ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে তিনিই ছিলেন স্যার গ্যারি সোবার্সের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। মাঠে তাঁদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও, মাঠের বাইরে গড়ে ওঠে আজীবনের বন্ধুত্ব। চন্দু বোর্দে বহুবার বলেছেন, ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের অন্যতম ছিলেন স্যার গ্যারি সোবার্স।
শুক্রবার অনেক রাতে এক সাংবাদিকের ফোনে যখন জানতে পারেন, তাঁর প্রিয় বন্ধু আর নেই, তখন মনটা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, সারা রাত আর ঘুম আসেনি তাঁর।
১৯৫৮-৫৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সোবার্সের দলের বিরুদ্ধে ১০৯ এবং ৯৬ রানের দুটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটার ও জাতীয় নির্বাচক চন্দু বোর্দে। গ্যারি সোবার্সের বোলিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে বেশ স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে শেষ ওভারে তিনি রান-আউটের পাশাপাশি হিট-উইকেটও হয়েছিলেন। পরে ১৯৬৬-৬৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভারত সফরে অভিজ্ঞ মিডল-অর্ডার ব্যাটার হিসেবে তিনি আরও দুটি টেস্ট সেঞ্চুরি করেন।
শনিবার সেই বোর্দে পুনে থেকে ফোনে ‘দৈনিক স্টেটসম্যান ডিজিটাল’-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটে যাদের বিরুদ্ধে খেলেছি, তাদের মধ্যে সেরা অলরাইন্ডার ছিল সোবার্স। এখন পর্যন্ত ওর চেয়ে ভাল অলরাউন্ডার আমি দেখিনি। গ্রেট ক্রিকেটার। ফাস্ট, স্পিন- সব ধরনের বোলিং করতে পারত, এমনকী উইকেট কিপিংও করত। ক্লোজ ইন ফিল্ডিং বলুন বা আউটফিল্ড ফিল্ডিং সবেতেই দুর্দান্ত। কী নিখুঁত থ্রো ছিল ওঁর। ক্রিকেট বিশ্ব তার কোহিনূরকে হারাল। সত্যিই গ্যারি সোবার্স ছিলেন কোহিনূরের মতোই দামী হীরে’।
মাঝেমধ্যে লেগ-স্পিন বোলিংও করতেন বোর্দে। সেই বোলিংয়েই তিনি এক টেস্ট ম্যাচে কিংবদন্তি গ্যারি সোবার্সকে আউট করার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। ১৯৫৮-৫৯ সিরিজে মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সোবার্সকে মাত্র ৯ রানে ফিরিয়ে দেন বোর্দে।
সোবার্সের সঙ্গে প্রথম মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে ৯১ বছর বয়সী বোর্দে বলেন, ‘১৯৫৯-৬০ সালে যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বম্বেতে এসেছিল, তখন বম্বের ম্যাচে ওর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়। সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলই ছিল সেরা। গিলক্রিস্ট, হল, সোবার্স, কানহাই, সলোমন, বুচার, হান্ট, গিলক্রিস্ট-অসাধারণ দল। সেই ম্যাচে সোবার্সকে দেখে আমি অনসাইডে খেলা শিখেছিলাম। পরে নেটে আমি ওর মতো অনসাইডে খেলার চেষ্টা করি এবং ওকে কিছুটা নকলও করেছিলাম’।
সে যুগেও সোবার্সের ঝড়ের গতিতে রান তোলা প্রসঙ্গে বোর্দে বলেন, ‘বম্বেতে ওর বিরুদ্ধে একটা ম্যাচে খেলছিলাম। সেই ম্যাচের শেষ দিন দুপুর আড়াইটে থেকে একটা ঘোরদৌড় ছিল, যেটা ওর দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। কারণ, ও রেস দেখতে খুব ভালবাসত। ওখানে যাতে ঠিক সময়ে যেতে পারে, সে জন্য রীতিমতো ব্যাটে ঝড় তোলে ও এবং প্রয়োজনীয় রান তুলে ফেলে। এতটাই নিয়ন্ত্রণ ছিল সোবার্সের নিজের পারফরম্যান্সের ওপর। এখনকার টি-২০ ক্রিকেট দেখে মাঝে মাঝে ভাবি, সোবার্স এই সময়ে খেললেও টি-২০ ক্রিকেটে অসাধারণ সাফল্য পেত’।
ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে সোবার্সের সবচেয়ে ভাল বন্ধু ছিলেন চান্দু বোর্দে-ই। গ্রেট ক্রিকেটারের পাশাপাশি যে ভাল মানুষও ছিলেন ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি, তা জানাতে ভুললেন না বোর্দে। বলেন, ‘উনি খুবই প্রাণোচ্ছল ব্যক্তি ছিলেন, জমিয়ে আড্ডা মারতেন। জীবনটা ভরপুর উপভোগ করতেন।
আমি ওকে কখনও চাপে পড়তে দেখিনি। যে কোনো কঠিন জায়গায় আসা বলেও এত সুন্দর শট নিত যে, তা শেখার মতো ছিল। অসাধারণ স্ট্রোক মারতেন। ২১ জুলাই আমার জন্মদিন। আমি জানতাম ওরও জন্মদিন ২১ তারিখেই। পরে জানলাম ২৮ তারিখ। সেটা ওকে বলতেই উনি আমাকে মজজা করে বলেন- তোমার থেকে তা হলে আমি এক সপ্তাহ ছোট! শুনে আমরা দুজনেই হাহা করে হেসেছিলাম’।
কয়েক বছর আগেই সোবার্স এসেছিলেন পুনেতে একটা সংবর্ধনা নিতে। সেই অনুষ্ঠানে দুই বন্ধুর শেষ দেখা হয়। সেই অনুষ্ঠানের স্মৃতি টেনে এনে বোর্দে বলেন, ‘আমি সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে ওঁকে ‘পুনেরি পাগড়ি’ দেওয়া হয়েছিল। কাউকে সন্মান দিতে এটা উপহার দেওয়া পুনের প্রথা। ওঁর সেই পাগড়ি দেখে বেশ ভাল লেগেছিল। আমার কাছে জানতে চান, এটা কী? আমি ওকে বলি, ক্রিকেটে যেমন হেলমেট, তেমনই এটাও পুনেতে এক ধরনের সন্মান রক্ষার হেলমেট। এই কথা শুনেও সেই প্রাণখোলা হাসিটা হেসেছিলেন’।
আর সেই প্রাণখোলা হাসি আর দেখা যাবে না। কারণ, স্যার গ্যারি সোবার্স আর তাঁর প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে ঠাট্টা-ইয়ার্কি মারবেন না। মজা করবেন না চান্দু বোর্দের সঙ্গেও।