প্রায় ৪৪ বছর পর আবার কলকাতার মাটিতে উরুগুয়ে। মাঝে পেরিয়ে গিয়েছে কত দশক, কত প্রজন্ম!
বদলে গিয়েছে ভারতীয় ফুটবলের ছবি। কিন্তু ১৯৮২-র সেই স্মৃতি এখনও টাটকা। উরুগুয়ের মতো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া ভারতীয় দলের সেই সদস্যরা এ বার দাঁড়াতে চান নতুন প্রজন্মের পাশে। তাঁদের চোখে আগামীকালের ম্যাচ শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ নয়, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধনও।
সালটা ছিল ১৯৮২। কলকাতায় প্রথম নেহরু কাপে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও উরুগুয়ে। উরুগুয়ে দলে ছিলেন এনজো ফ্রান্সেস্কোলি, ভেনানসিও রামোস, জর্জ দা সিলভার মতো তারকারা। ইডেন গার্ডেন্সে কানায় কানায় ভরা গ্যালারির সামনে শুরুতেই ঝড় তুলেছিল উরুগুয়ে। ৮ ও ২৩ মিনিটে পর পর দু’টি গোল করে ভারতীয় সমর্থকদের স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন জর্জ দা সিলভা।
তবু হাল ছাড়েনি ভারত। ৩৫ মিনিটে মানস ভট্টাচার্যের সেই গোল—আজও ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। তাঁর দুরন্ত শটে যেন ফের জেগে উঠেছিল ইডেন। শেষ পর্যন্ত ৭০ মিনিটে মারিও সারালেগুই উরুগুয়ের তৃতীয় গোলটি করেন। সেই ম্যাচে ভারত ১-৩-এ হারলেও সেই লড়াই ভারতীয় ফুটবলের এক গর্বের অধ্যায় হয়ে থেকে গিয়েছে।
শুধু উরুগুয়ের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, সেই নেহরু কাপে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-২ আটকে দিয়েছিল ভারত। যুগোস্লাভিয়া ‘বি’-র বিরুদ্ধে পেয়েছিল ঐতিহাসিক ২-১ জয়। মানস ভট্টাচার্য এবং মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের গোলে এসেছিল সেই জয়। আর সারা প্রতিযোগিতায় অপরাজিত থেকে ফাইনালে চিনকে ২-০ হারিয়ে প্রথম নেহরু কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে।
সেই ম্যাচের স্মৃতি এখনও স্পষ্ট মানসের। বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে গোল করতে পেরেছিলাম, ওদের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াইও করেছিলাম— এটা আমাদের কাছে বিরাট গর্বের ব্যাপার ছিল। এখনকার ভারতীয় দলকেও ব্রাজিল আর পানামার বিরুদ্ধে দারুণ লড়াই করতে দেখেছি। খালিদ জামিলের কৌশল এবং ৯০ মিনিট ধরে লড়াই করার মানসিকতা দেখিয়ে দিচ্ছে, ভারতীয় ফুটবলের মানসিকতায় ভাল পরিবর্তন এসেছে’।
১৯৮২-র সেই ভারতীয় দলের আরও দুই সদস্য উইঙ্গার বিদেশ বসু এবং ডিফেন্ডার অলোক মুখোপাধ্যায়ও বর্তমান দলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁদের মতে, বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের বিরুদ্ধে বড় মঞ্চে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতাই ভারতীয় ফুটবলারদের আরও পরিণত করে তুলবে।
অলোকের কথায়, ‘এখনকার দলও বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভয় না পেয়ে, আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। এটা আমাদের পুরনো ঐতিহ্যকেই ধরে রাখছে। এই ধরনের বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেললে ছেলেদের আত্মবিশ্বাস আর মানসিক শক্তি দুটোই বাড়বে। তার প্রভাব আইএসএলেও পড়বে। ওরা আরও ভাল ভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারবে’।
ব্রাজিলের বিরুদ্ধে চার গোলে হারলেও সেই ম্যাচে ভারতের লড়াইয়ের মানসিকতা মুগ্ধ করেছে। তার আগে পানামার বিরুদ্ধে ১-১ ড্র। এ বার সামনে দু’বারের বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ে। এক দিকে ১৯৮২-র মানসদের স্মৃতি, অন্য দিকে খালিদ জামিলের নতুন ভারত।
তাই মঙ্গলবার যুবভারতীর ম্যাচ শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ নয়— এক প্রজন্মের স্মৃতি থেকে আর এক প্রজন্মের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরীক্ষা ভারতের। ১৯৮২-তে মানসের সেই গোল যে লড়াইয়ের ইতিহাস লিখেছিল, ২০২৬-এর ভারত কি সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে পারবে? কলকাতার রাতই দেবে তার উত্তর।