থিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা এলএসইজি (LSEG)-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় ট্রফিটির সোনার মূল্য ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৭৭ হাজার ডলার। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সোনার আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় সেই মূল্য এখন ৭ লক্ষ ১৩ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটি ১৯৭৪ সালে দেওয়া হয়। ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজানিগার নকশায় তৈরি এই ট্রফির উচ্চতা প্রায় ৩৬.৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬.১৭৫ কিলোগ্রাম। এটি ১৮ ক্যারেট সোনায় নির্মিত এবং এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪.৯৩ কিলোগ্রাম সোনা। নিচের অংশে ব্যবহার করা হয়েছে সবুজ রঙের মূল্যবান পাথর ম্যালাকাইট।
১৯৭৪ সালে এই ট্রফি তৈরির সময় এর উপাদানগত মূল্য ছিল মাত্র ২৫ হাজার মার্কিন ডলার। বর্তমান সোনার দরে সেই মূল্য প্রায় ৩০ গুণ বেড়ে গিয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ী দল অবশ্য আসল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। ট্রফিটি ফিফার জুরিখের বিশ্ব ফুটবল জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকে। চ্যাম্পিয়ন দলকে পরবর্তীকালে সোনার প্রলেপ দেওয়া একটি প্রতিরূপ বা রেপ্লিকা প্রদান করা হয়।
বিশ্বকাপজয়ীদের কত দামের সোনার পদক?
বিশ্বকাপ জয়ের পর ফুটবলারদের হাতে তো ওঠেই সোনালি ট্রফি, গলায় ঝোলে সোনার পদকও। কিন্তু সেই পদকের প্রকৃত আর্থিক মূল্য কত? বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। বাস্তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পদক দেখতে পুরোপুরি সোনার হলেও, সেটি সম্পূর্ণ খাঁটি সোনার তৈরি নয়। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বকাপজয়ী দলের প্রতিটি খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে একটি করে বিজয়ী পদক দেওয়া হয়। পদকটি মূলত রুপোর উপর সোনার প্রলেপ দিয়ে তৈরি। আন্তর্জাতিক বাজারে ধাতুর বর্তমান দামের ভিত্তিতে এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ থেকে ১.৩ লক্ষ টাকা)।
শুধু ট্রফি, পদক নয়, বিশ্বজয়ীদের বিশেষ ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’!
আর্থিক পুরস্কার, ট্রফি, সোনার পদকের পাশাপাশি এবার প্রথম বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বিশেষ ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’। ফিফা জানিয়েছে, বিজয়ী দলের জন্য মোট ৩০টি কাস্টমাইজড রিং তৈরি করা হয়েছে। ম্যাচের পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে অধিনায়ক এবং প্রধান কোচকে প্রতীকী রিং তুলে দেওয়া হবে। পরে প্রতিটি খেলোয়াড় ও স্টাফের জন্য আলাদা করে ব্যক্তিগত পরিচয় অনুযায়ী রিং তৈরি করে দেওয়া হবে।
এই বিশেষ রিংগুলির এক পাশে থাকবে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা, অন্য পাশে থাকবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের পরিচয়, লোগো এবং সেই ঐতিহাসিক জয়ের স্মারক খোদাই।
শুধু খেলোয়াড়দের জন্যই নয়, সমর্থকদের জন্যও সীমিত সংস্করণে মোট ২,০২৬টি চ্যাম্পিয়নশিপ রিং তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি বিজয়ী দলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, আর ১,৯৯৬টি রিং সংগ্রাহক ও সমর্থকদের জন্য বিক্রি করা হবে স্মারক হিসেবে।
সুতরাং, ২০২৬ বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল শুধু ট্রফি, পদকই পাবে না, ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার প্রাইজমানি ও বিশেষ চ্যাম্পিয়নশিপ রিং-ও পাবে। ফলে এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পুরস্কারের ঝুলি আগের যে কোনও আসরের তুলনায় আরও সমৃদ্ধ হতে চলেছে।