সামনেই তিনটি কঠিন আন্তর্জাতিক ম্যাচ, প্রতিপক্ষে পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। সে জন্য জাতীয় দলের শিবির শুরুও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রথম দিনেই পুরো দলকে পাওয়া গেল না। বিশেষ করে মোহনবাগানের একাধিক ফুটবলার শিবিরে যোগ না দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় দলের প্রাক্তন কোচ মানোলো মার্কেজ অবশ্য বিষয়টির মধ্যে নেতিবাচক কিছু দেখছেন না।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আন্তর্জাতিক সূচির প্রস্তুতি হিসেবে জাতীয় দলের শিবির শুরু হয়েছে বেঙ্গালুরুতে। কিন্তু প্রথম দিনেই দেখা যায়, প্রত্যাশিত সংখ্যক ফুটবলার উপস্থিত নেই। শিবিরের প্রথম দিনে মাত্র ১৬ জন ফুটবলার অনুশীলনে যোগ দেন। ফলে কোচ খালিদ জামিলকে শুরুতেই পরিকল্পনায় বদল আনতে হয়েছে।
মোহনবাগানের ফুটবলারদের অনুপস্থিতি নিয়ে আলোচনাও কম হয়নি। আপুইয়া, অভিষেক সিংকে ছাড়লেও মনবীর সিং ও সহাল আব্দুল সামাদকে ছাড়েনি কলকাতার ক্লাব। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর ম্যাচ থাকায় ইস্টবেঙ্গলও তাদের ফুটবলারদের ছাড়েনি। কলকাতা লিগে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ বাকি আছে, যে ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করছে তাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। এই যুক্তি দেখিয়ে সহাল-দের ছাড়তে রাজি নয় মোহনবাগান।
ক্লাবের ম্যাচ এবং অনুশীলনের সূচির সঙ্গে জাতীয় শিবিরের সময়সূচির এই সংঘাতই এর অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে তারা। অতীতে জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকা মানোলো মার্কেজকেও এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল একসময়ে।
তবে জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর এখন তিনি বলছেন, জাতীয় দলের হয়ে খেলা যেমন ফুটবলারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ক্লাবগুলির নিজস্ব প্রতিযোগিতাও রয়েছে। তাই কোনও একটি পক্ষকে পুরোপুরি দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না।
সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘ক্লাবগুলির সঙ্গে এআইএফএফ-এর বৈঠক হয়েছিল ১৪ সেপ্টেম্বর ফুটবলারদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে (ফিফা উইন্ডো শুরু হচ্ছে ২১ সেপ্টেম্বর)। ইস্টবেঙ্গলের এএফসি ম্যাচ রয়েছে, তাই তাদের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু তা হলে বাকি সব ফুটবলার এখনও জাতীয় দলের শিবিরে যোগ দেয়নি কেন? মাত্র ১৬জন শিবিরে যোগ দিয়েছে। ভারতীয় ফুটবলের সমস্যা দূর করার আগ্রহ কি কারও নেই?’ প্রসঙ্গত, বেঙ্গালুরুর রায়ান ও আশিকও জাতীয় শিবিরে যোগ দেননি। মোহনবাগানের মেহতাব সিং সম্ভবত আজ যোগ দিচ্ছেন।
জাতীয় দলের শিবিরে ফুটবলারদের অনুপস্থিতি যে প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রথম দিনেই কম ফুটবলার নিয়ে অনুশীলন করতে হওয়ায় কোচিং স্টাফকে পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে। এমনকি রক্ষণভাগে অতিরিক্ত ফুটবলার নেওয়ার প্রয়োজনও তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় ফুটবলে ক্লাব বনাম জাতীয় দলের টানাপোড়েন নতুন নয়। আন্তর্জাতিক উইন্ডোর বাইরে জাতীয় দলের শিবির হলে ক্লাবগুলির কাছ থেকে ফুটবলার ছাড়ার বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। মানোলোর সময়েই জাতীয় দলের প্রস্তুতিতে পর্যাপ্ত অনুশীলনের গুরুত্ব বার বার সামনে এসেছিল। ২০২৪-এ তিনি বলেছিলেন, জাতীয় দলগুলির হাতে অনুশীলনের সময় খুব বেশি থাকে না। তাই যতটা সম্ভব বেশি সময় একসঙ্গে অনুশীলন করে দলের খেলার ধরন তৈরি করা প্রয়োজন।
এ বারও সেই প্রশ্নই সামনে—পুরো দলকে একসঙ্গে না পেলে জাতীয় দলের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর হবে? তার ওপর সামনে তিনটি ম্যাচও যথেষ্ট কঠিন। তিন ম্যাচের তিন দলই সদ্য বিশ্বকাপে খেলে আসা দল। তাই এই ম্যাচের প্রস্তুতি ঠিকমতো না হলে যে লজ্জার শেষ থাকবে না, এটা যেমন ফেডারেশন কর্তাদের বোঝা উচিত ছিল, তেমনই ক্লাব কর্তাদেরও বোঝা উচিত।
ক্লাবের স্বার্থ এবং জাতীয় দলের প্রয়োজন—এই দুই দিকের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করাই ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সবচেয়ে বড় কাজ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এ দিক থেকেও তারা চরম ব্যর্থ।
জাতীয় দলের শিবিরে বাকি ফুটবলাররা যোগ দেওয়ার পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা রয়েছে ঠিকই। তবে প্রথম দিনেই যে সমস্যা সামনে এল, তাতে ভারতীয় ফুটবলে ক্লাব বনাম জাতীয় দলের সূচি-সমন্বয়ের পুরনো প্রশ্নটিই ফের আলোচনায় উঠে এসেছে। এ ভাবে ব্রাজিল, উরুগুয়ের মতো দলের বিরুদ্ধে খেলার প্রস্তুতি আদৌও ঠিকমতো হবে কি না, সে প্রশ্ন তো অবশ্যই উঠছে।