দুর্দান্ত লড়াই করেও শেষ রক্ষা হল না লাল-হলুদের, এগিয়ে গিয়েও শেষে ২-৩-এ হার, এসিএল ২ থেকে কার্যত বিদায়

PIC- EAST BENGAL

ইরাকের দ্বিতীয় সেরা দল আল শোর্তার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই করল আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের ইস্টবেঙ্গল। মঙ্গলবার ঘরের মাঠে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর গ্রুপ পর্বের খেলায় দু’বার তারা প্রতিপক্ষকে পিছনে ফেলে দিলেও দ্বিতীয়ার্ধে আর প্রতিপক্ষের চাপ ধরে রাখতে পারেনি। তিন মিনিটের মধ্যে পরপর দুটি গোল খেয়ে জয়ও হাতছাড়া করে লাল-হলুদ বাহিনী। প্রায় কুড়ি মিনিট আল শোর্তা দশ জনে খেললেও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। এই হারের ফলে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ ২ থেকে কার্যত বিদায় কলকাতার দলের।

মঙ্গলবার নাটকীয় ম্যাচে প্রথমার্ধের শেষে ২-১ গোলে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। আল-শোর্তার বিরুদ্ধে লাল-হলুদকে শুরুতেই এগিয়ে দেন স্ট্রাইকার ডেভিড লালনসাঙ্গা। ম্যাচের সাত মিনিটের মাথায় দুরন্ত টার্ন করে গোল করে দেন ডেভিড।

তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে সমতা ফেরায় ইরাকের রানার্স-আপ দল আল-শোর্তা। ডিফেন্ডার আহমেদ ইয়াহিয়া হেডে গোল করে ১-১ করেন। এর পর প্রথমার্ধের ৪১ মিনিটে আবার এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। ফ্রি-কিক থেকে পাওয়া বল গোলরক্ষকের হাত থেকে ছিটকে এলে সেই ফিরতি বল গোলে ঠেলে দেন ডেভিড। প্রথমার্ধের শেষ দিকে আরও তিনটি গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন ডেভিড। কিন্তু ফিনিশিংয়ের দুর্বলতায় সেই সুযোগগুলি কাজে লাগাতে পারেননি তিন


তবে শুরুতেই যে গোলটি করেন ডেভিড, তা যুবভারতীর উত্তাপ একসাথে অনেকটা বাড়িয়ে দেয়! ডান প্রান্তে দানি রামিরেজের দুর্দান্ত বোঝাপড়ার পর বক্সের মধ্যে ক্রস বাড়ান রাইট ব্যাক হার্দিক ভাট। বক্সের মধ্যে বলটি নিয়ন্ত্রণে এনে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ান ডেভিড এবং জোরালো শটে বল জড়িয়ে দেন জালে! ইস্টবেঙ্গল স্ট্রাইকারের দুর্দান্ত, অসাধারণ গোল উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে যুবভারতীর গ্যালারি।

তবে সমর্থকদের বেশিক্ষণ আনন্দ করার সুযোগ দেয়নি ইরাকের দলটি। ১৪ মিনিটের মাথায় গোল করে ঘুরে দাঁড়ায় তারা! ডান প্রান্ত থেকে ভেসে আসা ক্রস বক্সের মধ্যে হেড করেন ডিফেন্ডার আহমেদ ইয়াহিয়া। বল সামান্য ডিফ্লেক্ট করে জড়িয়ে যায় জালে। ১০ মিনিটও লিড ধরে রাখতে পারেনি লাল-হলুদ বাহিনী।

এরপর দুই দলের মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হয় এবং দু’পক্ষই গোলের সুযোগ তৈরি করে। ইস্টবেঙ্গলের লালচুংনুঙ্গার একটি দূরপাল্লার শট কোনোরকমে গোলে ঢোকার ঠিক আগে আটকে দেন ইরাকের জাতীয় দলের বিশ্বকাপ খেলা গোলকিপার জালাল হাসান।

ম্যাচের ৩৯ মিনিটের মাথায় বল নিয়ে বক্সে ঢুকছিলেন সেই ডেভিড। কিন্তু বক্সের ঠিক বাইরে তাঁকে টেনে ফেলে দেন আল শোর্তার আব্দুল মুমুনি। এই ফাউলের জন্যই ইস্টবেঙ্গলকে ফ্রিকিক দেন রেফারি এবং দানি রামিরেজের জোরালো ফ্রিকিক সোজা গোলে ঢুকছিল। কিন্তু কোনও রকমে বল ঠেকান জালাল। ফিরতি বলের দখল নিতে সবার আগে পৌঁছে যান বাসিম রশিদ। তিনি বল বাড়ান ডেভিডের উদ্দেশে। ফাঁকা গোলে বল ঠেলতে কোনও ভুল করেননি ডেভিড। দুর্দান্ত আক্রমণে ফের এগিয়ে যায় আন্তোনিও লোপেজ হাবাস।

ওই সময়ে দুর্দান্ত ফুটবল খেলছিল ইস্টবেঙ্গল। বিরতিতে যাওয়ার দু’মিনিট আগে দানি রামিরেজের অসাধারণ ডিফেন্স-চেরা পাস আসে বাঁ প্রান্তে। সেখান থেকে নীচু ক্রস পান ফের সেই ডেভিড। পায়ের ডগা দিয়ে বল জালে জড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হন! হ্যাটট্রিকের একদম কাছে পৌঁছে গিয়েও ব্যর্থ হন তিনি। এর পরে হার্দিকের ক্রস থেকেও গোল করতে ব্যর্থ হন তিনি। রশিদের পাস থেকেও গোলের সুযোগ পেয়ে যান ডেভিড। কিন্তু এ বার দুর্দান্ত সেভ করেন জালাল। সুযোগগুলি কাজে লাগাতে পারলে প্রথমার্ধেই পাঁচ-পাঁচটি গোল করে ফেলতে পারতেন ডেভিড।

বিরতিতে আল শোর্তার কোচ ত্রাবেলসি যে ভালোরকমের পেপটক দেন, তা বোঝা যায় দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই। মাত্র দু’মিনিটের ব্যবধানে দু’টি গোল করে ম্যাচের রং বদলে দেয় আল-শোর্তা। হুসেন আলি এবং কিংসলে কুকু-র গোলে এগিয়ে যায় অতিথি দল।

বিরতির পর খেলা শুরু হতেই অন্য চেহারায় দেখা যায় আল শোর্তাকে। ৫১ মিনিটের মাথায় হুসেন আল-সায়েদির গোলে ম্যাচে ফেরে অতিথি দল। আল-সিবের বিরুদ্ধে তাদের জয়েও গোল করেছিলেন তিনি। এ বারও গোল করে দলকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনেন হুসেন। দু-দু’বার এগিয়ে গিয়েও ইস্টবেঙ্গল ফের সমতার জায়গায় চলে আসে।

এর দু’মিনিট পরে ফের গোল! মাঠে নেমেই প্রভাব দেখাতে শুরু করেন আর্জেন্টিনার বারকো। তাঁর ভাসানো দুর্দান্ত কর্নার থেকেই বল আসে বক্সে। প্রথম পোস্টে সঠিক জায়গায় ছিলেন কুকু। দুরন্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। প্রভসুখন গিলের কিছুই করার ছিল না।

ব্যবধান বাড়ানোর জন্য এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠে খোঁচা খাওয়া আল শোর্তা যে যুবভারতীর গ্যালারিতেও ক্রমশ নৈঃশব্দ নেমে আসে। ক্রমশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে নিয়ে আসতে শুরু করে আল শোর্তা।

তবে ৬৬ মিনিটের মাথায় ফের গোলশোধের দুর্দান্ত সুযোগ পেয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। বক্সের ভিতর থেকে গোলে শট নেন দানি রামিরেজ। গোলকিপার সেই শট বাঁচিয়ে দিলেও বল চলে আসে এডমুন্ডের পায়ে। এ বারও গোললাইন থেকে দলকে রক্ষা করেন গোলকিপার জালাল! বল গোললাইন পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছিল বলে মনে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত দলকে বিপদসীমার বাইরে নিয়ে আসে আল-শোর্তার ডিফেন্স। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে দলের এমন দুর্ভাগ্য কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস!

কিন্তু ৭৭ মিনিটে অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটে। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, তথা লাল কার্ড দেখেন আবদুল মুমুনি। জয় গুপ্তাকে ফাউল করে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। ফলে ম্যাচের বাকি সময় দশজনে খেলতে হয় আল-শোর্তাকে। চার মিনিটের সংযুক্ত সময়ও পায় তারা। তবে তাতেও গোলের দরজা খুলতে পারেননি ডেভিডরা।