বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থানের লড়াইয়ে দশ গোল, ইংল্যান্ডের কাছে ৪-৬-এ হেরেও সোনার বুটের দৌড়ে শীর্ষে এমবাপে

Photo: X

ফ্রান্স বিশ্বকাপে তৃতীয়ও হতে পারল না ফ্রান্স। ভারতীয় সময়ে রবিবার মাঝরাতে ইংল্যান্ড তাদের ৬-৪-এ হারিয়ে তৃতীয় সেরার খেতাব জিতে নেয়। কিন্তু ব্যক্তিগত কৃতিত্বে ইতিহাস গড়ে ফেললেন কিলিয়ান এমবাপে। এই ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসিকে টপকে গেলেন। একই সঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়েও আপাতত শীর্ষে উঠে এলেন ফরাসি তারকা।

মায়ামিতে বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচে দুই প্রতিবেশী দেশের লড়াইয়ে রীতিমতো গোলের বন্যা বয়ে যায়। দুই ভিন্ন অর্ধের নাটকীয় লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় ইংল্যান্ড। মায়ামি স্টেডিয়ামে বুকায়ো সাকা হ্যাটট্রিক করেন। অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপে প্রায় একাই ফ্রান্সকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখালেও, শেষ পর্যন্ত জুড বেলিংহ্যামের গোলেই সেই লড়াইয়ের ইতি টানে ইংল্যান্ড।

দশ গোলের মেলা!


প্রথমার্ধে ফ্রান্সকে কার্যত উড়িয়ে দেয় ইংল্যান্ড। বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত শটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ডেকলান রাইস। এরপর বুকায়ো সাকার একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। তবে তার কিছু পরেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এজরি কনসা। প্রথমার্ধের শেষ দিকে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে হ্যাটট্রিকের ভিত গড়েন সাকা। ফলে বিরতিতে থমাস টুখেলের দল ৪-০-য় এগিয়ে থেকে মাঠ ছাড়ে।

বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হার ছিল ১৯৫৮-য় ব্রাজিলের কাছে ৫-২-এ, যে ম্যাচে তারা কার্যত ১০ জন নিয়ে খেলেছিল। মায়ামিতে সেই লজ্জাজনক রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর দুর্দান্ত লড়াই শুরু করে ফরাসিরা।

মাইকেল অলিসের বাড়ানো বল থেকে গোল করে ব্যবধান কমানো শুরু করেন কিলিয়ান এমবাপে (৪-১)। এরপর রিয়াল মাদ্রিদের তারকাই ব্র্যাডলি বারকোলার গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন, তাতে ব্যবধান আরও কমে (৪-২)। কিছুক্ষণ পর নিজেই আরও একটি গোল করে এমবাপে ফ্রান্সকে মাত্র এক গোলের ব্যবধানে নিয়ে আসেন (৪-৩)। শেষে অলিজে প্রায় অসাধারণ এক দলগত আক্রমণে সমতা ফেরানোর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু অল্পের জন্য সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়।

একের পর এক আক্রমণে তখন প্রবল চাপে ইংল্যান্ড। সেই সময় মালো গুস্তো বক্সের মধ্যে ডিজেড স্পেন্সকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। স্পট-কিক থেকে গোল করে বুকায়ো সাকা দলকে কিছুটা স্বস্তি এনে দেন (৫-৩)। মনে হয়েছিল, তাতেই ফ্রান্সের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন শেষ। কিন্তু ওসমান দেম্বেলের গোল ফের ব্যবধান কমিয়ে আনে (৫-৪)।

তবে শেষ কথা বলেন ইংল্যান্ডের টুর্নামেন্টসেরা ফুটবলার জুড বেলিংহ্যাম। একাধিক ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়ে দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টায় গোল করে তিনি ইংল্যান্ডের জয় নিশ্চিত করেন (৬-৪)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচগুলির একটিতে শেষ হাসি হাসে থ্রি লায়ন্স।

এই জয়ের ফলে ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করল ইংল্যান্ড। একই সঙ্গে এই ম্যাচেই ফ্রান্সের কোচ হিসেবে সফল অধ্যায়েরও ইতি টানলেন দিদিয়ের দেশঁ।

সবার ওপরে এমবাপে

দশ গোলের এই ম্যাচে এমবাপে দুটি গোল করায় বিশ্বকাপ কেরিয়ারে তাঁর মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়াল ২২। তিনি পিছনে ফেলে দিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে, যাঁর ঝুলিতে রয়েছে ২১টি বিশ্বকাপ গোল। এই নজির গড়তে এমবাপে খেলেছেন মাত্র ২২টি ম্যাচ।

২০১৮ বিশ্বকাপে চারটি, ২০২২-এ আটটি এবং চলতি বিশ্বকাপে ১০টি গোল করেছেন এমবাপে। এই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার উপরে চলে এলেন তিনি। অন্যদিকে মেসির ঝুলিতে রয়েছে আট গোল। তবে আর্জেন্টিনা এখনও ফাইনাল খেলেনি। স্পেনের বিরুদ্ধে রবিবারের ফাইনালে তিন গোল করতে পারলে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে ফের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

ফাইনালে খেলতে না পারার আক্ষেপ

বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের রেকর্ড গড়লেও এমবাপে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলগত ফলকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ম্যাচের পরে তিনি বলেন, ‘এই রেকর্ডের চেয়ে আমি ফাইনালে খেলতে বেশি পছন্দ করতাম। ব্যক্তিগত সম্মান অবশ্যই ভালো, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপ জেতা। সেটা না পারার আক্ষেপ থেকেই যাবে’।

ফ্রান্সের অধিনায়ক আরো বলেন, ‘প্রথমার্ধ দেখে কেউ যদি কেউ মনে করে আমরা জাতীয় জার্সির মর্যাদা রাখতে পারিনি, হাস্যকর জায়গায় চলে গিয়েছিলাম, তা হলে বলব, আমরা স্রেফ মানুষ হিসেবেই খেলেছি— আর বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে সেই সুযোগ নেই। আমরা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম, আর ইংল্যান্ড আমাদের প্রবল ধাক্কা দিয়ে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আমরা আবার সেই সর্বোচ্চ মানের ফুটবলার হয়ে উঠেছিলাম, মানসিকভাবে দৃঢ় একদল যোদ্ধা’।

কোচের জন্য বেশি আফসোস হচ্ছে অধিনায়কের। বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে আমাদের কোচ দিদিয়ের দেশঁর জন্য। আমরা ওঁর জন্য বিশেষ কিছু করতে চেয়েছিলাম। প্রথমার্ধ দেখে মনে হতে পারে, আমরা ওঁকে হতাশ করেছি। কিন্তু আমরা কখনওই চাইনি উনি এমনটা অনুভব করুন। এই একটি ম্যাচ কোনওভাবেই দিদিয়ের দেশঁর অবদানকে ম্লান করে দিতে পারবে না’।

‘এই হার খুবই কষ্ট দিচ্ছে’

এই ম্যাচের আগে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁ বলেছিলেন, তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচে খেলার ইচ্ছা নেই তাঁর দলের ফুটবলারদের মধ্যে। এ দিন চার গোল করেও হেরে যাওয়ার পর বলেন, ‘প্রথমার্ধে আমরা অত্যন্ত বাজে খেলেছি। পরে আমাদের লড়াই করার মানসিকতা ফিরে আসে। শেষ দিকে আমরা আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করি। তবে প্রথমার্ধে দলকে যেভাবে প্রস্তুত করা উচিত ছিল, সেটা আমি করতে পারিনি। দায়টা আমারই।যদিও এই হার খুবই কষ্ট দিচ্ছে। তৃতীয় স্থান নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করতে পারলে ভালো লাগত’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখানে অনেক স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এসেছিলাম। টুর্নামেন্টে আমরা অনেক ইতিবাচক কাজও করেছি। স্পেনের বিরুদ্ধে ম্যাচে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। কিন্তু তাই বলে সবকিছুই ব্যর্থ হয়েছে, এমন নয়। আমাদের দলে প্রচুর ভাল মানের তরুণ ফুটবলার রয়েছে, যারা ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করবে। এই দলের ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করার সামর্থ্য রয়েছে’।

ফ্রান্সের কোচ হিসেবে অভিযান শেষ করা প্রসঙ্গে দেশঁ বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে ওদের সঙ্গে এই যাত্রাটা আমার কাছে অসাধারণ ছিল। প্রস্তুতি শিবিরের শুরু থেকে আমরা টানা আট সপ্তাহ একসঙ্গে কাটিয়েছি, আর সেই সময়টা সত্যিই দারুণ ছিল। হতাশা শুধু মাঠের ফলাফল নিয়ে। কিন্তু আমরা কোটি কোটি ফরাসি সমর্থকের মনে আবেগের ঢেউ তুলতে পেরেছি। বিশ্বকাপের মতো সুন্দর মঞ্চ আর নেই’।

এখন সব নজর বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে। মেসির সামনে শেষ সুযোগ—বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের গোলসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এমবাপেকে টপকে যাওয়ার। তবে আপাতত ইতিহাসের পাতায় নতুন করে নিজের নাম লিখিয়ে রেখেছেন ফরাসি মহাতারকা এমবাপে।