বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। সেই ব্রাজিল যদি টানা পাঁচবার বিশ্বকাপের ফাইনালেও উঠতে না পারে, তা হলে যে সেই দেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তা ‘অপরাধ’ বলেই গণ্য হবে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহই নেই। এ বার সেই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে মরিয়া ব্রাজিল শিবির। এবং সেই উদ্দেশ্যেই ভারতীয় সময়ে রবিবার ভোর সাড়ে তিনটেয় টেক্সাসে মরক্কোর বিরুদ্ধে নামছে কার্লো আনসেলোত্তির দল। সেজন্য আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যও নিচ্ছে তারা।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশটি প্রতিবারই ট্রফি জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে টুর্নামেন্টে নামে। তবে সফল হতে পারে না। গত পাঁচবার তা-ই হয়েছে। তবে চলতি বিশ্বকাপে তাদের প্রস্তুতিতে এবার যুক্ত হয়েছে এক নতুন অস্ত্র—‘স্মার্ট ভেস্ট’। খেলোয়াড়দের শরীর, নড়াচড়া, ক্লান্তি, দৌড়ের গতি থেকে শুরু করে মাঠে তাদের অবস্থান সম্পর্কিত অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করছে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। আর সেই তথ্য বিশ্লেষণ করেই বিশ্বকাপ জয়ের পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন ব্রাজিলের কোচিং স্টাফ ও স্পোর্টস সায়েন্স বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ ধরনের এই ভেস্টগুলির ভিতরে রয়েছে জিপিএস ট্র্যাকার, মোশন সেন্সর এবং বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি। অনুশীলনের সময় খেলোয়াড়রা এগুলি পরেন এবং প্রতিটি নড়াচড়া ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন ফুটবলার ঠিক কতটা দৌড়েছেন, কত দ্রুত গতিবৃদ্ধি করেছেন, শরীরের উপর কতটা চাপ পড়েছে এবং ক্লান্তির মাত্রা কোথায় পৌঁছেছে। এই তথ্যের সাহায্যে প্রশিক্ষণের মাত্রা নির্ধারণ করা, চোটের ঝুঁকি কমানো এবং ম্যাচের কৌশল তৈরি করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
ব্রাজিলের ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু এবার বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ ও কঠিন টুর্নামেন্টে প্রতিটি খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ ফিট রাখার লক্ষ্যেই এই ডেটা-নির্ভর পদ্ধতির উপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফুটবলে সাফল্য শুধু প্রতিভা বা দক্ষতার উপর নির্ভর করে না; শারীরিক সক্ষমতা ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খেলোয়াড়দের ফিটনেস এবং ধারাবাহিকতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চোট সমস্যা দলকে ভুগিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার প্রতিটি খেলোয়াড়ের শারীরিক অবস্থা গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্মার্ট ভেস্ট থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত অনুশীলন পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মাঠে অবস্থানগত বিশ্লেষণ। কোনও ফুটবলার ম্যাচ বা অনুশীলনের সময় কোথায় বেশি সময় কাটাচ্ছেন, কোন জায়গায় তাঁর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, কিংবা কোন পরিস্থিতিতে দলের কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে—এসব বিষয়ও ডেটার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে কোচেরা কেবল অনুমানের উপর নির্ভর না করে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কার্লো আনসেলোত্তির অধীনে নতুন যুগ শুরু করা ব্রাজিল এবার দীর্ঘ ২৪ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে। ফুটবলবিশ্ব এখনও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের প্রতিভার উপর আস্থা রাখে, কিন্তু ব্রাজিল জানে যে শুধু তারকাখচিত দল থাকলেই ট্রফি জেতা যায় না। সেই কারণেই প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ক্রীড়াবিজ্ঞানের সমন্বয়ে নিজেদের প্রস্তুতিকে আরও নিখুঁত করার চেষ্টা করছে সেলিসাওরা। ফুটবলকে বরাবরই শিল্পের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে সেই শিল্পের পাশে জায়গা করে নিয়েছে বিজ্ঞানও। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্মার্ট ভেস্ট প্রকল্প হয়তো সেই নতুন বাস্তবতারই প্রতীক—যেখানে বিশ্বকাপ জয়ের লড়াই শুধু মাঠে নয়, ডেটা ও প্রযুক্তির জগতেও সমানভাবে লড়া হচ্ছে।