এ বার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ। পরের বার কি ৬৪ দলের বিশ্বকাপ হবে? আগামী বার অর্থাৎ ২০৩০-এ বিশ্বকাপের বয়স হবে ১০০ বছর। সেই বিশ্বকাপের শতবর্ষকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ফিফা ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপের আসর বসাতে চাইছে, এমনই শোনা গিয়েছে।
এ বার ৪৮ দল নিয়ে বিশ্বকাপ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরুতে নানা সমালোচনা হলেও টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, ততই নতুন ফরম্যাটের প্রশংসা কুড়িয়েছে ফিফা। এবার আরও বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা। ২০৩০ বিশ্বকাপ ৬৪ দলের করার প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হবে বলে জানালেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা আরও ১৬টি বাড়বে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়া দেশগুলির জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই তালিকায় কি থাকবে ভারত? এটাই এ দেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিশ্বকাপ এলেই এ দেশের ফুটবলপ্রেমীরা অন্য দেশের সাফল্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মাতেন, অন্য দেশের ব্যর্থতায় হাহুতাশ করেন। কেউ গলা ফাটান আর্জেন্টিনার জন্য, কেউ ব্রাজিল, কেউ ইংল্যান্ড, কেউ ফ্রান্স, আবার কেউ কেউ পিছিয়ে পড়া দেশগুলির পাশে দাঁড়ান মানবিকতার খাতিরে। এশিয়ার দেশের ফুটবলারদেরও সমর্থন করে কেউ কেউ। কিন্তু বিশ্বকাপের শততম বর্ষে কি ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের দেশের ফুটবলারদের জন্য গলা ফাটাতে পারবে? ৬৪ দেশের বিশ্বকাপের খবর শুনে অনেকে এই প্রশ্নই তুলছেন।
বর্তমানে ভারতীয় ফুটবল দল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে। এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূলপর্বে ভারতের খেলা হয়নি। তবে দলের সংখ্যা ৬৪ হলে এশিয়ার জন্য বরাদ্দ আসনও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ভারতের বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন বাস্তবের কাছাকাছি পৌঁছলেও পৌঁছতে পারে। যদিও শুধুমাত্র দল বাড়লেই ভারতের যোগ্যতা অর্জন নিশ্চিত হবে না। এশিয়ার বাছাইপর্বে ধারাবাহিক ভাল ফল করতেই হবে তাদের।
ছোটদের বড় মঞ্চে প্রমাণ করার সুযোগ
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, “এই বিশ্বকাপের (৪৮ দলের) সাফল্যের পর আমরা ২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৪ দলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করব।” তাঁর মতে, আরও বেশি দেশকে সুযোগ দেওয়া বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ছোট দেশগুলিও বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাবে এবং এতে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের মান আরও বাড়বে।
ইনফান্তিনো আরও দাবি করেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন দলগুলির পারফরম্যান্স অপ্রত্যাশিত ভালো প্রমাণ করেছে যে, নতুন ফরম্যাট সফল হয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকার প্রতিনিধিদের পারফরম্যান্সের কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “আগের তুলনায় অনেক বেশি আফ্রিকান দল এ বার নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। এতে বোঝা যায়, সুযোগ পেলে তথাকথিত ছোট দেশগুলিও বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে”।
যদি ৬৪ দলের বিশ্বকাপের প্রস্তাব অনুমোদন পায়, তাহলে ২০৩০ বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সম্ভাব্য ফরম্যাট অনুযায়ী ১৬টি গ্রুপে চারটি করে দল থাকবে এবং মোট ম্যাচ হতে পারে ১২৮টি। তবে এই প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ফিফা জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
৬৪ দলের মধ্যে ভারত কী ভাবে থাকতে পারে?
যদিও এর কোনও নিশ্চয়তা নেই, তবু বিশ্বকাপে দলসংখ্যা ৬৪ হলে ভারতের সামনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ ফরম্যাটে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (AFC) সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের কোটা ৪.৫ থেকে বেড়ে ৮.৫-এ পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
যদি ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য ফিফা সত্যিই দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৪ করে, তাহলে এতে আরও ১৬টি দেশ খেলার সুযোগ পাবে। এর আগে ফিফা যখনই দলের সংখ্যা বাড়িয়েছে, তখন বাড়তি আসনগুলি বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এএফসি-র ভাগে আনুপাতিক হারে আরও কয়েকটি আসন আসতে পারে। সেক্ষেত্রে এশিয়ার সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের কোটা বেড়ে ১১ বা ১২ হতে পারে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, অস্ট্রেলিয়া এবং সৌদি আরবের প্রথম পাঁচটি সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের জায়গা দখল করার সম্ভাবনা প্রবল। এর পাশাপাশি কাতার, ইরাক, উজবেকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) এবং জর্ডানও পরের তিন থেকে চারটি জায়গার জন্য শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
ভারত যদি এএফসি-র সম্ভাব্য ১১তম বা ১২তম যোগ্যতা অর্জনের স্থানটি দখল করতে চায়, তাহলে ওমান, বাহরিন, সিরিয়া, চিন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডের মতো দলগুলিকে ধারাবাহিকভাবে হারাতে হবে বা তাদের চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করতে হবে। বর্তমানে এশিয়ার সেরা দলগুলির তালিকায় ভারতের অবস্থান ২৬ নম্বরে।
ফলে, ৬৪ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপ হলেও ভারতের জন্য বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন সহজ হবে না। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ভারতীয় ফুটবলারদের নিজেদের খেলার মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে হবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে হবে। দেশের ফুটবলের যা বেহাল দশা। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন কর্তাদের অদূরদর্শিতা ও পেশাদারিত্বের অভাবের জন্য দেশের সবচেয়ে বড় ক্লাব লিগ আইএসএলের যে পরিণতি হয়েছে, তাতে সেই স্বপ্ন আদৌ বাস্তবে পরিণত হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।