কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের রুপোজয়ী ভারোত্তোলক ঋষিকান্ত সিং চানামবামের সাফল্যের পেছনে যে সংগ্রাম, দারিদ্র্য আর হার না-মানা এক জীবনের গল্প লুকিয়ে রয়েছে, তা প্রায় অবিশ্বাস্য।
কমনওয়েলথ গেমসে পুরুষদের ৬০ কেজি বিভাগে মোট ২৬৪ কেজি (স্ন্যাচে ১২১ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১৪৩ কেজি) ওজন তুলে রুপো জেতেন মণিপুরের ভারোত্তোলক ঋষিকান্ত সিং চানামবাম।স্ন্যাচে নতুন কমনওয়েলথ গেমস রেকর্ডও গড়েন তিনি। তবে শেষ চেষ্টায় ১৫১ কেজি তুলতে না পারায় অল্পের জন্য সোনা হাতছাড়া হয় তাঁর।
কিশোর বয়সেই জাতীয় যুব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন ঋষিকান্ত। ২০১৭ সালে জুনিয়র কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জও জেতেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে একসময় বাধ্য হয়ে ভারোত্তোলন ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করতে শুরু করেন।
রুপো জেতার পর সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে ঋষিকান্ত বলেন, ‘ভারোত্তোলন জগতের বন্ধুদের সঙ্গেও প্রায় সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, বড় ওয়েটলিফটার হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছে। যে কাজ পেয়েছি, সেটাই করেছি। তখন শুধু ভাবতাম, পরের দিন কোথায় কাজ পাব’।
দিনে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা রোজগার করতেন তিনি। সেই টাকায় পুষ্টিকর খাবার কেনা তো দূরের কথা, দু’বেলা খাওয়াও নিশ্চিত ছিল না।ঋষিকান্ত বলেন, ‘হয়তো দিনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা রোজগার করতাম। ওই টাকায় দুধ, ডিম খেয়ে ভালো ডায়েট বজায় রাখা সম্ভব ছিল না। অনেক দিন এমনও গেছে, সকালের বা রাতের খাবার বাদ দিতে হয়েছে। বাড়িতে যা থাকত, সেটাই খেতাম’।
ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় যখন ইম্ফলের তাকিয়েলের ওয়েটলিফটিং সেন্টার অব এক্সেলেন্সে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। সংসারের চিন্তা কিছুটা কমে যায়, আর পুরো মনোযোগ দিতে পারেন অনুশীলনে। মাত্র এক বছরের মধ্যেই জিতে নেন প্রথম সিনিয়র জাতীয় খেতাব। এরপর ২০২৫-এ আহমেদাবাদে কমনওয়েলথ ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে নিজেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মেলে ধরেন।
গ্লাসগোয় রুপো জয়ের পর নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব তিনি দিয়েছেন কোচ বিজয় শর্মাকে। ঋষিকান্ত বলেন, ‘সবার আগে আমি আমার গুরু বিজয় শর্মাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। তাঁর কাছেই আমি প্রশিক্ষণ নিই। প্রতিযোগিতার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, কীভাবে ট্রেনিং করতে হয়, সবই উনি শিখিয়েছেন। আমার প্রস্তুতি নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। আমি পুরোপুরি মনোযোগী ছিলাম’।
এরপরই তিনি এই সাফল্য উৎসর্গ করেন দেশের প্রধানমন্ত্রীকে। বলেন, ‘আমি এই পদক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজিকে উৎসর্গ করছি। খেলাধুলার উন্নয়নের জন্য তিনি অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। সেই কারণেই আজ আমরা আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছি’।
সোনা হাতছাড়া হলেও ঋষিকান্তর এই রুপোর পদক শুধুমাত্র ভারতের পদক তালিকায় আরেকটি সংযোজন নয়। দিনে ২০০ টাকার দিনমজুর থেকে কমনওয়েলথ গেমসের পদকজয়ী হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সবচেয়ে কঠিন লড়াইও একদিন সাফল্যের গল্প হয়ে উঠতে পারে।