নির্ধারিত ৯০ মিনিটর খেলা শেষ হতে তখনও চার মিনিট বাকি। রেফারি গোলের বাঁশি বাজাতেই আটলান্টা স্টেডিয়ামে যেন প্রায় শব্দের বিস্ফোরণ হল। মহানায়ক হ্যারি কেনে এই গোলের আগে পর্যন্ত গ্যালারিতে ইংল্যান্ড সমর্থকেরা বুকে হাত দিয়ে বসেছিলেন, আবার একটা অঘটন ঘটে যাবে না তো, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসের মতো?
খেলা শেষ হতেই ইংল্যান্ডের প্রতিক্রিয়ায় ছিল নিখাদ স্বস্তির বিস্ফোরণ। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত হতাশাজনক পারফরম্যান্স করা দলটির চেহারা শেষ পর্যন্ত বদলে যায় তাদের অসাধারণ অধিনায়ক হ্যারি কেনের নাটকীয় গোলের জন্য। সে জন্যই সেলিব্রেশনে এমন পাগলামো।
আর স্বস্তিটা সবচেয়ে বেশি ছিল কোচ টমাস টুখেলের। ইংল্যান্ড যদি হেরে যেত, তাহলে তাঁর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হত কি না, সে তো বড় প্রশ্ন ছিলই। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন তিনি নিজে ওই দায়িত্বে থাকতে চাইতেন কি না। স্বস্তি পেয়েছেন ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)-এর কর্তারাও। জার্মান কোচের ওপর তাঁরা যে ভরসা করে জাতীয় দলকে এই বিশ্বকাপ জেতানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সবার স্বস্তির নেপথ্যে ছিলেন একজনই, তিনি হ্যারি কেন।
কেন যেন চুম্বকের মতো প্রশংসা আর সম্মান নিজের দিকে টেনে নেন, তা বুধবার ফের প্রমাণ করে দিলেন হ্যারি কেন। এ দিন আটলান্টার ছাদ ঢাকা স্টেডিয়ামে কঙ্গোর কাছে ম্যাচের ৭৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে ছিল। ঠিক তখনই সে দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হ্যারি কেন দলকে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দেন।
কেন হাল না ধরলে ইংল্যান্ডের ফুটবলে ফিরে আসত সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলি—ইউরো ২০১৬-র শেষ ষোলয় আইসল্যান্ডের কাছে হেরে ছিটকে যাওয়া অথবা ১৯৫০ বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লজ্জার হার। কিন্তু, বরাবরের মতোই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন কেন।
তাঁর ফুটবল জীবনে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে। তবে বুধবার বিশ্বকাপের শেষ-৩২-এর ম্যাচে ইংল্যান্ডের রুদ্ধশ্বাস ২-১ জয়ে তিনি যা করলেন, তার সঙ্গে কোনও মুহূর্তেরই তুলনা হয় না বোধহয়।
ম্যাচের আর মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। স্টেডিয়ামের বিশাল ঘড়ির কাঁটা যেন অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। ঠিক সেই সময় কেন শক্তিশালী হেডে গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি-কে পরাস্ত করেন। এই এমপাসি-ই এতক্ষণ অসাধারণ সব সেভ করে কঙ্গোর শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ইংল্যান্ডের সামনে দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করেছিলেন। সেই এমপাসিকেই পরাস্ত করে গোলের মুখ খুলে ফেলেন ‘হ্যারি দ্য গ্রেট’।
ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ছিল কোচ টুখেলের খেলোয়াড় পরিবর্তন। বদলি হিসেবে নেমে অ্যান্থনি গর্ডন আক্রমণে নতুন গতি আনেন। তাঁর নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করে বিশ্বকাপের মূল পর্বে নিজের ১২তম গোলটি করেন কেন।ম্যাচ শেষ হতে যখন আর মাত্র চার মিনিট বাকি, তখন কেন দেখিয়ে দিলেন, সত্যিকারের মহান ফুটবলাররা ঠিক কী করতে পারেন।
তাঁর ১৩ নম্বর গোলই ইংল্যান্ডের জন্য বয়ে আনে সৌভাগ্য। নিজের মার্কারকে ফাঁকি দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন এক দুর্দান্ত শট নেন, যা কাছের পোস্ট ঘেঁষে জালে জড়িয়ে পড়ে। সেই শট ঠেকানোর কোনো সুযোগই ছিল না প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের।কেন সৃষ্টি করেন অনবদ্য এক মুহূর্ত। সেই গোলেই ইংল্যান্ড নিশ্চিত করে এস্তাদিও আজতেকার টিকিট, যেখানে ৫ জুলাই শেষ ষোলোয় তাদের প্রতিপক্ষ হবে সহ-আয়োজক মেক্সিকো।
বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো দলের বিরুদ্ধে শেষ ন’টি ম্যাচের একটিতেও হারেনি ইংল্যান্ড। এর আগে কখনও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলেনি কঙ্গো। কিন্তু ম্যাচের শুরুটা তারা করে স্বপ্নের মতো। সপ্তম মিনিটেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের প্রথম গোলটি করেন সিপেঙ্গা।
গোল হজম করার পর ম্যাচে ছন্দ ফিরে পেতে ইংল্যান্ডের বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। একের পর এক গোলের সুযোগ তৈরি করে তারা। কঙ্গোর গোলরক্ষক এমপাসি দুর্দান্ত দক্ষতায় জুড বেলিংহামের দুটি গোলমুখী হেড আটকে দেন।এই দুই সুযোগের মাঝেই ননি মাদুয়েকে বক্সের ভেতরে সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান, যা গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করে দেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা।
প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে কর্নার থেকে আসা বলে কাছ থেকে কেনের ভলিও অসাধারণভাবে ঠেকিয়ে দেন এমপাসি। কঙ্গোও দ্বিতীয় গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ওয়ান-বিসাকার নিচু ক্রস থেকে ইওন উইসা ঘুরে গিয়ে শট নিলেও তা পোস্টে লেগে করে ফিরে আসে। ইংল্যান্ডকে যে তারা হিমশিম খাইয়ে দিয়েছিলেন, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ব্যবধান ধরে রাখতে পারল না তারা। কারণ, তাদের দুর্ভাগ্য যে, প্রতিপক্ষে এমন একজন ছিলেন, যাঁর নাম হ্যারি কেন।