বিশ্বকাপের মঞ্চে একটি ভুল সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য। রেফরিদের এমন ভুল হচ্ছে বলেও প্রচুর অভিযোগ আসছে চলতি বিশ্বকাপে। যদিও শুধু মাঠের রেফারিদের বিরুদ্ধে নয়, ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠছে আধুনিক ভিএআর প্রযুক্তি নিয়েও। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীরা জেনে অবাক হতে পারেন, বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলানো এই রেফারিদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রযুক্তি-সহ চার বছর ধরে তৈরি করে ফিফা।
ফুটবলারদের মতোই ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিদের প্রস্তুতিতেও কোনও খামতি রাখতে চায় না ফিফা। শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি— সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের রেফারিদের তৈরি করা হয় একেবারে সেরা অ্যাথলিটের আদলে।
ফিফার বক্তব্য, “২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য রেফারিদের প্রস্তুতি প্রায় চার বছর আগেই শুরু হয়েছিল।” বিশ্বকাপে শুধু নিয়ম জানলেই চলে না। একজন রেফারিকে প্রতি ম্যাচে গড়ে ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়তে হয়, যা অনেক ফুটবলারের দৌড়ের সমান। কখনও মায়ামির তীব্র আর্দ্রতা, কখনও আবার মেক্সিকো সিটির ২,২০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায়, যেখানে অক্সিজেন কম, সেই পরিবেশে— প্রতিটি ম্যাচেই পরিবেশ আলাদা। তার সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘ বিমানযাত্রা, সময়ের পার্থক্য এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন। ফলে রেফারিদের শারীরিক সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ফিফা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া ২০২৫-এর ক্লাব বিশ্বকাপ তাদের প্রস্তুতিতে বিশেষ সাহায্য করে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার বক্তব্য, ওই প্রতিযোগিতাই রেফারিদের “তাপ, আর্দ্রতা এবং ভিন্ন ভিন্ন টাইম জ়োনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে” গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করে।
এই প্রস্তুতিতে শুধু ফিটনেস নয়, গুরুত্ব দেওয়া হয় সহনশক্তি, গতি, তৎপরতা, তীব্র গতিতে দৌড় এবং ম্যাচ চলাকালীন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার উপর। ম্যাচের আদলে অনুশীলন করানো হয়। জিপিএস ট্র্যাকার, হার্ট-রেট মনিটর, ল্যাকটেট পরীক্ষা-সহ নানা প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি স্প্রিন্ট, হৃদস্পন্দন ও রিকভারির অগ্রগতি বিশ্লেষণ করেন বিশেষজ্ঞরা।
ফিফার লক্ষ্য একটাই— বিতর্কিত মুহূর্ত তৈরি হওয়ার আগেই যাতে রেফারি সঠিক জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারেন। ক্লান্তি যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব না ফেলে, সেই দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অতিরিক্ত ক্লান্তি রেফারির অবস্থান, দৃষ্টিকোণ এবং প্রতিক্রিয়ার গতি কমিয়ে দেয়, যা ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশ্বকাপ চলাকালীন রেফারিদের জন্য থাকে চিকিৎসক, ফিজ়িওথেরাপিস্ট, পারফরম্যান্স বিশেষজ্ঞ এবং নিউট্রিশানিস্টদের আলাদা দল। ম্যাচের পরে বরফ-চিকিৎসা (ক্রায়োথেরাপি), ম্যাসাজ এবং বিশেষ রিকভারি কর্মসূচিও অনুসরণ করতে হয়। তবু এত কিছুর পরেও শারীরিক ধকল এড়ানো যায় না। চলতি বিশ্বকাপেই জার্মান রেফারি ফেলিক্স জ়ওয়ায়ের ম্যাচের শেষ দিকে পায়ে ক্র্যাম্প ধরে গিয়েছিল।
বিশ্বকাপে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন ফুটবলাররা। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটতে হয় রেফারিদেরও। নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে তাই ফিফা এই দীর্ঘমেয়াদি, বৈজ্ঞানিক এবং কঠোর প্রস্তুতির ব্যবস্থা করে রেফারিদের জন্য। তা সত্ত্বেও রেফারিং নিয়ে অভিযোগ বন্ধ হচ্ছে না কিছুতেই।