জ্যাভলিনে জোড়া পদক, তেজস্বিনের দ্বিতীয় পদক, বক্সিংয়ে ঝড় ভারতীয়দের— গ্লাসগোয় ভারতের সেরা দিন

Photo: Representational Image

কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের পদক-ঝুলিতে যেন নেমে এল পদকের বৃষ্টি। জুডোয় প্রথমবারের মতো জোড়া সোনা, পুরুষদের জ্যাভলিনে ডাবল পডিয়াম এবং বক্সিংয়ে ১০ জনের ফাইনালে ওঠা— সব মিলিয়ে শুক্রবার ভারতের জন্য হয়ে রইল এ বারের গেমসের সেরা দিন। এই একদিনেই ছয়টি পদক জিতে ভারতের মোট পদকসংখ্যা পৌঁছে গেল ২৩-এ।

ত্রিপুরার জুডোকা অস্মিতা দে মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় ভারতের প্রথম সোনা জিতে সবচেয়ে বড় ইতিহাস গড়ার পর পুরুষদের ৬০ কেজি বিভাগে হর্ষ সিং অস্ট্রেলিয়ার জোশুয়া কাটজকে হারিয়ে আর একটি সোনা এনে দেন। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে এই প্রথম জুডোয় দু’টি সোনা জিতল ভারত। জুডোয় ভারতের সফলদের তালিকায় যুক্ত হন যামিনী মৌর্য, যিনি মহিলাদের ৫৭ কেজি বিভাগে রুপো জেতেন।

অ্যাথলেটিক্সেও এ দিন উজ্জ্বল ছিল ভারত। পুরুষদের জ্যাভলিনে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন নীরজ চোপড়া এ বার সোনা না পেলেও মরসুমের সেরা ৮৫.৮৩ মিটার ছুড়ে রুপো জেতেন। অন্যদিকে শেষ প্রচেষ্টায় ব্যক্তিগত সেরা ৮৫.৪১ মিটার ছুড়ে ব্রোঞ্জ জিতে নেন যশবীর সিং। কমনওয়েলথ গেমসের এই আসরে পুরুষদের জ্যাভলিনে ভারতের জোড়া পদক দেশের অ্যাথলেটিক্সে আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একই দিনে ডেকাথলনে পদক জিতে নজর কেড়েছেন তেজস্বিন শঙ্করও।


বক্সিং রিংয়েও ছিল ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য। সেমিফাইনালে ওঠা ১০ ভারতীয় বক্সারই নিজেদের লড়াই জিতে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছেন। ফলে অন্তত ১০টি রুপোর পদক নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শনিবার সোনার লড়াইয়ে একাধিক সাফল্যের আশা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

গ্লাসগোয় এই দাপুটে পারফরম্যান্সে পদক তালিকাতেও বড়সড় উত্থান হয়েছে ভারতের। শেষ দু’দিনের সাফল্যে ভারতীয় শিবিরে এখন আশার পারদ উর্দ্ধমুখী। বিশেষ করে বক্সিংয়ের ফাইনাল এবং বাকি ইভেন্টগুলিতে আরও পদক জয়ের সম্ভাবনায় উজ্জীবিত গোটা দল।

 

নীরজের সোনা হাতছাড়া, তবু ভারতের জোড়া পদক!

 

গ্লাসগোয় সোনা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু এ বার আর সেরা হওয়া হল না নীরজ চোপড়ার। কঠিন আবহাওয়ায় নিজের সেরাটা দিতে না পারলেও মরসুমের সেরা থ্রো করে রুপো জিতলেন ভারতের অলিম্পিক সোনাজয়ী তারকা। তবে হতাশার মধ্যেও ভারতের মুখে হাসি ফোটালেন যশবীর সিং। শেষ প্রচেষ্টায় ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স করে ব্রোঞ্জ জিতে জ্যাভলিনে ভারতকে এনে দিলেন ঐতিহাসিক জোড়া পদক। শুক্রবার কমনওয়েলথ গেমসের পুরুষদের জ্যাভলিন ফাইনালে শ্রীলঙ্কার রুমেশ থারাঙ্গা পাথিরাগে ৮৯.৭৫ মিটার ছুড়ে সোনা জিতে নেন। তাঁর সেই দুরন্ত থ্রোর সামনে আর কেউ পৌঁছতে পারেননি। নীরজের সেরা থ্রো ছিল ৮৫.৮৩ মিটার, যা তাঁকে এনে দেয় রুপো। আর একেবারে শেষ প্রচেষ্টায় ৮৫.৪১ মিটার ছুড়ে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেন যশবীর। এটাই তাঁর ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স।

নীরজ সোনা হারালেও প্রত্যাবর্তনের পথে যে তিনি ক্রমশ ছন্দ ফিরে পাচ্ছেন, মরসুমের সেরা পারফরম্যান্স তারই প্রমাণ। আর যশবীরের উত্থান ভবিষ্যতের জন্য ভারতের জ্যাভলিনে নতুন আশার আলো দেখাল। গ্লাসগোর মঞ্চে শেষ পর্যন্ত সোনা গেল শ্রীলঙ্কায়, কিন্তু রুপো ও ব্রোঞ্জ জিতে জ্যাভলিনে ভারতও ছাপ রেখে গেল স্মরণীয়ভাবেই।

 

হাঁটুতে যন্ত্রণা নিয়েও ইতিহাস তেজস্বিনের!

 

এক দিকে হাঁটুর চোট, অন্য দিকে টানা দু’দিনের ক্লান্তিকর লড়াই। সব প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে ইতিহাস গড়লেন তেজস্বিন শঙ্কর। গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ডেকাথলনে ব্রোঞ্জ জিতে ভারতের অ্যাথলেটিক্সে খুলে দিলেন নতুন দিগন্ত। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে এই প্রথম ডেকাথলনে পদক এল ভারতের ঝুলিতে।

শুক্রবার ১০ ইভেন্টের কঠিন লড়াই শেষে মোট ৭,৯৭৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেন তেজস্বিন। দীর্ঘদিনের হাঁটুর চোট নিয়েই প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছিল তাঁকে। সেই চোটের কারণেই এ বারের গেমসে নিজের প্রিয় হাই জাম্প ইভেন্ট থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু ডেকাথলনে তাঁর জেদ এবং লড়াইয়ের মানসিকতা শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখে দিল।

তেজস্বিনের এই সাফল্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ডেকাথলনকে অ্যাথলেটিক্সের সবচেয়ে কঠিন ইভেন্টগুলির একটি বলে মনে করা হয়। দু’দিন ধরে ১০০ মিটার, লং জাম্প, শট পুট, হাই জাম্প, ৪০০ মিটার, ১১০ মিটার হার্ডলস, ডিসকাস, পোল ভল্ট, জ্যাভলিন এবং ১৫০০ মিটার— এই ১০টি ভিন্ন ইভেন্টে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করে ফলাফল। সেই কঠিন পরীক্ষায় ভারতের পতাকা উড়িয়ে দিলেন দিল্লির এই অ্যাথলিট। এটি তেজস্বিনের কমনওয়েলথ গেমসে দ্বিতীয় পদক। ২০২২ সালের বার্মিংহ্যাম গেমসে হাই জাম্পে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন তিনি।

 

বক্সিংয়ে দশ রুপো নিশ্চিত, সোনার আশাও উজ্জ্বল

 

মহিলাদের ৭০ কেজি বিভাগের সেমিফাইনালে ওয়েলসের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রোজি একলেসকে হারিয়ে চমক দেন অরুন্ধতী চৌধুরী। তাঁর পাশাপাশি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জেসমিন ল্যাম্বোরিয়া (৫৭ কেজি) এবং অলিম্পিক পদকজয়ী লাভলিনা বরগোহাঁই (৭৫ কেজি)-সহ মোট ১০ জন ভারতীয় বক্সার শুক্রবার গ্লাসগোয় কমনওয়েলথ গেমসের বক্সিং প্রতিযোগিতার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছেন।

ফাইনালে উঠেছেন ভারতের অন্য বক্সাররা হলেন— সাক্ষী চৌধুরী, প্রীতি পাওয়ার, প্রিয়া ঘাংহাস, যাদুমণি সিং ম্যান্ডেংবাম, সচিন সিওয়াচ, অঙ্কুশ পাংঘাল এবং নরেন্দর বেরওয়াল।

অলিম্পিক পদকজয়ী লাভলিনা একতরফা লড়াইয়ে টুভালুর তারোনা খানুম বাদি পাসোনি তাফাকিকে ৫-০ ব্যবধানে হারিয়ে সহজেই ফাইনালে পৌঁছে যান। রিংয়ে নিখুঁত কৌশল, নিয়ন্ত্রিত আক্রমণ এবং দুর্দান্ত বক্সিং দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে প্রতিপক্ষকে কোনও সুযোগই দেননি তিনি।

দিনের শেষে ভারতের সাফল্যের মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করেন নরেন্দর বেরওয়াল। পুরুষদের ৯০ কেজির বেশি ওজন বিভাগের সেমিফাইনালে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর নাইজেল পলের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে বিচারকদের সর্বসম্মত ৫-০ রায়ে জয় ছিনিয়ে নেন তিনি।

৫৭ কেজি বিভাগের সেমিফাইনালে জেসমিন ল্যাম্বোরিয়া এতটাই একতরফা আধিপত্য বিস্তার করেন যে দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ মুহূর্তে লেসোথোর প্রতিপক্ষ তৃতীয় বার ‘স্ট্যান্ডিং কাউন্ট’ পাওয়ার পর রেফারি লড়াই থামিয়ে দেন। ফলে রেফারি স্টপস কনটেস্ট (RSC) সিদ্ধান্তে জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যান ভারতীয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

পুরুষদের ৫৫ কেজি বিভাগের সেমিফাইনালে নামিবিয়ার পি. পি. এম. হাওসেবকে বিচারকদের সর্বসম্মত ৫-০ রায়ে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেন যাদুমণি সিং। মহিলাদের ৫১ কেজি বিভাগের সেমিফাইনালেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখান সাক্ষী চৌধুরী। কানাডার অ্যাম্বার জেন ওয়ালকে একতরফা লড়াইয়ে বিচারকদের সর্বসম্মত ৫-০ রায়ে হারিয়ে তিনি ফাইনালে ওঠেন। মহিলাদের ৬০ কেজি বিভাগের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের লুসি কিংস-হুইটলিকে ৫-০ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যান প্রিয়া ঘাংহাস।