লাল-হলুদের গোল প্রহরী এ বার ভারতের জার্সিতে ব্রাজিল-উরুগুয়ের মুখোমুখি হতে মরিয়া

Photo: EBFC media

লাল-হলুদের গোলপোস্ট সামলাতে সামলাতে এ বার দেশের জার্সিতে বড় মঞ্চের অপেক্ষায় প্রভসুখন সিং গিল। পানামা, ব্রাজিল এবং উরুগুয়ের বিরুদ্ধে আসন্ন আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলির জন্য ভারতীয় দলে ডাক পেয়েছেন ইস্টবেঙ্গলের গোলরক্ষক। জাতীয় দলের জার্সিতে এখনও অভিষেক হয়নি তাঁর। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর জন্য যে তিনি মুখিয়ে রয়েছেন, তা স্পষ্ট গিলের কথায়।

২০২৩-এ ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত লাল-হলুদ জার্সিতে ৯০টি ম্যাচ খেলেছেন পঞ্জাবের এই গোলরক্ষক। ক্লাবের হয়ে এটি তাঁর চতুর্থ মরসুম। এর মধ্যেই জিতেছেন তিনটি বড় ট্রফি—২০২৩-২৪ মরসুমের সুপার কাপ, ২০২৫-২৬ আইএসএল এবং ২০২৬-এর ডুরান্ড কাপ। এ ছাড়াও ২০২৩ ডুরান্ড কাপ, ২০২৫ আইএফএ শিল্ড এবং ২০২৫ সুপার কাপে রানার্স হয়েছেন।

জুন মাসেই ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে আরও দু’বছরের চুক্তি করেছেন গিল। খুব কাছ থেকে ক্লাবের উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘ইস্টবেঙ্গলে আমার এই অভিযান অসাধারণ। একটা দল হিসাবে আমরা একসঙ্গে অনেক ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। প্রথম মরসুমে ডুরান্ড কাপের ফাইনালে হেরেছিলাম, আইএসএলেও শুরুটা ভাল হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুপার কাপ জিতেছিলাম এবং এএফসি-র প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম। জাতীয় ট্রফির জন্য ক্লাবের ১২ বছরের অপেক্ষাও শেষ হয়েছিল।’


পরের মরসুম আরও কঠিন ছিল বলে জানিয়েছেন গিল। দীর্ঘ সময় জয় না পাওয়ার পরেও দল ভেঙে পড়েনি। বরং সেই ধাক্কা সামলে ২০২৫-২৬ মরসুমে একের পর এক প্রতিযোগিতায় ভাল ফল করে ইস্টবেঙ্গল। ‘আমরা আইএফএ শিল্ড এবং সুপার কাপের ফাইনালে উঠেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আইএসএল জিতেছি। এ মরসুমেও সেই ছন্দ ধরে রেখেছি। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২-এর গ্রুপ পর্বে উঠেছি এবং ডুরান্ড কাপ জিতেছি,’ বলেছেন গিল।

‘ম্যাকলারেনের সেই সেভ এখনও মনে আছে’

গত আইএসএল ডার্বিতে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের জেমি ম্যাকলারেনের বিরুদ্ধে গিলের সেই অতিরিক্ত সময়ে করা সেভ এখনও সমর্থকদের মুখে মুখে ঘোরে। তাঁর নিজের কাছেও সেটি এক বিশেষ মুহূর্ত।

গিল বলেছেন,’ম্যাকলারেনকে আটকানোর সেই সেভটা আমার হৃদয়ে সব সময় বিশেষ জায়গা করে থাকবে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল সহজাত। তখন আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল বলটাকে গোলের ভিতরে ঢুকতে না দেওয়া। পরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখে বুঝেছিলাম, ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল জয়ে ওই সেভের গুরুত্ব কতটা ছিল।’

সেই মুহূর্তের স্মৃতিকে শরীরে ট্যাটু করিয়েছেন গিল। ‘অনেক সমর্থক আমাকে বলেছিলেন, ঘটনাটা পায়ে ট্যাটু করিয়ে রাখতে। প্রথমে আমি দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু মা যখন জোর করলেন, তখন করিয়ে ফেলি। সমর্থকেরা ট্যাটুটা খুব পছন্দ করেন। এটাই আমার একমাত্র ট্যাটু থাকবে, কারণ ওই মুহূর্তটা সত্যিই অসাধারণ ছিল। অনেকে ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে এমিলিয়ানো মার্তিনেসের বিখ্যাত সেভের সঙ্গে আমার সেভের তুলনা করেন। আমার কাছে এটা বিরাট প্রশংসা,’ বলেছেন তিনি।

‘দিল্লির বিরুদ্ধে পেনাল্টি বাঁচানো ছিল কর্তব্য’

২০২৬ ডুরান্ড কাপে এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে ম্যাচেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পেনাল্টি বাঁচিয়েছিলেন গিল। পরে শুটআউটেও তাঁর সেভ ইস্টবেঙ্গলকে এগিয়ে দেয়।

তবে সেই কৃতিত্বকে আলাদা করে দেখতে চান না তিনি। গিলের বক্তব্য, ‘ইস্টবেঙ্গলে আমরা যে প্রতিযোগিতাতেই খেলি, আমাদের লক্ষ্য থাকে ট্রফি জেতা। ডুরান্ড কাপও তার ব্যতিক্রম নয়। ডার্বিতে প্রথম ম্যাচে হেরে গেলেও—দু’দলই প্রায় কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই খেলেছিল—তার পর থেকে আমরা ধারাবাহিক ছিলাম এবং ফাইনালে আধিপত্য দেখিয়েছি। এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে ম্যাচে পেনাল্টি বাঁচানো এবং পরে শুটআউটে সেভ করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি এটাকে নিজের কর্তব্য হিসাবেই দেখি। গোলরক্ষক হিসাবে কঠিন সময়ে দলকে বাঁচানোই আমার কাজ। সেটা করতে পেরে ভাল লেগেছে।’

আর সেই কাজের প্রেরণা? ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকেরাই। ‘বড় ক্লাবের হয়ে আপনি এই মুহূর্তগুলির জন্যই খেলেন—ট্রফি জেতার জন্য। সমর্থকদের, ছোট-বড় সকলের মুখে হাসি দেখলে আরও বেশি পরিশ্রম করার তাগিদ আসে। প্রতিটি অনুশীলনে নিজের সেরাটা দিতে চাই, যাতে ক্লাব এবং সমর্থকদের আরও গর্বিত করতে পারি,’ বলেছেন গিল।

এ বার এএফসি-র মঞ্চে ইস্টবেঙ্গল

দেশের ফুটবলের পাশাপাশি সামনে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২-এর বড় চ্যালেঞ্জও। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে জর্ডনে আল-হুসেনের বিরুদ্ধে নামবে ইস্টবেঙ্গল। গিল মনে করছেন, দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতাই তাঁদের বড় শক্তি।

তিনি বলেছেন, ‘দল হিসাবে আমরা খুব শক্তিশালী। আমাদের অধিকাংশ ফুটবলারই বেশ কয়েক বছর ধরে একসঙ্গে খেলছে। তাই দলের মধ্যে বোঝাপড়া অসাধারণ। জুলাই থেকেই আমরা প্রস্তুতি শুরু করেছি এবং এই জায়গায় পৌঁছতে কঠোর পরিশ্রম করেছি। কোচ হাবাসের প্রশিক্ষণে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২-এ আমরা নিজেদের সেরাটা দেব। সমর্থক এবং দেশকে গর্বিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

এরই মধ্যে জাতীয় দলের ডাক এসেছে। ২০১৭ অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের অংশ ছিলেন গিল। পরে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের অধিনায়কও হয়েছেন। ২০২১-২২ আইএসএলে গোল্ডেন গ্লাভ জেতা এই গোলরক্ষকের সিনিয়র দলে অভিষেক এখনও হয়নি। সেই সুযোগ আসতে পারে পানামা, ব্রাজিল এবং উরুগুয়ের বিরুদ্ধে।

গিলের কথায়, ‘পানামা, ব্রাজিল এবং উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ফ্রেন্ডলির জন্য জাতীয় দলে ডাক পাওয়া বিরাট সম্মানের। ক্লাবের হয়ে আমি সব সময় নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এ বার জাতীয় দলের হয়েও সেই পারফরম্যান্স দেখাতে চাই। এটা বিশাল একটা সুযোগ। আমি এর পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর।’